একজন আবুল হোসেন তালুকদার (দ্বিতীয়/শেষ পর্ব)

শেয়ার করুন

নূরুল ইসলাম বরিন্দী ।। 

সপ্তাহ খানেক আগেও তালুকদারের হাতে এসেছিলো বেতন-বোনাসসহ প্রায় হাজার দশেক টাকা। পাঁচ হাজার ধার-দেনা পরিশোধ করার পর হাতে ছিলো আরো পাঁচ হাজার। স্ত্রীর জন্য দুটো শাড়ি, তিন ছেলেমেয়ের জন্য জামা-কাপড় এক হাজার, নিজের হাত খরচের জন্য এক হাজার। বাকি তিন হাজার টাকা ইদ-বাজেট। হিসেব-নিকেশটা এভাবেই করেছিলেন তালুকদার। কিন্তু সবকিছু ওলোট-পালোট করে দিলো একরাতে লাখপতি বনে যাবার লোভটা। সপ্তাহব্যাপী ইদ বাম্পারের মোটা অংকের টাকার লোভে প্রত্যহ ফুল শিট কিনে খেলেছেন হাউজি। ফালতু লাইন-টাইনের জন্য নয়, লাখ টাকার বাম্পারটার লোভ। ভাগ্যদেবী সুপ্রসন্ন হতে হতেও কেন যে অপ্রসন্ন হয়ে গেলো আজ!

তিনি, আবুল হোসেন তালুকদার। একটি প্রাইভেট ফার্মের সহকারী অ্যাকাউন্টেন্ট। মাসে বেতন পান ছয় হাজার টাকা। বছরে বোনাস চারটে। আজ পনেরো বছর ধরে চাকরি করছেন রাজধানী ঢাকা শহরে। বাসা ভাড়া করে মোটামুটি স্বাচ্ছন্দেই চলার অ্যামাউন্টই পান। অথচ পরিবারকে রেখেছেন গ্রামের বাড়িতে। থাকেন কমলাপুরে, পাঁচ শ’ টাকা সিটরেন্টের একটা মেসে। দশটা-পাঁচটা অফিস করেন। মাসের বেতন পেয়ে স্ত্রীকে পাঠিয়ে দেন দেড়-দু-হাজার টাকা। বাকি টাকা দিয়ে ধুমসে হাউজি খেলেন মাসের পনেরো দিন। বাকি পনেরো দিন চলে ধার-দেনা করে। তাতেও না কুলালে লোন নেন প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে। হাউজি! এই একটিমাত্র বদ অভ্যাস ছাড়া অন্য কোনো কিছুতে আসক্তি নেই তার। ঢাকা শহরের যে কটা ক্লাবে সন্ধ্যার পর হাউজি খেলা হয়।

সবগুলোতেই মোটামুটি উপস্থিতি থাকে তালুকদারের। দশ বছরের হাউজি খেলার জীবনে কোনোদিনও একটা হাউজ বা বাম্পার জোটেনি কপালে। সবচেয়ে বড়ো আফসোস তার এটাই। তবে আশা ছাড়েন নি। একটা বাম্পার পেতেই হবে তাকে। ভয়ানক জেদি মানুষ তিনি। এই দশ বছরে কম টাকা যায়নি হাউজিতে। তবে একটা বাম্পারে ‘ইয়েস’ হলেই  এই সর্বনাশা খেলাটা ছেড়ে দেবেন—এ রকম চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মনে মনে নিয়ে ফেলেছেন অনেকদিন আগেই। আর সেই আশাতেই সন্ধ্যা হলেই ছুটে যান ক্লাবগুলোয় ।

ফুতপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে চিন্তার স্রোতে বাধা পড়ে তালুকদারের। দ্রুতগামী একটা কারের নিচে পড়তে পড়তেও বেঁচে গেলেন তিনি। ড্রাইভার গাড়ির ব্রেক না চাপলে ভবলীলাই সাঙ্গ হতো অল্পের জন্য।   স্টেডিয়ামের পুবের গেট, চব্বিশতলা ভবন পেছনে ফেলে মতিঝিলের দিকে যেতে যেতে ফের থমকে দাঁড়ালেন তালুকদার। বামে পৌরসভার পার্ক। হলদে রং-এর ঘোলাটে বাল্বের আলোয় কেমন ফ্যাকাশে লাগছে পার্কটা। সবকটা বেঞ্চ খালি। কোথাও কেউ নেই। হঠাৎ এরকম নির্জনতা কেন জানি ভালো লেগে গেলো তালুকদারের। পায়ে কোনো বোধশক্তি পাচ্ছেন না। কেমন অবশ অবশ ঠেকছে। আস্তে আস্তে ভেতরে ঢুকে একটা বেঞ্চে বসে পড়লেন তিনি। বেশ কনকনে হাওয়া বইছে। চারদিকে আবছা কুয়াশা। একটু আগে মাটিতে ফেলে দেয়া সিগারেটের আগুনে আরেকটা সিগারেট ধরালেন তালুকদার। ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে হাল্কা করার চেষ্টা করতে লাগলেন তিনি। মন থেকে ঝেড়ে মুছে ফেলতে চাইলেন হাউজি, টাকা-পয়সা, স্ত্রী, ছেলে-মেয়েদের চিন্তা। কিন্তু কিছুতেই পারলেন না। ওসব চিন্তা-ভাবনা যেন ক্ষ্যাপা কুকুরের রূপ নিয়ে ঘেউ ঘেউ করে ছুটে আসতে থাকে চারদিক থেকে। ভয়ংকর আক্রোশে যেনো ধারালো দাঁত বসিয়ে দিতে থাকে

তালুকদারের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে। অসহ্য যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যেতে যেতে তালুকদার অনুভব করতে থাকেন কুয়াশার আস্তরণ ভেদ করে তার দিকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পতিব্রতা স্ত্রী হাজেরা খাতুনের করুণ দুটি চোখ। আর তার পাশে অসহায় ভঙ্গিমায় উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে পিতৃস্নেহের কাঙ্গাল তিন তিনটে সন্তানের কচি কচি মুখ।

আবার নিজের ভেতরে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন তালুকদার। বুকের গহিন থেকে উঠে আসা হতাশার গ্লানিতে দুমড়ে মুষড়ে যেতে থাকেন তিনি। নিজের অজান্তেই প্রার্থনার ভঙ্গিতে উপরে উঠে যায় তার দুহাত। মনে মনে বিড় বিড় করে উচ্চারণ করতে থাকেন—“হে আমার প্রাণপ্রিয় স্ত্রী হাজেরা খাতুন, আমি আবুল হোসেন তালুকদার, তোমার বিশ্বাস হন্তারক স্বামী, হে আমার অবোধ সন্তানেরা, আমি তোমাদের একজন অক্ষম পিতা, প্রবঞ্চকের ভূমিকায় অভিনয়  করে চলেছি দীর্ঘ দশ বছর ধরে। বিশ্বাস করো আমি তোমাদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য একান্তভাবেই আন্তরিক ,কিন্তু নিষ্ঠুর ভাগ্য আমার সঙ্গে প্রতারণা করছে। এর জন্য দায়ী অবশ্যই আমি, আর কেউ নয়। তোমরা আমাকে ক্ষমা করো। ”–এবং এভাবে, বদ্ধ পাগলের মতো প্রলাপ বকতে বকতে হঠাৎ তালুকদারের খেয়াল হলো তার আশেপাশে কেউ নেই। তিনি নির্জন পার্কে হলুদ আলোর ভূতুড়ে পরিবেশে চারদিকে ঘন কুয়াশার বৃত্তে বন্দি হয়ে বেঞ্চে বসে আছেন একা। তিনি ঊর্ধ্বাকাশে প্রসারিত করা হাত দুটো ধীরে ধীরে নামিয়ে আনলেন নিচে। যেনো অপরাধ করে ধরা পড়ে গেছেন কারো কাছে, তার অস্বাভাবিক আচরণের জন্য, এরকম একটা লজ্জাবোধ ফুটে উঠলো তার চোখে-মুখে।

গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। শীতের মধ্যে ডুবে থেকেও পানির পিপাসা তীব্র হয়ে উঠলো তালুকদারের। ঠোঁট দিয়ে জিহ্বা চেটে নিলেন বারকয়েক। তারপর উঠে দাঁড়াতে গিয়ে মনে হলো বেঞ্চের সঙ্গে প্লাস্টার হয়ে গেছে তার নিম্নাঙ্গ। আমৃত্যু যেনো এ বেঞ্চ ছেড়ে ওঠা হবে না তার। অতঃপর নিঃসাড়ে বসে থাকলেন কতোক্ষণ। আবার সেই আত্মপীড়নের মহড়ায় নেমে আসে দুর্ভাবনার কিলবিলে পোকাগুলো। স্বেচ্ছা-প্রণোদিত ব্যর্থতার গ্লানিগুলো শরাঘাতে শুধুই জর্জরিত করতে থাকে তাকে।

আবার তিনি বিড় বিড় করতে থাকেন—“আমি আবুল হোসেন তালুকদার, ভদ্র মার্জিত চরিত্রের একজন উচ্চাকাংক্ষী মানুষ। পনেরো বছরের চাকরি জীবনে কী করেছি আমি? মাসে ছয় হাজার টাকা মাইনে। বছরে চারটে বোনাস। হা হা! এমন সুখের চাকরিজীবী আর কজন আছে বাংলাদেশে? পরিচিত অনেকেই তো তারচেয়ে কম টাকা রোজগার করে অন্তত মাথা গোঁজার মতো ঠাঁই করে নিয়েছে এই ঢাকা শহরে। অথচ আমি, বোকা, লম্পট, সোজা সরল লোভী মানুষটা সন্তান পরিবার নিয়ে বাস করতে পারি না। সঙ্গতি থাকতেও জীবন সংগ্রামে পরাজিত একজন মানুষের ভূমিকায় অভিনয় করে চলেছি দিনের পর দিন। স্ত্রীকে কোনোদিন বলিনি আমি মাইনে কতো পাই। অফিস ছুটির পর রাত দশটা নাগাদ কোথায় সময় কাটাই তা-ও বলিনি কোনোদিন। স্বামীব্রতা বোকা মহিলা জিজ্ঞেসও করেনি কোনো সময়। আসলে এ যুগের এক ব্যতিক্রমী নারী হাজেরা নামের মহিলাটি। দেড় হাজার টাকা বাসাভাড়া আর আনুষঙ্গিক খরচের জন্য দুই হাজার–এই সাড়ে তিন হাজারের খরচের বাজেটটাই তার মুখস্থ। ছয় হাজারের বাকি টাকা কোথায় যায় তা কী করে জানবে হাজেরা? তাই, যখন টানাটানির অজুহাত তুলে গ্রামের বাড়িতে স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রস্তাব করলাম অমনি এককথায় রাজি হয়ে গেলো হাজেরা খাতুন। রাজি হওয়ার পেছনে আরো একটা সুন্দর যুক্তি ছিলো । তা হলো মাসে দুই হাজার করে জমালেও  তো পাঁচ বছরে মোট দাঁড়ায় গিয়ে এক লাখ কুড়ি হাজার টাকা। তালুকদার যদি কষ্ট করে মেসে থেকে এ টাকাটা জমাতে পারে মন্দ কী? হায়রে নারী জাতি! তোমাদের এরকম সরল বিশ্বাসের জন্যই তো সংসারে পদে পদে নেমে আসে সীমাহীন আর্থিক বিপর্যয় ।

সেদিন ঠাট্টা করে তো আমি হাজেরাকে বলেই ফেলেছিলাম—‘পুরুষ চরিত্রম দেবা নঃ জানন্তিঃ’। হাজেরা এ হেঁয়ালির বিন্দু-বিসর্গও বুঝতে পারেনি সেদিন। আর আমি, বিশ্ব-প্রতারক আবুল হোসেন তালুকদার, স্ত্রীর সেই সরলতার সুযোগ নিয়ে সন্তানসহ বিতাড়িত করেছি গ্রামের বাড়িতে, পাঁচ বছর আগে। মাইনে পেয়েই দেড় হাজার টাকা মানিওর্ডার করি হাজেরা খাতুনের নামে, বাকি টাকায় মহাফুর্তিতে ক্লাবে গিয়ে হাউজি খেলি মাসের পনেরো দিন। শেষের দিকে টানাটানি পড়লে ধার-কর্জ করি বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে। যারা ধার দেয় তারা ভালো করেই জানে চাকরির আয়-রোজগার আমার তেমন একটা খারাপ নয়। হাউজিতে মাঝেমধ্যে পাঁচ শ বা হাজার খানেক টাকা যে পাই না তা নয়। তবে তা সমুদ্রে একফোঁটা বারি বিন্দুর সমান। কিছুই হয় না তা দিয়ে। আমার মূল টার্গেট হচ্ছে বাম্পার। একদাগে মোটা অংকের টাকা। তারপর শালার জায়গা জমি নয়, ছোট-খাটো একটা বাড়িই কিনে ফেলবো এই ঢাকা শহরে। গত ইদে দু-দুটা বাম্পার মেরেই তো জাফর সাহেব রামপুরায় বাড়ি কিনে ফেলেছেন। অথচ উনিও সারা জীবন ভাড়াটে বাসাতেই কাটিয়েছেন। কপাল ফিরতে কতোক্ষণ? শুধু একটু আল্লাহর রহমত। আমি তো কারো অন্যায় করিনি। অসৎভাবে জীবনযাপনকেও মনে-প্রাণে ঘৃণা করে এসেছি। অবৈধভাবে টু-পাইস কামাবার ফন্দি-ফিকিরও করি না। নিজে কষ্ট করছি । স্ত্রী, ছেলে-মেয়েদের কষ্ট দিচ্ছি। কষ্ট করলে নাকি কেষ্ট মেলে। খারাপের মধ্যে ওই একটা জিনিস। হাউজি। হাউজির নেশা। খারাপইবা বলি কেনো। চুরিচামারি তো নয়। ভাগ্য পরীক্ষা। পয়সা দিয়ে পয়সা ধরবার টেকনিক। তাছাড়া আমি তো আর সারা জীবনের মৌরসিপাট্টা হিসেবে নিচ্ছি না ওটাকে। দুটো কী একটা বাম্পারে ‘ইয়েস’ হওয়া, ব্যস। আর ভুলেও পা বাড়াবো না ওদিকে।

মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দেখলে আমি পীড়িত হই না বা পরশ্রীকাতরতা আমার মধ্যে নেই এ কথা হলফ করে বলতে পারবো না। আবার এ-ও জানি যা বেতনকড়ি পাই হিসেব করে চললে অনেকেরই চোখে ঈর্ষার পাত্র হয়ে উঠতে পারি। কিন্তু সর্বনাশ করেছে ওই হাউজি খেলার বাম্পার পাওয়ার লোভটা। দশ বছর আগে যে বারেক মিয়ার হাতে হাউজিতে আমার হাতেখড়ি, সেই বারেক মিয়া এখন এ নেশা ছেড়ে দিয়েছে। স্বেচ্ছায় নয়, ঢাকা থেকে বদলি হওয়ার কারণে। ঢাকায় থাকলে অবশ্য আমার মতো বাম্পার পাওয়ার আশায় বহালই থাকতো হাউজির নেশাটা। দশ বছরের খতিয়ান মেলাতে গিয়ে মাঝেমধ্যে অবশ্য মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। মাসে কম করে হলেও তিন হাজার টাকা পেলে বছরে দাঁড়ায় ছত্রিশ হাজার। সুস্থ মানুষের মাথা খারাপ হওয়ার যোগাড়। কিন্তু আমি বড্ড পাষাণ হৃদয়ের মানুষ। লোকসানের দায়ভাগ নিজের কাঁধে বোঝা হলেও নীরবে বয়ে বেড়াই। প্রকাশ করি না। কাউকে জানতে দিই না। স্ত্রী হাজেরা খাতুন যদি জানতে পারতো হিসেবটা? ওর মতো বোকা মেয়ে মানুষের কথা মনে হলে ভয়ানক হাসি পায় আমার। ও এখনো চিঠি লেখে এ পর্যন্ত কতো টাকা ব্যাংকে জমিয়েছি আমি।

পাঁচ বছর তো হয়েই গেলো গ্রামের বাড়িতে। এখনো কী দু কাঠা জমি কেনার মতো হাতে টাকা জমেনি আমার? দুই বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা হয়ে আরও কতোকাল থাকতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। হায়রে পতিব্রতা নারী! আমি তোমার স্বামীধন , আবুল হোসেন তালুকদার কতো বড়ো একজন বদমাশ প্রতারক তা যদি জানতে পারতে!”—রাত এখন কতো? কতোক্ষণ ধরে এভাবে নির্জন পার্কের বেঞ্চে একাকী বসে আছেন তালুকদার মনে নেই। চমক ভাঙ্গে দূরের পেটা ঘড়িতে রাত বারোটা বাজার সময়-সংকেত শুনে। আস্তে আস্তে বেঞ্চটা ছেড়ে উঠে দাঁড়ান তিনি। আরেকটা সিগারেট ধরাতে গিয়ে দেখলেন পকেট শূন্য। কম করে হলেও দশটা পোড়া সিগারেট পড়ে আছে তার পায়ের কাছে। কুয়াশার ভেতর থেকে একটা রিকশা বেরিয়ে আসতেই সেদিকে এগোলেন তালুকদার। ‘কমলাপুর যাইবা’ বলতে গিয়ে মনে পড়ে যায় শূন্য পকেটের কথা। অতঃপর তিনি মতিঝিলের ফাঁকা রাস্তা ধরে ত্রস্ত পায়ে হাঁটতে থাকেন কমলাপুর অভিমুখে।

মেসের রুমমেটরা ঘুমিয়ে পড়েছে সবাই। গভীর রাত অব্দি বাইরে থাকার অভিযোগ থেকে আপাতত রেহাই। কোনো রকম দু -লোকমা মুখে গুঁজে দিয়ে বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়লেন তালুকদার। যদিও বাম্পারের চান্স পাওয়ার   টেনশনটা থিতিয়ে এসেছে তবুও ঘুম আসছে না দু-চোখের পাতায়। পরশু ইদ! কাল সকালে দেশের বাড়ি যাবার কথা । কোন মুখে একেবারে খালি হাতে বাড়ি যাবেন তিনি? ভাবতে ভাবতে হঠৎ চিন্তাটা মাথায় এসে গেলো তার। মাসের আজ তেইশ তারিখ। আর সাত দিন পরই হাতে মাইনে আসবে ছয় হাজার টাকা। এক দুই তিন তারিখ। এই তিনদিন বাম্পারের চান্স নিলে কেমন হয়? বাম্পার মিললে তো সোনায় সোহাগা! আর না মিললে হাতে যা থাকবে তাই নিয়ে চলে যাবেন গ্রামের বাড়ি ইদ করতে।

শেষ পর্যন্ত সেটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বলে মনে মনে ঠিক করলেন তালুকদার। কাল সকালে উঠেই হাজেরা  খাতুনের নামে টেলিগ্রাম করে দেবেন –“ছুটি না পাওয়ায় বাড়ি যাওয়া সম্ভব হলো না, আগামী মাসে অবশ্যই আসবো।” – ব্যস। হাজেরা খাতুনকে বোঝাবার মতো সান্ত্বনা এটুকুই যথেষ্ট। কিন্তু এ রকম একটা মোটামুটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তও দু-চোখের পাতায় ঘুম এনে দিতে পারলো না তালুকদারের। বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো স্ত্রী হাজেরা খাতুন আর তিনটে নিষ্পাপ শিশু সন্তানের করুণ-কচি মুখ।

আর এভাবে, সন্তান-বাৎসল্যে উথলে ওঠা অপরিসীম ভালোবাসা, মায়া-মমতার উথাল-পাথাল স্রোতের মাঝে ভাসতে ভাসতে আবুল হোসেন তালুকদারের ঝাপসা দু -চোখে তন্দ্রা নেমে আসে শেষ রাতের দিকে। ঘুমের মধ্যে তিনি স্বপ্ন দেখেন—ইদের আগের দিন বাড়ি গিয়েছেন। তাকে দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে ছুটে আসে হাজেরা খাতুন। আনন্দের  আতিসহ্যে তার পাশে এসে দাঁড়ায় তিন তিনটে সন্তান। ছোট্ট মুন্নি বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে অস্ফুট স্বরে  আবদার জানায়—“আমার জন্য কী এনেছো আব্বু, কালকে না ইদ!”— হু হু করে ওঠে তালুকদারের বুকটা! দুচোখের কোণে জমে যায় বিন্দু বিন্দু জল! তিনি হাউমাউ করে বলতে থাকেন—“তোমাদের মায়ের জন্য তিনটে শাড়ি, তোমাদের জন্য দুসেট করে নতুন জামা, অনেক টাকা-পয়সা—কিন্তু পথে ছিনতাইকারীরা সবকিছু ছিনিয়ে নিয়ে গেলো মা মণি”—ডাহা মিথ্যা কথাটা বলার পর পরই চিৎকার দিয়ে ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো তালুকদারের। শব্দ শুনে ছুটে এলো দুজন রুমমেট। একজন ঝুঁকে পড়ে কপালে হাত রাখলো তালুকদারের। জিজ্ঞেস করলো, “কী হয়েছে তালুকদার সাহেব। দুঃস্বপ্ন দেখেছেন নাকি?”

রুমমেটের প্রশ্নের কোনো জবাব দিতে পারলেন না তালুকদার। তার বুকের গহিন তলদেশ থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে শুধু দলা দলা কান্না!

নূরুল ইসলাম বরিন্দী, Email: nibarindi@gmail.com