রংপুরে দু’টি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত ৯, আহত কমপক্ষে ৭০

শেয়ার করুন

রংপুর অফিস:

রংপুরে দু’টি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৯ জনে জনে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৭০ জন। রবিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের তারাগঞ্জে খারুভাজ সেতুর কাছে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলে ৫ জন এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ৩টার দিকে ২ জন এবং ভোরে আরও ১ জনের মৃত্যু হয়। এছাড়া গতকাল সোমবার সকালে আরও ১ জনের মৃত্যু হয়।

দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ৭ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে তারাগঞ্জের হাড়িয়ালকুঠি এলাকার আনোয়ার হোসেন (৩৫), নীলফামারীর সৈয়দপুরের কুন্ডল এলাকার মহসিন হোসেন (৪২), পল্লী চিকিৎসক আনিছুর রহমান (৪৮), ধনঞ্জয় রায় (২৭) ও জীবন রহমান (২৮), সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক অলিউল হাসান জুয়েল (২৭), গাইবান্ধার সাদেক আলী (৬৫)। জেলা সিআডি পুলিশের সহায়তায় ফিঙ্গার প্রিন্টের মাধ্যমে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় মৃতদের সনাক্ত করেছেন।বিষয়টি তারাগঞ্জ হাইওয়ে থানার ওসি মাহবুব মোর্শদ সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন।

রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ শরীফুল হাসান দুর্ঘটনায় ৯ জন নিহতের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন মরদেহ হাসপাতাল মর্গে ময়না তদন্ত করে রাখা হয়েছে।

জানা যায়, প্রবল বৃষ্টির মধ্যে রাত সোয়া ১২টার দিকে রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের তারাগঞ্জ উপজেলার শলেয়াশাহ খারুভাজ সেতুর কাছে জোয়ানা পরিবহনের একটি বাসের সাথে ইসলাম পরিবহনের একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়রা উদ্ধার কাজে অংশ নেয়। আহত যাত্রীদের অভিযোগ, বেপরোয়া গাড়ি চালানো আর নেশার ঘোরে এ দুর্ঘটরা ঘটেছে। সড়কের রং সাইডে গাড়ি চালোনোর কারণে এ দুর্ঘটনা বলেও অভিযোগ তাদের।

রংপুরের তারাগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস এ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন ইনচার্জ খতিবুর রহমান বলেন, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ঘটনাস্থল থেকে ৫ জনের লাশ উদ্ধার করে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

তারাগঞ্জ হাইওয়ে থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ মাহবুব মোর্শেদ বলেন, রাত সোয়া ১২টার দিকে রংপুর-দিনাজপুর আঞ্চলিক সড়কের শলেয়াশাহ খারুভাজ সেতুর কাছে যাত্রীবাহী জোয়ানা পরিবহনের সাথে ইসলাম পরিবহনের একটি বাসের সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই ৫ জন নিহত হয়। দুর্ঘটনায় অন্তত ৭০ জন আহত হন। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় ব্যক্তিরা উদ্ধার কাজ শুরু করেন। হতাহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরো৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে মেডিকেলে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৩ জন অন্যরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।

হাইওয়ে থানার ওসি মাহবুব মোর্শদ সাংবাদিকদের জানান, ঘটনাস্থলে পাশর্^বর্তী নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর উপজেলার কুন্দুল পূর্বপাড়া গ্রামের মকবুল হোসেনের ছেলে মহসিন হোসেন সাগর (৪০), তারাগঞ্জ উপজেলার সয়ার ইউনিয়নের কাজীপাড়া গ্রামের মৃত কছিম উদ্দিনের পুত্র আনিসুর রহমান (৪৮), উপজেলার হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের ঝাকুয়াপাড়া গ্রামের মৃত মজিবর রহমানের পুত্র আনোয়ার হোসেন (৩৫), মানিকগঞ্জ জেলার বাকলা থানার শিবালয় গ্রামের আব্দুল খালেক ও ফিরোজা বেগমের পুত্র শহিদুল ইসলাম খোকন (৪২) ও অজ্ঞাতনামা আরো একজনের লাশ উদ্ধার করে হাইওয়ে থানায় নিয়ে আসা হয়। এরমধ্যে সাগর, আনিসুর ও আনোয়ারের পরিবারের লোকজন থানায় এসে লাশ সনাক্ত করায় পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের পলাশবাড়ী গ্রামের মৃত বিনোদ চন্দ্রের পুত্র ধনঞ্জয় (৪৫), সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ইউনিয়নের নিয়ামতপুর গ্রামের রায়হান আলীর পুত্র অলিউল হাসান জুয়েল (২৭), গাইবান্ধা জেলার সদর উপজেলার উত্তর গিদারী গ্রামের ফরাজ আলী ব্যাপারীর পুত্র সাদেক আলী ও অজ্ঞাতনামা আরো একজনের মৃত্যু হয়। তাদের লাশ রমেক হাসপাতাল মর্গে রয়েছে।

রংপুরের তারাগঞ্জে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে আহত অর্ধশতাধিক যাত্রীর পাশে দাঁড়িয়েছে রংপুর জেলা ছাত্রলীগ। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে রাতেই হাসপাতালে ছুটে যান রংপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এস এম সাব্বির আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক এ কে এম তানিম আহসান চপল। রাত থেকে আহত যাত্রীদের জন্য রক্ত সংগ্রহ, প্রয়োজনীয় ওষুধ, স্যালাইন ও খাবার পানি সরবরাহ করেছেন। ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তানিম আহসান চপল নিজেও চিকিৎসাধীন এক মুমূর্ষু রোগীকে এক ব্যাগ রক্ত দিয়েছেন।

রংপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এস এম সাব্বির আহমেদ বলেন, স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কাছে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে আমরা জেলা ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ রাতেই হাসপাতালে ছুটে যাই। এ সময় অর্ধশতাধিক আহত ব্যক্তিকে প্রয়োজনীয় ওষুধ, স্যালাইন, খাবার ও রক্তের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে।

রংপুরের জেলা প্রশাসক আসিব আহসান দুর্ঘটনায় হতাহতদের দেখতে গতকাল সোমবার সকালে হাসপাতালে যান।রোগীদের খোঁজখবর নিয়ে নিহতদের দাফনের জন্য প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার করে টাকা প্রদান করেন। আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিতের কথা জানান তিনি। একই সঙ্গে বাস দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তদন্ত কমিটি গঠন ও অনুদান প্রদান প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক আসিফ আহসান বলেন, দুই বাসের সংঘর্ষের ঘটনা তদন্তে তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল মিয়াকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে হবে। আহতদের চিকিৎসার খরচ জেলা প্রশাসন থেকে বহন করা হচ্ছে। নিহতদের পরিবারকে ২০ হাজার করে টাকা দেওয়া হবে।

এম২৪নিউজ/আখতার

Leave a Reply