বাংলা গানে নজরুল সঙ্গীতের অবদান

শেয়ার করুন

 নূরুল ইসলাম বরিন্দী :

কাব্য এবং সঙ্গীতের মৌলিকত্ব এক হলেও এ দুটি জিনিসকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করাই বোধকরি শ্রেয়। কোনো কবি কাব্য রচনায় পারঙ্গম হলেই যে তিনি সঙ্গীত রচনাতেও সিদ্ধহস্ত হবেন তেমনটি কিন্তু নয়। কিন্তু আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন এর ব্যতিক্রম। তিনি যেমন কাব্য রচনা করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন কবি হিসেবে, তেমনি গান রচনা করে গীতিকার, গায়ক, সুরকার, সংগীতজ্ঞ হিসেবে অমর হয়ে আছেন সঙ্গীতের রাজ্যে।

সঙ্গীতের জগতে কবি নজরুল একটি বিস্ময়কর প্রতিভা। তাঁর অসংখ্য কবিতা বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে সত্য, কিন্তু কবিতার চেয়ে  অনন্য প্রতিভার সাক্ষ্য বহনকারী অনবদ্য সৃষ্টি হচ্ছে তাঁর সঙ্গীত।

নজরুল নিজেই তাঁর লেখার এক জায়গায় বলেছেন, “ আমার রচিত অসংখ্য কবিতাকে বাদ দিয়ে যদি শুধু গানকেই ধরে নেওয়া হয়, তথাপি আমার আসন অক্ষুণ্ণ থেকে যাবে বাংলা সাহিত্যে”। তিনি শুধু গান রচনাই করেননি, সঙ্গে সঙ্গে তাতে সুর দিয়ে প্রাণবন্ত করে তুলেছেন। সুরস্রষ্টা হিসেবেও নজরুল শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। বাংলা গানের রাজ্যে নজরুলের আবির্ভাব একটা অভূতপূর্ব ঘটনা। তাঁর প্রাণস্পর্শী বাণী ও সুরের অপূর্ব মূর্ছনা বাংলা গানের রাজ্যে এক অচিন্ত্যনীয় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো। তিনি যেন বহু রাগ-রাগিণীবিশিষ্ট একটি বাদ্যযন্ত্র। নিজের তৈরি সুরই শুধু নয়, সঙ্গে আরবি, ফারসি, তুর্কি, ইউরোপীয় গানের সুর এনে সংযোজন করেছেন এতদ্দেশীয় সুরের সঙ্গে। যার ফলে বহুমাত্রিকতার সমন্বয় ঘটে বাংলা গানে।

বস্তুত নজরুল ইসলামই প্রথম বিদেশি সুর ও রাগ-রাগিণীর সমন্বয় ঘটিয়ে বাংলা গানের নতুন দিক উন্মোচন করেন। কী করে তিনি কবিতার পাশাপাশি গান-গজল রচনায় মেতে উঠলেন সে সম্পর্কে তার বন্ধু নলিনীকান্ত সরকার ‘কবিতা’ পত্রিকার নজরুল সংখ্যায় (কার্ত্তিক-পৌষ ১৩৫১ বঙ্গাব্দ) লিখেছিলেন—“দুটি হিন্দুস্থানী পথচারী ভিখারী, একজন পুরুষ অপরজন নারী হারমোনিয়ামের সঙ্গে গজল গেয়ে ঊর্ধ্বমুখে চলেছে সারা পল্লীতে মধু বর্ষণ করতে করতে। নজরুলের আগ্রহে আমার বৈঠকখানায় তাদের ডেকে এনে গান শোনার ব্যবস্থা হলো। অনেকগুলো গান শুনিয়ে তারা বিদায় নিলো। নজরুল তখনই বসলো গান লিখতে। তাদের ‘জাগো পিয়া’ গানটি তখনও আমাদের কানে যেন ধ্বনিত হচ্ছে। নজরুল লিখে ফেললেন—“নিশি ভোর হোল জাগিয়া পরাণ পিয়া” গানটি। তার গজল-গান লেখার শুরুটাই এভাবে।”

কাজী নজরুল ইসলাম বিদেশি গানের সুর কেমন করে বাংলা গানে এনে তার পুষ্টিসাধন করেছেন তার অনেক মজার ঘটনা আছে। এ সম্পর্কে বন্ধু হেমেন্দ্রকুমার রায় লিখেছেন—“আমি একদিন একটি গানের জলসায় আহুত হয়ে দেখলাম উর্দু গানের ওস্তাদ জমির উদ্দিন গান গাইছেন। নজরুল তার কাছে তালিম নিচ্ছে। আমি জমির উদ্দিনকে বললাম, দেখ জমির, নজরুল আবার তোমার সবকিছু চুরি করে পালিয়ে না যায়। এর কিছুদিন পর জমির উদ্দিন আমার বাড়িতে এসে বললো, আপনার কথাই সাচ্চা। নজরুল কয়েকদিনের মধ্যেই আমার সুরগুলো রপ্ত করে নিয়ে গিয়ে এখন নিজেই ওস্তাদী করছে” (যাদের দাখেছি)। এভাবে নজরুল বিদেশি গানের সুর আর নিজস্ব সুর সৃষ্টি করে তাঁর অসংখ্য গানে বহু রাগ-রাগিণীর সমাহার ঘটিয়ে বাংলা গানের পুষ্টি সাধন করেছেন। নির্ঝরিনী, রেণুকা, মিনাক্ষী, সন্ধ্যামালতী, বনকুন্তলা, দোলনচাঁপা , কীর্তন, জারি, সারি, মুর্শিদী, রামপ্রসাদী, বাউল, ঠুংরী, গজল, ধ্রূপদ, তোরী, ভৌরী, আশাবরী, পিলু, খাম্বাজ, বেহাগ, ইমন, সাহানা , ধানেশ্রী ইত্যাদি তার সৃষ্ট নিজস্ব সুর।

বাংলা সঙ্গীতে নজরুলের আবির্ভাবের পূর্বেও কতিপয় সঙ্গীতজ্ঞ বাংলা গানের সুরকে বিদেশি গানের সুরের সঙ্গে মিশিয়ে নতন ছাঁচে গড়তে চেষ্টা করেছিলেন সত্য, কিন্তু নজরুল এসে বাংলা গানের মরা গাঙ্গে জোয়ার এনে তা পরিপূর্ণ করেন। নিজে গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে এ দেশের পথে-প্রান্তরে, নগরে -বন্দরে জাগার গান গেয়ে জাগিয়ে তুলেছেন কৃষক, মজুর, নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষদের।

এ দেশের মুক্তি আন্দোলনের পিছনেও ইন্ধন যুগিয়েছিলো নজরুলের স্বাধীনতাধর্মী গানগুলো। যেমনঃ “ভিক্ষা দাও ভিক্ষা দাও ফিরে চাও ওগো পুরোবাসী/ সন্তান দ্বারে উপবাসী/ দাও মানবতা ভিক্ষা দাও”।

নজরুল এ দেশের মানুষকে কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে বন্দি থাকতে, মুখ বুজে উৎপীড়ন সহ্য করতে দেখে বজ্রকন্ঠে আহ্বান জানিয়েছেন তরুণদের প্রতি এভাবেঃ

“কারার ঐ লৌহ কপাট/ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট/ রক্তজমাট শিকল পূজার পাষাণ বেদী / ওরে ও তরুণ ঈষাণ/বাজা তোর প্রলয় বিষাণ/ ধ্বংস নিশান উড়ুক প্রাচীন প্রাচীর ভেদি”।

তার এরকম ওজস্বিনী ভাষার গানে সেদিন আত্মচেতনা ফিরে পেয়েছিলো পরাধীন ভারতের ইংরেজ প্রভুত্বে গোলামীর জিঞ্জিরে বাঁধা এ দেশের মানুষেরা।

নজরুল সঙ্গীতকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায় । যেমনঃ (ক) গজল ও প্রেমসঙ্গীত, (খ) ইসলামী সঙ্গীত, (গ) দেশাত্মবোধক সঙ্গীত, (ঘ) হাসির গান, (ঙ) শ্যামা সঙ্গীত।

বহু রাগ-রাগিণীবিশিষ্ট সুরের বৈচিত্র্যতা নিয়ে নজরুল বিচরণ করেছেন সঙ্গীত-ভুবনে। ‘তৌহেদেরি বান ডেকেছে’, ‘চল নামাজে চল’, ‘আমরা সেই সে জাতি’, ‘রমজানেরই রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ’, ‘বক্ষে আমার কাবার ছবি,’ ‘দিকে দিকে পুনঃ জ্বলিয়া উঠিছে ,’ ‘আল্লা রছুল বলরে মন’ ইত্যাদি ইসলামী গান-গজলগুলো তাঁর স্বকীয় মহিমায় উজ্জ্বল।

‘মোর শ্যাম সুন্দর এসো,’ ‘ছন্দের বন্যা হরিণী,’ ‘পলাশ ফুলের মৌ পিয়ে ঐ,’ ‘পিউ পিউ বোলে পাপিয়া’—এই ধরনের শত শত গান তাঁর সৃষ্টি ও সুরে প্রাণবন্ত। কবি তাঁর গান রচনায় দেখিয়েছেন হৃদয়ের স্নিগ্ধ মধুর লীলা এবং বৈচিত্র্য কতো নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারেনঃ

“আমায় চোখ ইশারায় ডাক দিলে হায়, কে গো দরদী/খুলে দাও রং মহলার তিমির

দুয়ার ডাকিলে যদি”। “নিশি ভোর হলো জাগিয়া পরাণ পিয়া/কাঁদে পিউ কাঁহা পাপিয়া পরাণ পিয়া”। “বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে, দিসনে আজি দোল/আজো তার ফুলকলিদের ঘুম টুটেনি, তন্দ্রাতে বিলোল”।

এসব গান অত্যন্ত স্নিগ্ধ,স্বাভাবিক এবং মর্মস্পর্শী আকুলতা অন্যদের সৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে রেখেছে নজরুল ইসলামকে।

“ওঠরে চাষী জগৎবাসী/ধর কষে লাঙ্গল”, “দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার ওহে”, “বাজিছে দামামা বাঁধরে আমামা”, “চলরে চপল তরুণ দল,” “জাগো তন্দ্রা মগ্ন জাগো” ইত্যাদি দেশাত্মবোধক গানগুলো এক সময় জাগরণ এনেছিলো বাংলার ঘরে ঘরে।

হাসির গানও প্রচুর রচনা করেছেন তিনি। যেমনঃ “বাংগালী বাবু”, শালিনু সন্ধিৎসু”, “প্যাকট,” “দে গরুর গা ধুয়ে”প্রভৃতি।

দেশাত্মবোধক ও বিদ্রোহাত্মক কবিতা রচনার পাশাপাশি ওই ধরনের গান রচনায়ও সিদ্ধহস্ত ছিলেন নজরুল। মোট কথা সঙ্গীতের এমন কোনো বিভাগ নেই যেখানে নজরুল অবর্তমান। তাঁর লেখা গান সংখ্যার দিক দিয়ে তিন হাজারেরও ঊর্ধ্বে।

একবার এক নকল কবি কেমন করে যেনো নজরুলের লেখা একটা গানের বই চুরি করে তার নিজের নামে ছাপিয়ে দেয়। বন্ধু গায়ক আব্বাস উদ্দিন তা ধরতে পেরে গান চুরির কথা বললে নজরুল হেসে বললেন, “নিক না। ভাণ্ডার থেকে আর কয়টা নেবেরে—-।” এমনি করে তাঁর বহু গান হয়তোবা হারিয়ে গেছে। তথাপি তাঁর গানের ভান্ডার উজাড় হয়ে যায়নি। একই সময়ে একই বৈঠকে তিনি একাধিক গান রচনা করতে পারতেন। ভোরের পাখি যেমন ঊষার আলো দেখে আপনা হতেই ডেকে ওঠে, নজরুলও তেমনি গানের অন্তররাজ্যে প্রবেশ করে তার অন্তর্নিহিত ভাব অনুধাবন করতে পেরেছেন বলেই সুর আপনা হতে ধরা দিয়েছে তাঁর কাছে।

সেই সময় ম্যাগাফোন, গ্রামোফোন কোম্পানির বাঁধাধরা গান রচয়িতা ও সুরশিল্পী ছিলেন তিনি। মাত্র আড়াই মিনিটে একটা গান লিখে ফেলতেন। আজ যে আধুনিক বাংলা গানের বহুল প্রচলন লক্ষ্য করা যায়, এর মূলেও নজরুল প্রতিভার দান অপরিসীম।

নজরুলের যুগে অনেক সঙ্গীতজ্ঞ, সুরশিল্পী, গীতিকারের আবির্ভাব ঘটলেও তারা কেউ রবীন্দ্রপ্রভাব মুক্ত হতে পারেননি। কিন্তু নজরুল ছিলেন ব্যতিক্রম। রবীন্দ্রবলয়ের বাইরে থেকে কী সাহিত্যে, কী সঙ্গীতে নিজের আসন প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন নজরুল। সেই কালজয়ী প্রতিভা, বাংলা সঙ্গীত জগতের একচ্ছত্র সম্রাট গীতিকার, সুরশিল্পী, সঙ্গীতজ্ঞ নজরুল আজ আমাদের মাঝে নেই। চলে গেছেন না-ফেরার দেশে! সান্ত্বনা শুধু এটুকুই, দেশবাসী আমরা তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দিতে পেরেছি।

নূরুল ইসলাম বরিন্দী, Email: nibarindi@gmail.com