একজন সফল সেনানায়করূপে মহানবী (সাঃ)

শেয়ার করুন

 নূরুল ইসলাম বরিন্দী ।।

(এক) মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সাঃ) ৬১০ খৃস্টাব্দে নির্জন হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন অবস্থায় ওহি প্রাপ্ত হয়ে আল্লাহর তরফ থেকে নবুয়াত লাভ করেন আর ৬১২ খৃস্টাব্দে ওহির মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশে প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। এজন্য তাঁকে মক্কায় নিজ গোত্র কতৃক অমানুষিক অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। ৬১২ খৃস্টাব্দে যখন তিনি জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করেন তখন তাঁর বয়স হয়েছিলো ৫৩ বছর। অর্থাৎ প্রৌঢ় বয়সে উপনীত হয়ে আল্লাহর দ্বীনকে পৃথিবীর বুকে বিজয়মণ্ডিত এবং গোটা মানবজাতির মুক্তির জন্য শুরু হয় তাঁর সর্বাত্মক সংগ্রাম। আর এই সংগাম ইসলামি রিসালাত কায়েম না হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত ছিলো তাঁর ওফাতের কাল অবধি । বস্তুত সত্যধর্ম ইসলাম প্রতিষ্ঠা ও এর প্রচার-প্রসারে আল্লাহতায়ালাই তাঁকে মনোনীত করেছিলেন আর সে কারণে আল্লাহর একত্ববাদ তাওহিদই ছিলো তাঁর জীবনের একমাত্র মূলমন্ত্র।

রিসালাতের ওপর বিশ্বাসী, প্রচণ্ড ইমানি শক্তিতে বলীয়ান, আধ্যাত্মিক শক্তির আধার, অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর অতুলনীয় আদর্শ চরিত্রের অধিকারী ছিলেন বলেই তাঁর পক্ষে দুনিয়ার বুকে ইসলামকে সুউচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়েছে ।

প্রাচ্য-প্রতিচ্যের অনেক ঐতিহাসিক তরবারির জোরে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিংবা মহানবীর (সাঃ) ভূমিকা ছিলো আগ্রাসী এমন বিদ্বেষপ্রসূত হঠকারী মন্তব্যের জবাবে বলা যায়, ইসলামের আত্মপ্রকাশ তরবারির মুখাপেক্ষি অথবা জবরদস্তিমূলক ধর্মে দীক্ষিত করার জন্য কোনো যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি, বরং যুদ্ধগুলো সংঘটিত হওয়ার প্রেক্ষাপট ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন । ভুলে গেলে চলবে না যে, আত্মরক্ষার্থে তরবারি চালনা করা বা জিহাদকে ফরজ করা হয়েছে আল্লাহর তরফ থেকেই । পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে সুরা আলহাজ্জে (আয়াত ৩৯) বলা হয়েছেঃ “যারা আক্রান্ত হয়েছে তাদের যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হলো। কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে । আর আল্লাহ তাদের সাহায্যদানে পুরাপুরি সক্ষম।” এ সুরা নাজিল হয়েছিলো বদর যুদ্ধের সময়।

মুসলমানদের আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ প্রসঙ্গে সুরা আনফালে (আয়াত ৩৯) বলা হয়েছেঃ “এবং তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকবে যতক্ষণ না ফিতনা (অত্যাচার) বন্ধ হয় এবং আল্লাহর দ্বীন সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আর যদি তারা বিরত হয় তবে তারা যা করে আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।” আল্লাহর তরফ থেকে ওহির মাধ্যমে এমন নির্দেশের প্রেক্ষিতেই রাসুল (সাঃ) তাঁর অনুসারীদের মানবিক অধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রত্যাশী  হয়ে তাঁর যাবতীয় কর্ম সম্পাদনে ব্রতী হন এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের নিমিত্তই সাহাবিগণকে যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হয়েছিলো। হিজরতের পর মদিনায় এবং আরবের কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্রের মধ্যে ইসলামের প্রচার-প্রসার ও তাদের সঙ্গে মৈত্রীচুক্তি এবং ভীতি সঞ্চারের জন্য একটি সেনাদল গঠন অপরিহার্য হয়ে উঠেছিলো। এটিকে মহানবীর (সাঃ) একটি রাজনৈতিক অভিজ্ঞানের ফসল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন অনেক সিরাত লেখক। তাঁদের মতে সেনাদল গঠনের উদ্দেশ্য ছিলো কুরাইশদের সিরিয়ার বাণিজ্যপথ বন্ধ করা, তাদের মনে নও-মুসলিমদের সম্পর্কে ভীতির সঞ্চার করা, মদিনায় রাজনৈতিক ঘাঁটি বা রিসালতের শেকড় শক্ত-পোক্ত করা এবং আরবের বিভিন্ন গোত্রের সঙ্গে মৈত্রী সম্পর্ক স্থাপন করা, যাতে নির্বিঘ্নে ইসলাম প্রচার সম্ভব হয়। 

পবিত্র কুরআনের সুরা বাকারায় (আয়াত ১৯০) বলা হয়েছেঃ “যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তোমরাও আল্লাহর পথে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, কিন্তু সীমা লংঘন করো না, আল্লাহ সীমা লংঘনকারীদের পছন্দ করেন না।” সুতরাং যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদের যারা ধর্ম থেকে বিচ্যুত করতে চায় তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহতায়ালা। আর ধর্মের হিফাজতের জন্য পরিষ্কার ইঙ্গিতবাহী এইসব আয়াত। ধর্মে যে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই সে সম্পর্কেও সুরা বাকারায় (আয়াত ২৫৬) বলা হয়েছেঃ “ধর্ম সম্পর্কে জোর-জবরদস্তি নেই, সত্যপথ ভ্রান্তপথ থেকে সুস্পষ্ট হয়েছে।”

এটা ইতিহাস স্বীকৃত যে, মহানবী (সাঃ) যথা- সম্ভব যুদ্ধ-বিগ্রহ ও জোর-জবরদস্তির পথ পরিহার করে ইসলাম প্রচারে ব্রতী হয়েছিলেন। শত অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে ও তাঁর ঘনিষ্ঠ অনুসারীদের। তারপরও তিনি শান্তির পথ অন্বেষণ করেছেন প্রতিনিয়ত। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় আকাবার দ্বিতীয় বাইয়াতের কথা। ইয়াসরিবের (মদিনা) দলনেতা যখন বলেছিলেনঃ “ হে আল্লাহর রাসুল (সাঃ), আপনি নির্দেশ দিলে আমরা এক্ষুণি মক্কাবাসীর ওপর সশস্ত্র অভিযান চালাতে পারি।” জবাবে নবী (সাঃ) বলেছিলেনঃ “আল্লাহতায়ালার তরফ থেকে আমাকে এরকম কোনো নির্দেশ দেয়া হয়নি।”এতেই বোঝা যায় আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া ইসলাম প্রচারে রাসুল (সাঃ) কোনো আগ্রাসী ভূমিকা গ্রহণ করেননি।

সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো মহানবী (সাঃ) যতগুলো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন দু-একটি ব্যতিক্রম বাদে তার সবগুলো যুদ্ধেই বিজয়লাভ করেছিলো মুসলমানরা। রাসুল (সাঃ) যেসব যুদ্ধে বা অভিযানে স্বয়ং অংশ নিয়েছিলেন ইতিহাসে সেগুলোকে ‘গাজওয়া’ আর যেসবে অংশ নেননি তবে তাঁর নির্দেশ ছিলো সেগুলোকে ‘সারিয়া’ নামে অভিহিত করা হয়। সবচেয়ে প্রাচীন ও নির্ভরযোগ্য জীবনীগ্রন্থ সিরাতে ইবনে হিশাম, তাবাকাতে ইবনে সা’আদ, সিরাতে ইবনে ইসহাক, মোহাম্মদ হোসেইন হাইকলের হায়াত-ই মুহাম্মদ (সাঃ), সৈয়দ আমীর আলীর স্পিরিট অব ইসলামসহ খৃস্টান জীবনীকার উইলিয়াম ম্যুর, হিট্টি, ডরমিংহাম প্রমুখের ভাষ্যমতে রাসুলের (সাঃ) হিজরতের পর ‘গাজওয়া’ বা জিহাদের পর্ব শুরু হয়। আর এই ‘গাজওয়ার’ সংখ্যা ছিলো ২৩টি। এরমধ্যে আবার নবী (সাঃ) অস্ত্রধারণ করেছিলেন ৯টিতে। বাকি ১৪টিতে সেনানায়কত্বে ছিলেন, অস্ত্রধারণ করতে হয়নি। যা হোক, আমরা এখানে শুধু মহানবীর (সাঃ) ‘গাজওয়ার’ বিষয় নিয়েই আলোচনা করবো।

হিজরতের দশ মাস পর মহানবী (সাঃ) যে যুদ্ধে অংশ নেন সেটি হলো ‘গাজওয়ায়ে আবওয়া’। এটি আরবের একটি জনপদ। সেখানে বিনাযুদ্ধে জামরা গোত্রের সঙ্গে লিখিত সন্ধি হয়। এর পরের ‘গাজওয়া’ বুয়াত অভিযান। এর ২/৩ মাস পর ৬২৩ খৃস্টাব্দের অক্টোবর মাসে উশায়রা নামক জনপদে বনু মুদলাজ গোত্রের সঙ্গে মৈত্রীচুক্তি সম্পাদন হয়। সেখান থেকে মদিনায় ফেরার পথে খবর আসে কুরজ নামক এক কুরাইশ যুবক মদিনার চারণভূমি থেকে কিছু উট তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মহানবী (সাঃ) তাৎক্ষণিকভাবে কুরজের পিছু ধাওয়া করেন। বদর ময়দানের কাছাকাছি গিয়ে কুরজ উটগুলো ছেড়ে পালিয়ে যায়। ইতিহাসে এটিকে উল্লেখ করা হয়েছে ‘গাজওয়ায়ে বদরে উলা’ বা বদরের প্রথম যুদ্ধ নামে।

ইসলামের ইতিহাসে বহুল আলোচিত বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয় দ্বিতীয় হিজরীর ১৭ রমজান রোজ শুক্রবার। মদিনা থেকে প্রায় ৮০ মাইল দূরত্বে এই বদর প্রান্তর। মাত্র ৩১৪ জন (কিছু মতভেদ আছে) ১ হাজার সশস্ত্র কুরাইশ বাহিনীর সঙ্গে অসম যুদ্ধে লিপ্ত হয়েও বিজয়লাভ করেন মহানবী (সাঃ)। তিনি তাঁর সাহাবীদের বিস্ময়কর ইমানী শক্তি আর দৃঢ মনোবল দেখে অভিভূত হয়ে রণাঙ্গনে ঘুরছিলেন আর কাফেরদের লক্ষ্য করে কংকর নিক্ষেপ করছিলেন। এ সম্পর্কে সুরা আনফালে (আয়াত ১২-১৭) বলা হয়েছেঃ “স্মরণ করো, তোমাদের প্রতিপালক ফেরেস্তাদের প্রতি প্রত্যাদেশ করেন, আমি তোমাদের সঙ্গে আছি। সুতরাং তোমরা মুমিনদের অবিচলিত রাখো। যারা কাফের আমি তাদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার করবো। সুতরাং তাদের কাঁধে এবং সর্বাঙ্গে আঘাত করো,—তোমরা তাদের হত্যা করোনি, আল্লাহই তাদের হত্যা করেছেন এবং তুমি যখন নিক্ষেপ করছিলে তখন তুমি নিক্ষেপ করোনি, আল্লাহই নিক্ষেপ করেছেন।”

বদরের পরের যুদ্ধাভিযান ছিলো বনু কায়নুকা অবরোধ। মদিনা ও এর আশপাশের এলাকার ইহুদি গোত্রগুলো মুসলমানদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করলে শাস্তিস্বরূপ তাদের দুর্গ অবরোধ করা হয়।

বদর যুদ্ধের শোচনীয় গ্লানি মুছে ফেলতে ও প্রতিশোধ নেয়ার জন্য কুরাইশ প্রধান আবু সুফিয়ান কয়েক মাসের মধ্যে তার বিশাল বাহিনী নিয়ে মদিনা সীমান্তের কাছাকাছি উরায়েজ নামক স্থানে এসে শিবির স্থাপন করে। খবর পেয়ে মহানবী (সাঃ) তাঁর মুজাহিদ বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হলে আবু সুফিয়ান ভয়ে পালাতে থাকে। মুসলিম বাহিনী তার পশ্চাদ্ধাবন করলে আবু সুফিয়ান যানবাহনের বোঝা হাল্কা করার জন্য ছাতুর বস্তা ফেলে দিতে থাকে। আরবিতে ছাতুকে বলা হয় সাবিক। এজন্য ইতিহাসে এ যুদ্ধের নামকরণ করা হয় ‘গাজওয়ায়ে সাবিক’ বা ছাতুর যুদ্ধ।

এর অল্প কিছুদিনের মধ্যে আরও দুটি আরব গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নেন মহানবী (সাঃ)। গোত্র দুটি ছিলো বনু সালাবা ও বনু মাহারিব। এ দুটি যুদ্ধের নাম হল ‘গাজওয়ায়ে জী আমাররা’ ও ‘গাজওয়ায়ে বাহরান’। তৃতীয় হিজরীতে আরবের এক গোত্রপ্রধান দাসুর ইবনে হারিস মদিনা আক্রমণের জন্য বিপুলসংখ্যক যোদ্ধা নিয়ে অগ্রসর হলে মহানবী (সাঃ) তার মোকাবিলার জন্য সাহাবীদের নিয়ে এগিয়ে গেলে দাসুর ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে এই দাসুর ইবনে হারিস ইসলাম গ্রহণ করে একজন একনিষ্ঠ সাহাবী ও ইসলামের প্রচারক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। পরের পর্ব জানতে এম২৪নিউজ-এর সঙ্গেই থাকুন……

নূরুল ইসলাম বরিন্দী, Email: nibarindi@gmail.com