ফেরা (প্রথম পর্ব)

শেয়ার করুন

 নূরুল ইসলাম বরিন্দী ।।

মত্ত হাতির মতো গজরাতে গজরাতে বাসটা চলে যাবার পরও জনহীন রাস্তার পাশে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি আমি। দ্বিতীয় কোনো যাত্রী নামেনি। শুধু আমি একা। ঘড়ির দিকে চোখ বুলাই। রাত এখন নয়টা। এরই মধ্যে জমাট অন্ধকার আর ভূতুড়ে নির্জনতা জেঁকে বসেছে চারদিক। কোথাও কোনো শব্দ নেই। জন-মানুষের সাড়া নেই।

এখান থেকে বালাগঞ্জ মাইল তিনেকের পথ। এবড়ো-খেবড়ো ধূলিময় রাস্তা। যানবাহনের বালাই নেই। সঙ্গে একটামাত্র সুটকেস। ভারী ঝক্কি পোহাতে হতো বাক্স-পেটরা থাকলে। তবে কী অন্ধকার নির্জন পথটা একা একাই পাড়ি দিতে হবে আমাকে? কথাটা মনে হতেই সারা শরীর কেমন যেনো ছম ছম করে ওঠে। এটা যে আমার একেবারেই অজানা-অচেনা পথ তা-ও নয়। আজ থেকে দশ বছর আগে এ পথ ধরেই একদিন পাড়ি জমিয়েছিলাম শহরে। সেই যে যাওয়া এরপর আর ফিরতে পারিনি।

বাস থাকে নেমে প্রথম দৃষ্টিতেই বুঝতে পেরেছি দূরের ঝাপসা অন্ধকারে পড়ে থাকা নিথর গ্রামগুলোতে পরিবর্তনের হাওয়া ঢোকেনি এখনো। পাকা রাস্তা নির্মাণ কিংবা বিদ্যুতের আলো উদ্ভাসি করেনি মনোহরপুর-বালাগঞ্জকে। সেই দশ বছর আগে যেমনটি ছিলো তেমনটিই রয়ে গেছে এলাকাটি।

মধ্য জানুয়ারির কনকনে উত্তরবঙ্গীয় ঠান্ডা বাতাস সারা দেহে শৈত্যের হুল ফোটাচ্ছে যেনো। খোলা ধু ধু প্রান্তরে এভাবে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে নির্ঘাত কাঁপুনি উঠবে। সঙ্গী-সাথীর জন্য অপেক্ষা করে লাভ নেই। অতঃপর আমি অন্ধকার মেঠোপথের মোড়ে এসে দাঁড়াই। এই ভেবে নিশ্চিত হই যে, একাই যেতে হবে আমাকে। সুটকেসটা ডান হাতে ঝুলিয়ে পুবের আকাশে সদ্য উদিত চাঁদটাকে পেছনে ফেলে থপ থপ শব্দ তুলে ঘন কুয়াশার ভেতর দিয়ে হাঁটতে থাকি আমি। এবং এভাবে শীত, কুয়াশা,অন্ধকার, নির্জনতার মধ্যে দিয়ে হাঁটতে গিয়ে আমি অনুভব করতে থাকি আমার বুকের খুব গভীরে দলা পাকানো অনেকগুলো কৈশোরিক স্মৃতি হামাগুড়ি দিয়ে উঠে আসছে ওপরে। আর আমি প্রতিটি ধাপে যেনো পার হচ্ছি একেকটি স্মৃতিময় সোনালী দরোজা।

আমার তখন বয়স মাত্র পাঁচ। সন্তানহীনা বিধবা বানু খালার অনুরোধে আমাকে ভাইয়ের বাড়িতে   রেখে মা চলে যান শহরে, বাবার চাকরিস্থলে। বড়ো মামা আলাউদ্দিন চৌধুরী বালাগঞ্জ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। বিপত্নীক। পাঁচটি কন্যা সন্তানের জনক। নিম্নবিত্তের অভাবের সংসার। ঘাড়ের ওপর বিধবা বোন বানু খালা। পাঁচটি মেয়ের মধ্যে বড়ো দুটির বিয়ে হয়েছে। বাকি তিনটির মধ্যে কুলসুম আপা আমার চেয়ে বছর তিনেকের বড়ো। কী যে স্নেহময় প্রাণ ছিলো কুলসুম আপার! জরিনা আমার সমবয়সী হলেও সখ্যতা প্রগাঢ় ছিলো কুলসুম আপার সঙ্গে। আর সবার ছোট নাহার। আমার চেয়ে বছর দুয়েকের ছোট। অভাবের সংসার হলেও পুত্র সন্তানহীন মামার বাড়িতে আমি ছিলাম হীরের টুকরো। সবার আদরের ধন। মায়ের অভাববোধ কোনোদিন জাগেনি। জাগার পরিস্থিতির সৃষ্টিও হয়নি। কিন্তু সেই স্নেহ-সোহাগের নিবিড় বন্ধনও একদিন ছিন্ন হয়ে গেলো অনিবার্যভাবেই।

ক্লাস সেভেনে উঠেছি তখন। হঠাৎ একদিন শহর থেকে বালাগঞ্জে চলে এলেন বাবা। শহরের স্কুলে পড়া-লেখা করাবেন আমাকে—কথাটা বাড়িময় রটে গেলে সবার মুখে নেমে এলো থমথমে বিষাদের ছায়া। বানু খালার সেকি কান্না! সেই দশ বছর আগে । খুব ভোরবেলা বাবার হাত ধরে বালাগঞ্জ ছেড়ে যাবার প্রাক্কালে কী যে এক অসহনীয় দৃশ্যের অবতারনা হয়েছিলো তা আজও স্পষ্ট মনে আছে আমার। বানু খালার বুকে মুখ লুকিয়ে হুহু কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলাম আমি।

বানু খালার অব্যক্ত কান্নার হাহাকার ধ্বনি অনেকদিন ধরে বেজেছিলো আমার কানে। আর কুলসুম, কুলসুম আপা! ওর মনের ভেতরের বর্ণমালা পড়ার মতো আমার চেয়ে বোদ্ধা শিক্ষার্থী আর কে হতে পারে? সেই তেরো বছর বয়সের অনভিজ্ঞ ,দুর্বোধ্য বালখিল্য মনে , সেই প্রথম অনুভব করতে পেরেছিলাম স্নেহ-ভালোবাসা কী জিনিস। আমাকে ছেড়ে দিতে বড়ো কষ্ট হয়েছিলো কুলসুম আপার। নদীর ঘাট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসেছিলো ওরা তিন বোন। “ভুলে যাসনে যেনো, চিঠি দিস মাঝে মধ্যে”—বলতে বলতে চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারেনি কুলসুম আপা। হুহু কান্নার মধ্যে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিয়েছিলো আমার কপাল, কপোল, চিবুক আর গণ্ডদেশ। সেই শেষ দেখা। সময় আর পরিবেশের কাছে কী মূল্য আছে স্নেহ-ভালোবাসার? থাকলে দশ বছরের ছিন্ন যোগসূত্র রক্ষার মাধ্যম অন্য কোনোভাবে না-হোক, একটা চিঠি দিয়েও তো হতে পারতো। দশ বছরের স্কুল, কলেজ, ভার্সিটির বিস্তৃত প্রাঙ্গণে কিছু কিছু স্মৃতি যে মনের পটে ছায়া ফেলেনি তা নয়।

চিরচেনা ভালোবাসার মুখগুলো কখনো কখনো ঝাপসা হয়ে দেখা দিয়েছে, হৃদয় ছুঁয়ে ছুঁয়ে আবার হারিয়ে গেছে কুয়াশার মতো। পত্রিকায় বালাগঞ্জ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞাপনটা চোখে পড়তেই আর স্থির থাকতে পারিনি আমি। ইন্টারভিউ দেয়ার দুরন্ত ইচ্ছেটা দরখাস্ত করতে বাধ্য করেছে আমাকে। ইন্টারভিউ দিয়েছি এবং যথারীতি নিয়োগপত্রও পেয়ে গেছি। এম এ-তে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া আমার জন্য ভালো একটা চাকরির অবশ্যি অভাব ছিলো না । তার ওপর ছিলো মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট। কিন্তু বালাগঞ্জ-মনোহরপুরের মণি-কাঞ্চন খচিত স্মৃতিগুলো তোলপাড় ঝড়ের মতো শেষাবধি টেনে আনতে বাধ্য করেছে আমাকে।

রিটায়ার্ড হেড মাস্টার আলাউদ্দিন মামা এখনো জানেন না তার প্রিয় স্কুলে তারই খালি পদটি পূরণ করার জন্য আমি আসছি, দীর্ঘ দশ বছরের ব্যবধানে। প্রথম দেখে হয়তো চমকে উঠবেন। আরো তাজ্জব বনে যাবেন যখন জানতে পারবেন বালাগঞ্জে আমার আগমনের হেতু। বানু খালা, কুলসুম আপা, জরিনা, নাহার—ওরা কী চিনতে পারবে আমাকে প্রথম দেখায়?……… বাকী অংশ আগামী পর্বে…….।

নূরুল ইসলাম বরিন্দী, Email: nibarindi@gmail.com