সদকাতুল ফিতরের বিধান

শেয়ার করুন

অনলাইন ডেস্ক:

জাকাতের মতো সদকাতুল ফিতরও একটি আর্থিক ইবাদত। রমজান শেষে ঈদুল ফিতরের পূর্বে সদকাতুল ফিতর আদায় করা হয়। রোজা রাখতে গিয়ে আমাদের অনেক ভুল-ত্রুটি সংগঠিত হয়। সদকায়ে ফিতর আদায়ের মাধ্যমে রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতি পূরণ হয়। যেমনি নামাজের ত্রুটি-বিচুত্যি পূরণ হয় সাহু সিজদার মাধ্যমে। এ ছাড়া ধনী-গরিব উভয়ে যেন অন্তত ঈদের দিন উত্তম পোশাক ও ভালো খাবার খেতে পারে এজন্যই এ ফিতরার ব্যবস্থা।

ফিতরা দ্বারা সমাজের অসহায় শ্রেণির সহায়তা করে ইসলাম অনন্য নজির স্থাপন করেছে। হাদিসে এসেছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রোজাকে অনর্থক কথা ও অশালীন কাজ হতে পবিত্র করার জন্য এবং নিঃস্বদের মুখে খাদ্য দেওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদকায়ে ফিতর নির্ধারণ করেছেন। (সুনানে আবু দাউদ) হযরত জারির রা. সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, রমজানের রোজা সদকাতুল ফিতর আদায় করার পূর্ব পর্যন্ত আসমান-জমিনের মাঝে ঝুলন্ত থাকে। (আত তারগিব ওয়াত তারহিব)

সদকাতুল ফিতরের উদ্দেশ্য শুধু ‘গরিবদের ঈদের খুশিতে শরিক করা’ বলে যে ধারণা প্রচলিত রয়েছে, তা যথার্থ নয়। কেননা হাদিস শরিফে সদকাতুল ফিতরকে কাফফারাতুন লিসসাওম—অর্থাৎ রোজা অবস্থায় অবচেতনভাবে যে ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে যায়, তার কাফফারা বা ক্ষতিপূরণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সদকাতুল ফিতরের পরিচয়

‘সদকাতুল ফিতর’-এ দুটি আরবি শব্দ রয়েছে। সদকা মানে দান, আর ফিতর মানে রোজার সমাপন বা ঈদুল ফিতর। অর্থাৎ ঈদুল ফিতরের দিন আদায় করা সদকাকেই সদকাতুল ফিতর বলা হয়। এটিকে জাকাতুল ফিতর বা ফিতরাও বলা হয়ে থাকে।

ইসলামী শরিয়ত মতে, সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। পবিত্র হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) সদকাতুল ফিতর আবশ্যক করেছেন। এর পরিমাণ হলো, এক সা জব বা এক সা খেজুর। ছোট-বড়, স্বাধীন-পরাধীন ও নারী-পুরুষ সবার ওপরই এটি ওয়াজিব। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ১৫১২)

সদকাতুল ফিতর কার ওপর ওয়াজিব

সদকাতুল ফিতরের নিসাব জাকাতের নিসাবের সমপরিমাণ। অর্থাৎ কারো কাছে সাড়ে সাত ভরি সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা অথবা তার সমমূল্যের নগদ অর্থ কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অতিরিক্ত সম্পদ ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় বিদ্যমান থাকলে তার ওপর সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হবে। যাঁর ওপর সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব, তিনি নিজের পক্ষ থেকে যেমন আদায় করবেন, তেমনি নিজের অধীনদের পক্ষ থেকেও আদায় করবেন। তবে এতে জাকাতের মতো বর্ষ অতিক্রম হওয়া শর্ত নয়। (ফাতহুল ক্বাদির : ২/২৮১)। এমনকি পবিত্র রমজানের শেষ দিনেও যে নবজাতক দুনিয়ায় এসেছে কিংবা কোনো ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেছে, তার পক্ষ থেকেও সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে। (ফাতাওয়া আলমগিরি : ১/১৯২)

ফিতরার নিসাব

ঈদের দিন সুবহে সাদিকের সময় যার কাছে সাড়ে ৫২ তোলা রূপা বা সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ অথবা সমমূল্য পরিমাণ সম্পদ থাকে, তার উপর সদকায়ে ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। যে শিশু-সন্তানটি ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের পূর্বে ভূমিষ্ঠ হবে, তার ফিতরাও আদায় করতে হবে। অর্থাৎ পরিবারের যতজন সদস্য ফিতরাও ততটি আদায় করতে হবে।

সদকাতুল ফিতরের পরিমাণ

সদকাতুল ফিতরের পরিমাণ সম্পর্কে শরিয়তে দুটি মাপকাঠি নির্ধারণ করা হয়েছে, তা হচ্ছে ‘এক সা’ বা ‘নিসফে সা’। খেজুর, পনির, জব ও কিশমিশ দ্বারা আদায়ের ক্ষেত্রে এক ‘সা’=৩২৭০.৬০ গ্রাম (প্রায়)—অর্থাৎ তিন কেজি ২৭০ গ্রামের কিছু বেশি। এ ছাড়া গম দ্বারা আদায় করতে চাইলে ‘নিসফে সা’=১৬৩৫.৩১৫ গ্রাম, অর্থাৎ এক কেজি ৬৩৫ গ্রামের কিছু বেশি প্রযোজ্য হবে। (আওজানে শরইয়্যাহ, পৃ. ১৮)

রাসুল (সা.)-এর যুগে মোট চারটি পণ্য দ্বারা সদকাতুল ফিতর আদায় করা হতো। খেজুর, কিশমিশ, জব ও পনির। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, আমাদের সময় ঈদের দিন এক সা খাদ্য দ্বারা সদকা আদায় করতাম। আর তখন আমাদের খাদ্য ছিল জব, কিশমিশ, পনির ও খেজুর। (সহিহ বুখারি)

উল্লিখিত খাদ্যবস্তুর পরিবর্তে সেগুলোর কোনো একটিকে মাপকাঠি ধরে তার মূল্য আদায় করলেও তা আদায় হয়ে যাবে। মূল্যের দিক থেকে ওই খাদ্যবস্তুগুলোর মধ্যে তফাত থাকলেও সবচেয়ে কম দামের বস্তুকে মাপকাঠি ধরে যদি কেউ ফিতরা আদায় করে দেয়, তাহলেও তা আদায় হয়ে যাবে। বর্তমান বাজারদর হিসাবে যেহেতু গমের দামই সবচেয়ে কম, তাই ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে প্রতিবছর আধা ‘সা’ গমকে মাপকাঠি ধরে ওই সময়ের বাজারদর হিসাবে তার মূল্য ফিতরার সর্বনিম্ন পরিমাণ ঘোষণা করা হয়। এ বছর তা ৭০ টাকা। তবে এর মানে এই নয় যে ধনীরাও তাদের ফিতরা ৭০ টাকাই আদায় করবেন। উত্তম হলো, নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী বেশি মূল্যের খাদ্যবস্তুকে মাপকাঠি ধরে ফিতরা আদায় করা। কেননা সদকার মূল লক্ষ্যই হলো গরিবদের প্রয়োজন পূরণ ও তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ।

এ ছাড়া আদায়কারীর সামর্থ্যকেও বিবেচনায় রাখা উচিত। কেননা কেউ পাঁচ হাজার টাকা মূল্যের খেজুর খেতে অভ্যস্ত হয়ে যদি ২৫-৩০ টাকা মূল্যের গমের হিসাবে ফিতরা দেন, তবে তা কতটুকু যুক্তিযুক্ত সে প্রশ্ন বিবেকের কাছে থেকেই যায়। যদিও শরিয়তে সর্বনিম্ন মূল্যে ফিতরা আদায় করার দরজা খোলা রাখা হয়েছে।

ঈদগাহে যাওয়ার আগেই ফিতরা দেওয়া

ঈদুল ফিতরের দিন সকালে ঈদগাহে যাওয়ার আগে সদকায়ে ফিতর আদায় করা মুস্তাহাব। তবে সময়ের আগেও তা আদায় করা যায়। আবার কোনো কারণে সময় মতো আদায় করতে না পারলে পরেও আদায় করা যায়। অবশ্য পরে আদায় করলে ফজিলত কমে যাবে এবং সেটা সাধারণ দান বলে গণ্য হবে। কেউ আদায় না করে মারা গেলে তার পক্ষ থেকে তার উত্তরাধিকারী দিয়ে দিলেও আদায় হয়ে যাবে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের প্রত্যেক স্বাধীন, নারী, পুরুষ, ছোট-বড় সকলের ওপরে সদকায়ে ফিতর হিসেবে এক সা (সাড়ে তিন কেজি প্রায়) খেজুর অথবা এক সা যব ফরজ করেছেন। আর তা ঈদের নামাজে বের হওয়ার পূর্বেই আদায় করতে নির্দেশ দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদকাতুল ফিতর আদায় করাকে আবশ্যক করেছেন। এর পরিমাণ হলো, এক সা যব বা এক সা খেজুর। ছোট-বড়, স্বাধীন-পরাধীন সবার ওপরই এটা আবশ্যক। (সহিহ বুখারি)

আমাদের সমাজে অনেকেই ফিতরার সর্বনিম্ন পরিমাণ জনপ্রতি ৭০ টাকা হিসেবে আদায় করে থাকেন। এটা সর্বনিম্ন সম্পদের মালিকের জন্য ঠিক আছে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা যাদেরকে সামর্থ্য দিয়েছেন,  তাদের জন্য উচিত হলো ফিতরার সর্বোচ্চ পরিমাণ ২ হাজার ৩১০ টাকা আদায় করা। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সঠিকভাবে সদকাতুল ফিতর আদায়ের তাওফিক দান করুন। আমিন। সূত্র: ডেইলী বাংলাদেশ

এম২৪নিউজ/আখতার

Leave a Reply