বেরোবিতে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে গবেষণা ইনস্টিটিউটের নির্মাণ কাজ

শেয়ার করুন

রংপুর অফিস:

সীমাহীন দুর্নীতি, নির্মাণকাজে ধীরগতি, বারবার নকশা পরিবর্তন, প্রকল্প পরিচালকের স্বেচ্ছাচারিতা এবং অনিয়মের মাধ্যমে ১ম পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে ২য় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেয়া সহ নানা অনিয়মের কারণে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বরাদ্দকৃত স্বপ্নের বিশেষ উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পের বাস্তবায়ন।

এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণ কাজ বন্ধ থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পরিণত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নামের ছাত্রী হল এবং ড. ওয়াজেন মিয়ার নামে একটি গবেষণা ইনস্টিটিউটের নির্মাণকাজ। ফলে ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশংকা রয়েছে বলে মনে করেন অভিজ্ঞমহল।

জানা যায়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের আবাসিক সংকট সমাধানের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাঁরই নামে ১হাজার আসন বিশিষ্ট একটি ছাত্রী হল, তাঁর প্রয়াত স্বামী বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার নামে প্রতিষ্ঠিত গবেষণা ইনস্টিটিউটের জন্য ১০তলা বিশিষ্ট একটি স্বতন্ত্র ভবন নির্মাণ ও স্বাধীনতা স্মারক নির্মাণের জন্য প্রায় ১০৩.৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

২০১৫ সালের ১৩ জানুয়ারি একনেক সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন হয়। প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল- ১লা জানুয়ারি ২০১৫ হতে ৩০ জুন ২০১৮ইং পর্যন্ত। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আর্কিটেক মনোয়ার হাবিব ও প্রাকৃত নির্মাণ লিমিটেড (জয়েন্ট ভেন্চার)কে প্রকল্প মেয়াদকালীন সময় পর্যন্ত পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয় এবং কার্যাদেশও প্রদান করা হয়।

কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রথম পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আর্কিটেক মুনাওয়ার হাবিব ও প্রাকৃত নির্মাণ লিমিটেড (জয়েন্ট ভেন্চার) কর্তৃক দাখিলকৃত আর্কিটেকচারাল ডিজাইন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পছন্দ করেন এবং অনুমোদন দেয়ার পর ২০১৭ সালের ৪ জানুয়ারী ভিডিও কনফারেন্সিং এর মাধ্যমে তিনি নিজেই এসব ভবন এর নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন।

২০১৭ সালের ১৪ জুন প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪থ উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর পরই প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বও গ্রহণ করেন এবং প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে কোন কারণ ছাড়াই প্রায় ১৮ মাস প্রকল্পের নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখেন। ড. কলিমউল্লাহ উদ্দেশ্য প্রনোদিতভাবে বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজ তদারকি করার জন্য তাঁর ভাগ্নে আর্কিটেক্ট মঞ্জুর কাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস কমিটি সদস্য নিয়োগ করেন। সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই আর্কিটেক্ট মঞ্জুর কাদের সাবেক উপাচার্য ড. কলিমউল্লাহকে ব্যবহার করে ক্ষমতার অপব্যবহার করা শুরু করেন।

ড. কলিমউল্লাহ’র ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে মঞ্জুর কাদের পিপিআর-২০০৮ এবং পিপিএ-২০০৬ আইন এবং পূর্বে স্বাক্ষরিত চুক্তি লঙ্ঘন করে ১ম পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আর্কিটেক মুনাওয়ার হাবিব ও প্রাকৃত নির্মাণ লিমিটেড (জয়েন্ট ভেন্চার) এর কার্যাদেশ ২৯ শে এপ্রিল’ ২০১৮ ইং তারিখে কোন কারণ ছাড়াই বাতিল করে দেন। যদিও প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যাদেশ বাতিল সংক্রান্ত কোন পত্র প্রেরণ করা হয়নি। বৈধ ১ম পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এর কার্যাদেশ বাতিল করার পাশাপাশি মঞ্জুর কাদের স্বত্তাধিকারী আর্কিটেক মনোয়ার হাবিবকে নানাভাবে ভয়ভীতিও প্রদর্শন করেছেন বলে অভিযোগ আছে।
প্রথম পরামর্শককে মৌখিকভাবে বাতিলের পরপরই সাবেক উপাচার্য নাজমুল হাসান কলিমউল্লাহ নিজের ভাগ্নে আর্কিটেক্ট মঞ্জুর কাদের হেমায়েত উদ্দিনকে সকল নিয়ম ভঙ্গ করে মেসার্স এ্যাকিউম্যান আর্কিটেক্ট এন্ড প্লানার্স লিমিটেড এর নামে (জয়েন্ট ভেন্চার এর মাধ্যমে) সম্পূর্ণ বেআইনীভাবে ২য় পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন।

পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর সাবেক উপাচার্য কলিমউল্লাহ এবং তাঁর ভাগ্নে মঞ্জুর কাদের প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক অনুমোদিত এবং উদ্বোধনকৃত ভবন দুটির নকশার আমুল পরিবর্তন করেন এবং ভবন দুটিকে ডিজাইন বহির্ভূত অতিরিক্ত এবং মাত্রাতিরিক্ত লোড চাপিয়ে দিয়ে ঝুকিপূর্ন ভবনে পরিণত করেন। যদি মঞ্জুর কাদের কর্তৃক প্রদত্ত নকশা অনুযায়ী ভবন ২টি নির্মান করা হতো তাহলে প্রায় ১হাজার থেকে ১হাজার৫ শত ছাত্র-ছাত্রী মৃত্যু ঝুকির মধ্যে থাকতেন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞগণ। মঞ্জুর কাদের শুধু ভবনকেই ঝুকিপূর্ন করেননি পাশাপাশি নির্মান ব্যয় বাড়িয়েছেন দুই গুনেরও বেশি। ড. ওয়াজেদ রিসার্চ এন্ড ট্রেইনিং ইনিষ্টিটিউট ভবনে নির্মান ব্যয় ২৬ কোটি ৮৭ লাখ থেকে বাড়িয়ে সংশোধিত ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৬১ কোটি টাকা যা ১২৭% শতাংশ বেশি। শেখ হাসিনা ছাত্রী হল নির্মান ব্যয় ৫১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে সংশোধিত ডিপিপিতে ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১০৭ কোটি টাকা যা ১০৮% শতাংশ বেশি।

অন্যদিকে, মূল ডিপিপিতে পরামর্শক ফি বরাদ্দের চেয়ে অতিরিক্ত প্রায় ৭০.০০ (সত্তুর) লক্ষ টাকা সাবেক উপাচার্য কলিমউল্লাহ ও তার দুর্নীতির সহযোগী অবৈধভাবে ২য় পরামর্শক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত ভাগিনা মঞ্জুর কাদের হেমায়েত উদ্দিন একে অপরকে লাভবান করার উদ্দেশ্যে পরস্পর যোগসাজসে আত্মসাৎ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব অবকাঠামো নির্মাণে অবহেলা, দীর্ঘসূত্রিতা, অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে তা সাবেক উপাচার্য কলিমউল্লাহ ও তার ভাগ্নে মঞ্জুর কাদেরের অনৈতিকতা, অদক্ষতা এবং ব্যক্তিগত ইচ্ছা অনিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ও শিক্ষা গবেষণার সুযোগ সৃষ্টির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিও চরমভাবে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে।

অপরদিকে, ২০১৯ সালের ১২ ডিসেম্বর শিক্ষামন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্টিয়ারিং কমিটির সভায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পের নানা অসঙ্গতি নজরে আসলে ইউজিসিকে তদন্তের নির্দেশ দেয়। গত ১৭ জানুয়ারি, ২০২১ ইং তারিখে সরেজমিন পরিদর্শনে এসে দুর্নীতি ও অনিয়মের সত্যতা পায় এই তদন্ত কমিটি।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ১ম পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সাথে সমঝোতা না করে ২য় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেয়া পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তির নিয়মাবলীল সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এছাড়া, আর্কিটেক্ট মনজুর কাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন ওয়ার্কস কমিটির সদস্য হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক উপাচার্য কর্তৃক মনোনীত থাকার পরও এই সময়ে দ্বিতীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত মেসার্স একিউম্যান আর্কিটেক্ট এন্ড প্লানার্স লিমিটেড ভবন দুটির সংশোধিত ড্রইং বা ডিজাইন প্রণয়ন করে প্রকল্প পরিচালক উপাচার্যের নিকট থেকে অনুমোদন নিয়েছেন। এই সময়ে আর্কিটেক্ট মঞ্জুর কাদের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস কমিটির সদস্য থাকা সত্তে¡ও এরকম একটি অগ্রহণযোগ্য এবং ঝুঁকিপূর্ণ ড্রয়িং বা ডিজাইন অনুমোদিত হয়েছে। তাই তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে আর্কিটেক্ট মনজুর কাদেরকে কমিটি থেকে অব্যাহতি দেয়া স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তদন্ত কমিটি।
সাবেক উপাচার্য নাজমুল হাসান কলিমউল্লাহ নিজের ভাগ্নে মেসার্স আর্কিটেক্ট এর সত্বাধীকারী মঞ্জুর কাদের হেমায়েত উদ্দিনের সাথে যোগাযেগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার পুত্র বর্ণ মোবাইল রিসিভ করে বলেন, বাবা জুম মিটিংএ আছেন।ফ্রী হলে আপনার সাথে কথাবলতে বলবো।

২০১৯ সালের ১২ ডিসেম্বর শিক্ষামন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্টিয়ারিং কমিটির সভায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পের নানা অসঙ্গতি নজরে আসলে ইউজিসিকে তদন্তের নির্দেশ দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ২০২০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ইউজিসির সম্মানীত সদস্য প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আলমগীরকে আহবায়ক করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বিমকের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক ও সচিব ড. ফেরদৌস জামান এবং অতিরিক্ত পরিচালক ড. দূর্গারানী সরকার। গত ১৭ জানুয়ারি,২০২১ ইং তারিখে সরেজমিন পরিদর্শনে এসে দুর্নীতি ও অনিয়মের সত্যতা পান এই তদন্ত কমিটি। কমিটি এবিষয়ে একটি বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন সুপারিশসহ শিক্ষামন্ত্রণালয়ে দাখিল করেছেন।

কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল মেসার্স মোঃ আব্দুস সালাম (জেভি)। এই নাম দিয়েই দরপত্রে অংশগ্রহন করে তারা সর্বনি¤œ দরদাতা হয়ে কার্যাদেশ পান। পূর্বতন প্রশাসন মেসার্স মোঃ আব্দুস সালাম (জেভি) এর সাথে চুক্তি সম্পাদন করেন। তিনটি প্রতিষ্ঠান মিলে জয়েন্ট ভেনচার প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়। প্রতিষ্ঠান তিনটি ক) মেসার্স ওয়াহেদ কনস্ট্রাকশন লিঃ, খ) মেসার্স মোঃ আব্দুস সালাম এবং গ) মেসার্স মোঃ হাবিব এন্ড কোং। অতঃপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভবন সমূহের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করলে প্রতিষ্ঠানটি নীচতলা পর্যন্ত কাজ করেন এবং পূর্বতন উপাচার্য এর নিকট থেকে যথারীতি ১ম চলতি বিল উত্তোলন করেন।

বর্তমান উপাচার্য যোগদানের পর উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রায় ১৮ মাস নির্মান কাজ বন্ধ করে রাখেন। হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য পিপিআর-২০০৮ এবং পিপি এ্যাক্ট-২০০৬ না মেনেই ঠিকাদারকে প্রেশারাইজ্ড করে নাম পরিবর্তনে বাধ্য করেন।

শেখ হাসিনা ছাত্রী হলের ঠিকাদারের নতুন নাম দেয় হয় ডাবিøউসিএল-মোঃ আব্দুস সালাম-মোঃ হাবিব এন্ড কোং (জেভি) যা অবৈধ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ছাড়া আর কিছু নয়। কোনরুপ টেন্ডারিং প্রক্রিয়া ছাড়াই এবং কমিটির অনুমোদন ছাড়াই নতুন নামে ঠিকাদারকে চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন। নতুন করে চুক্তি স্বাক্ষর করেন, নোটিফিকেশন এ্যাওয়ার্ড এবং কার্যাদেশ প্রদান করেন। নতুন প্রতিষ্ঠানের নামেই ঠিকাদারকে কাজ না করেও বিপুল পরিমান অতিরিক্ত বিল প্রদান করেন।ডক্টর ওয়াজেদ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছ।

এম২৪নিউজ/আখতার

Leave a Reply