বাংলা বানান ও অন্যান্য ভুল-ভ্রান্তি প্রসঙ্গে

শেয়ার করুন

 নূরুল ইসলাম বরিন্দী :

প্রথমেই আসা যাক সংবাদপত্রে বানান ও অন্যান্য ভুল-ভ্রান্তি  প্রসঙ্গে । কয়েকদিন আগে দেশের প্রথম শ্রেণির একটি জাতীয় সংবাদপত্রের ফাইলে চোখ বুলাতে গিয়ে দেখলাম ভুল বানানের ছড়াছড়ি (তারিখ উল্লেখের প্রয়োজন নেই)। যেমনঃ রাষ্ট্রপতিকে ‘রাস্ট্রপতি’ (তৎসম বা সংস্কৃত শব্দে ট, ঠ বর্ণের আগে ‘ষ’ হয়, প্রমিত বানানে যা অপরিবর্তনীয়), তিন জায়গায় মাহবুব ভাইকে করা হয়েছে ‘মাহবুবভাই’ (শব্দ দুটি সম্পূর্ণ আলাদা, কোনো সন্ধিবদ্ধ পদ নয়), দু জায়গায় প্রবীণ-এর স্থলে ‘প্রবীন’, তত্ত্বাবধায়ক-এর স্থলে ‘তত্ত্বাবধায়’, ভূতের আছরকে উ-কার দিয়ে করা হয়েছে ‘ভুতের আসর’।

রাজীব গান্ধী সম্পর্কিত ডেস্ক নিউজের শুরু হয়েছে এভাবেঃ ‘ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আত্মঘাতী হামলায় প্রয়াত রাজীব গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত—।’ যেহেতু একই বাক্যে ‘হত্যাকাণ্ডের’ শব্দটি উল্লিখিত হয়েছে সেহেতু ‘আত্মঘাতী হামলায় প্রয়াত’ কথাটা শুদ্ধ নয়। আরেকটি খবরের হেডিং ছিলো ‘খালেদা-আমিনী দুজনেই ধর্মকে ব্যবহার করে’–না হয়ে হওয়া উচিত ছিলো ‘খালেদা-আমিনী দুজনই ধর্মকে ব্যবহার করে’ । যেহেতু পাশাপাশি দুটি নামবাচক বিশেষ্যপদ রয়েছে সেহেতু মাঝে অবশ্যই (-) হাইফেন প্রযোজ্য হবে, তা নাহলে অর্থবিকৃতি ঘটে যাবে এবং ‘দুজনেই’ শব্দটির শেষে ই-কার থাকায় মাঝে এ-কার ব্যবহার শুদ্ধ নয়। আরেক জায়গায় লেখা হয়েছেঃ ‘অনশন ময়দানে জনসমুদ্র থেকে জয়ধ্বনির গর্জন  উঠল’–এর স্থলে হওয়া উচিত ছিলো ‘অনশন ময়দানে জনসমুদ্র থেকে জয়ধ্বনি উঠলো’ বা ‘গর্জন উঠলো’। এতে একই বাক্যে একই অর্থদ্যোতক দুটি শব্দের অহেতুক প্রয়োগ বর্জিত হতো। আরেক জায়গায় হেডিং-এ লেখা হলোঃ ‘নেপালের প্রধানমন্ত্রী মাওবাদী ভট্টরাম’ অথচ নিউজের ভেতরে ছাপা হলোঃ ‘ভট্টরাই’। অন্য এক নিউজে লেখাঃ দলিত ও একটি মুসলমান শিশু ডাবের পানি ও মধু পান করিয়ে তার অনশন ভাঙ্গে’। এখানে দলিত কয়টি শিশু তার উল্লেখ নেই এবং ‘ভাঙ্গে’-র স্থলে হবে ‘ভাঙ্গায়’। হেডিং-এ লেখা ‘আরব লীগ’ ঈ-কার দিয়ে। ভেতরে ই-কার। প্রমিত রীতিতে হবে ‘লিগ’। অন্য এক জায়গায় প্রকাশিত নিবন্ধের শিরোনামঃ ‘সুন্দর একটি সুখী বাংলাদেশের জন্য’ –এর স্থলে ‘একটি সুন্দর সুখী বাংলাদেশের জন্য’ লিখলেই হতো। তাতে ক্রিয়াপদের শেষে বিশেষণ ও বিশেষ্যর ব্যবহারবিধির সঠিকত্ব বজায় থাকতো। ওই নিবন্ধেই একই বাক্যে একটি শব্দের একাধিক ব্যবহার, অসংখ্য ভুল বানান, যেমনঃ জরীপ, রুপান্তরিত, মন্ডিত, আন-রেকর্ডেও, ধাবিদ, অসম্প্রদায়িক, ক্ষুদ্র নৃতত্ত্ব গোষ্ঠীদের (হবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী)—এমনসব মারাত্মক ভুল-ভ্রান্তির ছড়াছড়ি সচেতন পাঠক সমাজের কাছে বাস্তবিকই অনাকাংক্ষিত এবং পীড়াদায়কও বটে!

একজন লেখকের তো ভুল হতেই পারে। আর এই ভুল সংশোধনের জন্য প্রত্যেকটি সংবাদপত্রে রয়েছে পূর্ণাঙ্গ একটি সম্পাদনা বা সংশোধনী বিভাগ। এই বিভাগটি এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে, সংবাদপত্রের ভাষায় এটিকে ‘লাস্ট চেকপোস্ট’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এ শিল্প-সংশ্লিষ্টদের অনেকেই তা উপলব্ধি করতে চান না। অথচ সংবাদপত্র মোটামুটি নির্ভুলভাবে প্রকাশনার ক্ষেত্রে এ বিভাগটির গুরুত্ব অপরিসীম। তবে বিজ্ঞ, দক্ষ, যোগ্য ও ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন কর্মীর স্থলে এ বিভাগে যদি অজ্ঞ, অদক্ষ, অযোগ্য, ভাষাজ্ঞানবর্জিত লোকদের নিয়োজিত করা হয় তাহলে সংবাদপত্র ভূতের আছরমুক্ত হতে পারবে না কোনোমতেই।

আমরা সবাই জানি ভাষা প্রক্রিয়াগতভাবেই পরিবর্তনশীল। তাই এর ছাপ পড়ে শব্দের বানানেও। যেমন একসময় লেখা হতো ‘পূর্ব্ব’, বর্তমানের বানানে এটা ভুল। কারণ এখনকার রীতি অনুযায়ী রেফ থাকলে তার নিচে কোনো বর্ণ দুবার বসে না। এভাবে সমকালীন বানানে অনেক ঈ-কার ই-কার হয়েছে, অনেক মূর্ধন্য দন্ত্য ন-এ পরিণত হয়েছে। ‘বইমেলা’ ‘বই মেলা’কেউ লেখেন জুড়ে দিয়ে আবার কেউ লেখেন ফাঁক দিয়ে। ব্যাকরণ অনুযায়ী অর্থের দিক দিয়ে পরস্পরের মধ্যে সম্বন্ধ আছে এরূপ দুই বা দুইয়ের বেশি শব্দ একপদে পরিণত হলে সমাস হয়। এই নিয়মে বই বিক্রি হয় যে মেলায় তা হলো ‘বই মেলা’– বই এবং মেলা একপদে পরিণত হওয়ায় তা হয়ে গেলো ‘বইমেলা’। একইভাবে রজত জয়ন্তী, মুক্তি সংগ্রাম, লক্ষ কোটি টাকা–এগুলো ব্যাসবাক্য। অর্থাৎ দুটি শব্দকে জুড়ে দিতে হবে।

অফিস-আদালত, রাস্তাঘাটের দোকানপাট, বিলবোর্ড, সাইনবোর্ড, নোটিসবোর্ড, প্লাকার্ড, লিফলেট–সর্বত্র ভুলের ছড়াছড়ি দেখলে লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে আসে। কিছু নমুনা দেওয়া যাকঃ গ্রীণহাউস, নিঃসরন, ফুলে উঠে, যন্ত্রনাদায়ক, আবিস্কার, শুক্রানু, তৈরী, আঁইশ, ধরিত্রি, প্রজাতী, নিঃসৃত, কোনো সময়ই, আয়ূ, মুত্র, পরিপক্ক, বনভুমি, মূখ্য, সংক্রমন, অনুজীব, নালী, পশ্চাৎভাগ, স্থায়ীত্ব– এই ভুলগুলো কিছু ণ-ত্ব বিধানের, কিছু সমাসবদ্ধতার, কিছু সন্ধি বিধানের, কিছু বিদেশি শব্দের প্রতিবর্ণের, কিছু প্রত্যয়ের এবং কিছু মুদ্রণ প্রমাদের। আরেক ধরনের ভুলঃ জাতী বিচার চায়, মাঁন্নান খাঁনের বাড়ী, এখানে প্রশ্বাব করিবেন না, অবৈধ্য অস্র, গবেষনা কর্মকর্তা ইত্যাদি।

আরো যেসব ভুল শব্দ ও বানান অহরহ চোখে পড়ে তার কিছু নমুনাঃ   ষ্টাফ, গুলিস্থান, পুস্প, নুপূর, ষ্টোর, ঘন্টা, মৃত্যু বরণ, অগাষ্ট, যকৃত, কারন, পেশী, অনুষ্টিত, ঔষুধ, খন্ডক, পরিমান, থাকেনা, একঅনু, কেন্দ্রিয়, পরিস্ফূটন, ভৌগলিক, সেকেন্ডারী, নিরবিচ্ছিন্ন, খমতালুভিরা, তত্ববধায়ক, অর্শ্বের ব্যাথা, শ্রের্ণী, একমূহুর্ত, মর্তলোক, সুস্থ্য, স্বাস্থ  ইত্যাদি। ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার অনেক চ্যানেলের সংবাদ পাঠেও নিত্যদিনের ভুল,

যেমনঃ ‘বক্তব্য রাখেন দলের অন্যান্য নেতৃবৃন্দগণ,’ ‘সারা দেশব্যাপী,’ ‘উপস্থিত ছিলেন অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ’   (বাক্যগুলোয় বহুবচনের ছড়াছড়ি),  স্ক্রলে লেখা আসেঃ সৃতিশক্তিহীন, নিরাপেক্ষ, অসার অবস্থা, নিরাবিচ্ছিন্ন — এমনি  অসংখ্য ভুল  প্রতিদিন আওড়ানো হচ্ছে যা আমাদের বিবেককে পীড়িত করে।

শব্দের বা  বানানের ভুল প্রধানত যে কারণে হয়ে থাকে তা হলোঃ লেখার সময় সতর্ক না থাকলে, ব্যাকরণের নিয়ম-কানুন না জানলে, সমকালীন বানান সম্পর্কে ধারণা না থাকলে। তবে বানান ভুলের ব্যাপারে অজ্ঞতাটাই যে বেশি দায়ী তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

এবারে আসি প্রমিত বাংলা বানান প্রসঙ্গে। উনিশ শতকের সূচনায় বাংলা সাহিত্যের আধুনিকপর্ব শুরু হওয়ার আগে বাংলা বানানের নিয়ম বলতে তেমন কিছুই ছিলো না। ভাষার সাধুরীতি ক্রমান্বয়ে চলিত রূপ পরিগ্রহ করলে বাংলা বানানের অসুবিধাগুলো প্রকট হয়ে ওঠে এবং তা দূর করার প্রয়োজন দেখা দেয়। এ লক্ষ্যে বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকে বিশ্বভারতী এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বানানের একটা নিয়ম নির্ধারণ করে যা এখন পর্যন্ত দুই বাংলায় আদর্শ নিয়মরূপে অনুসৃত হয়ে আসছে। কিন্তু সময়-পরিক্রমায় বানানের যথেচ্ছ ব্যবহার ও বিশৃংখলা দেখা দিলে আধুনিককালের দাবি অনুযায়ী পূর্বের বানানরীতিকে যুগোপযোগী করার প্রয়োজন দেখা দেয়। ফলশ্রুতিতে বাংলা একাডেমীর উদ্যোগে প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মনীতি প্রণয়ন করা হয়। তবে বানান সংস্কার নয় বরং বানানের নিয়মগুলোকে পরিমার্জন করা হয়েছেমাত্র, ব্যাকরণের নিয়ম বা বিধান লংঘন করা হয়নি। আশার কথা, ইদানীং দেশের প্রধান সংবাদপত্রগুলোতে প্রমিত বানান অনুসৃত হতে দেখা যাচ্ছে। তবে বাংলা একাডেমীর প্রমিত বানান ব্যবহারবিধি অনুসরণ করলেও এর প্রয়োগরীতির যথার্থতা লংঘিত হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রেই। এর কারণ সম্ভবত ব্যবহারকারীদের ভাষার ব্যাকরণগত বিধিবিধান না বোঝা বা ভাষাজ্ঞান না থাকা। এজন্য যে ব্যাকরণবিদ হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। তবে যারা সংবাদপত্রে অথবা অন্য কোনো প্রকাশনা  শিল্পে লেখালেখি ও সম্পাদনা বা সংশোধনী কাজে নিয়োজিত আছেন তাদের জন্য কম-বেশি হলেও ভাষাজ্ঞান অপরিহার্য। মনে রাখা দরকার এই ভাষার জন্য রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে, বিশ্বের দরবারে আজ আমাদের মাতৃভাষা আন্তর্জাতিক ভাষার মর্যাদা লাভ করেছে। এ মর্যাদা ও গৌরব সমুন্নত রাখার দায়িত্ব আমাদের সকলের।

নূরুল ইসলাম বরিন্দী, Email: nibarindi@gmail.com