রংপুরে ‘স্কুল ফিডিং’ সুবিধা হতে বঞ্চিত প্রাথমিকের প্রায় সোয়া লাখ শিক্ষার্থী

শেয়ার করুন

রংপুর অফিস:

রংপুর জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়া প্রায় সোয়া লাখ শিক্ষার্থী ‘স্কুল ফিডিং’ সুবিধা হতে বঞ্চিত হতে যাচ্ছে। আগামী মাস থেকে টিফিন হিসাবে খেতে দেওয়া বিস্কুট বিতরণ কার্যক্রম ঊহৃ কওর দেয়া হয়েছে। এতে দারিদ্র্যপীড়িত এ জেলার গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জের ৫‘শ ৬১টি সরকারি প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষার্থীরা পড়বে পুষ্টি সংকটে। বাড়বে প্রাথমিকে ঝড়ে পড়া শিশুর সংখ্যা বলে অভিজ্ঞ জনেরা মত প্রকাশ করেছেন।

সুবিধাভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা সরকার ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) সহায়তায় পরিচালিত ‘স্কুল ফিডিং’ প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানোর দাবি তুলেছেন তারা। টিফিনে উচ্চ পুষ্টিসম্পন্ন বিস্কুটের পরিবর্তে নগদ টাকা অথবা অন্য কোনো কিছু না দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সুবিধাভোগী স্কুলের শিক্ষকেরা। স্কুল ফিডিং প্রকল্পের মেয়াদ এ মাসে শেষ হবার কারণে জুলাই থেকে শিশুদের মধ্যে আর বিস্কুট বিতরণ করা সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সুত্রে জানা গেছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘স্কুল ফিডিং’ প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের প্রতিদিন টিফিন হিসাবে বিস্কুট খেতে দেয়া হয়। জেলার কাউনিয়া, গঙ্গাচড়া, তারাগঞ্জ ও বদরগঞ্জ উপজেলা ৫৬১টি স্কুলের ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৫৪ জন শিশু শিক্ষার্থী রয়েছে। যার মধ্যে তিস্তা, ঘাঘট, করতোয়া ও যমুনেশ্বরী নদী বিধৌত চরাঞ্চলের শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় ২৯ হাজার। এ প্রকল্পের মেয়াদ জুনে শেষ হলে আগামী জুলাই থেকে শিশুদের মধ্যে আর বিস্কুট বিতরণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বিতরণ কার্যক্রমে নিয়োজিত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর (এনজিও) সাথে প্রকল্প চুক্তির মেয়াদও শেষ হবে।

স্কুল ফিডিং প্রকল্পে দেওয়া একেকটি বিস্কুটের প্যাকেটের ওজন ৭৫ গ্রাম। এক প্যাকেট বিস্কুটে রয়েছে ৪৫০ কিলোক্যালরি। এর মধ্যে ১২৫ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ৭৫ মিলিগ্রাম ম্যাগনেসিয়াম। প্রচলিত অন্যান্য বিস্কুটের মতো সুস্বাদুও নয়। চিনির পরিমাণ কম বিস্কুটে চিনির পরিমাণ মাত্র ১২ শতাংশ। একবারে দুটি বিস্কুট খেয়ে বেশি পরিমাণ পানি খেতে হয়। তবে উচ্চমাত্রার পুষ্টিগুণ থাকায় একবারে আটটি বিস্কুট খেলে শিশুদের সমস্যা দেখা দেয়।

প্রাথমিকে শতভাগ ভর্তি নিশ্চিত ও ঝরে পড়া রোধ করতে স্কুল ফিডিংই একমাত্র উপায় বলে মনে করছেন শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। দরিদ্রপীড়িত শিশুদের পুষ্টি চাহিদা পূরণে স্কুল ফিডিং গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প। এনজিওগুলোর দাবি, সার্বিক দিক বিবেচনা করে চলমান স্কুল ফিডিং প্রকল্পের মেয়াদ আরো এক বছর বাড়ানো সম্ভব।প্রকল্পের সরকারি খাতে ৪ শত ৭৩ কোটি ৯ লাখ টাকা এখনো ব্যয় করা হয়নি।

গঙ্গাচড়া উপজেলার ইচলি বাগেরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যলয়ের প্রধান শিক্ষক আইয়ুব আলী জানান, তিস্তা বেষ্টিত এখানকার চরাঞ্চলের শিশুরা স্কুল ফিডিং সুবিধার আওতায় থাকার কারণে ঝড়ে পড়া কমে এসেছে। চলতি বছরে ইচলি বাগেরহাট স্কুলে ৩৬১ জন শিক্ষার্থী স্কুল ফিডিং প্রকল্পের সুবিধায় নিয়মিত বিস্কুট পেয়েছেন। করোনার কারণে স্কুল বন্ধ থাকলেও বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিস্কুট পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এটা হঠাৎ বন্ধ করলে প্রাথমিকে ঝড়ে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ফের বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিবে।

কাউনিয়া উপজেলার মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ ইকবাল হোসেন জানান, সরকার প্রাথমিকে শিক্ষার্থীদের ঝড়ে পড়া রোধে যত প্রকল্প হাতে নিয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে সফল ও কার্যকর প্রকল্প স্কুল ফিডিং। এই প্রকল্পটি শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করেছে।

কাউনিয়ার সরদা তালুক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক নুর মোহাম্মদ বলেন, আমার মত গরীবের অনেক সমস্যা। টাকা-পয়সার অভাবে বাচ্চাদের ঠিক মতো পুষ্টিকর খাবার দিতে পারি না। সরকার থেকে স্কুল ফিডিং চালু করছে। এটার কারণে আমার দুইটা বাচ্চা স্কুলে টিফিনের সময়ে বিস্কুট পায়, এটা নাকি শরীরের জন্য খুবই ভালো। আমার ছোট ছেলে তো বিস্কুটের আশায় স্কুল যায়।

রংপুর জেলায় স্কুল ফিডিং প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা প্রকল্প সমন্বয়কারী শাহিন হক জানান, জেলায় চারটি উপজেলার দুটি এনজিওর ২৯ জনকে নিয়ে স্কুল ফিডিং প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে। কর্মরত সবাই চুক্তিভিত্তিক কাজ করছেন। তাদের মাধ্যমে চার উপজেলার ৫৬১টি সরকারি প্রাথমিক স্কুলের ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৫৪ জন শিক্ষার্থী স্কুল ফিডিংয়ের আওতায় বিস্কুট পেয়ে আসছে। এর মধ্যে গঙ্গাচড়ার ১৮০টি স্কুলের ৩৭ হাজার ৫২৩ জন, কাউনিয়ার ১২৮টি স্কুলের ২৫ হাজার ১৭৭, বদরগঞ্জে ১৭৭টি স্কুলের ৩৪ হাজার ৩৪৯ এবং তারাগঞ্জের ৭৬টি স্কুলের ১৭ হাজার ১৫৬ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।

তিনি আরো জানান, এ মাসের ৩০ জুন পর্যন্ত চলমান প্রকল্পে সারা দেশে ব্যয় হবে ৪ হাজার ৫১৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ২৬৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা এবং প্রকল্পের সাহায্যের সমুদয় টাকা ব্যয় হবে। এছাড়া সরকারি খাতে ৪ শত ৭৩ কোটি ৯ লাখ টাকা এখনো ব্যয় করা হয়নি। প্রকল্পের কার্যক্রম চলামান না থাকলে এ টাকা ফেরত চলে যাবে। এ অবস্থায় অব্যয়িত টাকা দিয়ে স্কুল ফিডিং প্রকল্পের চলমান বিদ্যালয়গুলোতে কেবল উচ্চ পুষ্টিমান সমৃদ্ধ বিস্কুট প্রদান করা হলে আগামী জুলাই থেকে ১২ মাস এ কার্যক্রম চালানো সম্ভব হবে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ,এম শাহজাহান সিদ্দিক বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ জুনেই শেষ হবে। পরের মাস থেকে শিক্ষার্থীরা আর পুষ্টিসম্পন্ন বিস্কুট পাবেন না। সরকার এখনো প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। নতুন করে প্রকল্প নিয়ে কাজ করতে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় চিন্তাভাবনা করছে।তিনি আরো বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার কমাতে ২০০১ সালে স্কুল ফিডিং প্রকল্প চালু করে সরকার। এরপর ১৬ বছরে মাত্র ১৭ শতাংশ শিশুকে এর আওতায় আনা হয়েছে। এ প্রকল্প বন্ধ হলে দরিদ্রপীড়িত পরিবারের শিশুদের স্কুলমুখী করতে একটু সমস্যা হবে।

এম২৪নিউজ/আখতার

Leave a Reply