ভাওয়াইয়া গানের উৎস সন্ধানে

শেয়ার করুন

 নূরুল ইসলাম বরিন্দী :

শহর থেকে দূরে, গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাদের বসবাস, সেইসব সাধারণ গ্রাম্য নিরক্ষর মানুষের গ্রামীণ জীবনের দৈনন্দিন সুখ, দুঃখ, আশা, আকাংক্ষা, হাসি-কান্না , প্রেম-ভালোবাসা, স্নেহ-মমতা, মিলন-বিচ্ছেদ ইত্যাদির পরিচয় যা থেকে আমরা পেয়ে থাকি বা ওইসব নিরক্ষর মানুষদের জীবনযাত্রা সম্বন্ধে একটা ধারণা পাবার সূত্র খুঁজে পাই তা হচ্ছে লোকসঙ্গীত বা পল্লীগীতি। গ্রামবাংলার মানুষের প্রাণের কথা, হৃদয়ের আবেগ, ব্যথা-বেদনার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত থাকে এসব লোকজ পল্লীসঙ্গীতে। ভাষাহীন মূক মানুষদের অব্যক্ত কথামালা স্পষ্টরূপে ফুটে ওঠে পল্লীর আঞ্চলিক ভাষার মাধ্যমে।

রংপুরের ভাওয়াইয়া গান এমনই এক লোকপ্রিয় সঙ্গীত। এ গান শুধু উত্তরাঞ্চলেই নয়, সারা দেশেই ভীষণভাবে জনপ্রিয়। এই ভাওয়াইয়া গানের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনুসন্ধান করলে আমরা দেখতে পাই গ্রাম্য মানুষের গ্রামীণ জীবনের চিরন্তন আলেখ্য, সত্য ও শাশ্বত রূপ ফুটে উঠেছে এগুলোতে। সেইসঙ্গে হয়ে উঠেছে অত্যন্ত প্রাণস্পর্শী।

নদ-নদীবিধৌত, গিরি-অরণ্যে পরিবেষ্টিত প্রকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ এ দেশের মানুষ। অনন্ত আকাশে নীল চাঁদোয়া, নিচে দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তিস্তার বুকে বাদামি রং-এর পাল তুলে মনের আনন্দে মাঝিরা তোলে ভাটিয়ালী সুর, চাষি মাঠে লাঙ্গল চালায় আর মূর্ছনা তোলে মৈশালি, রাখালিয়া গানের। দুপুর বেলা নিঝুম মাঠের বট গাছের ছায়ায় বসে রাখাল তার বাঁশির সুরে মুখর করে তোলে আকাশ-বাতাস, বন-প্রান্তর। সে বাঁশির মোহিনী সুর হয়তো তোলপাড় করে কোনো গ্রাম্য কুমারীর মন-প্রাণকে। প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের কারণে এদেশের মানুষেরা তাই হয় সুন্দরের পূজারী।

উত্তরবঙ্গের, বিশেষ করে রংপুরের ঐতিহ্যবাহী লোকগাথা ও ভাওয়াইয়া গান লোকবিশ্রুত। বিখ্যাত গায়ক সুরশিল্পী আব্বাস উদ্দিন আহমেদ যে ভাষার গানে সুর ও কন্ঠ দিয়ে মুগ্ধ করেছিলেন এদেশের আপামর জনসাধারণকে সেই ভাষাই রংপুরের পল্লীগ্রামের মানুষের প্রাণের ভাষা। এই ভাষাতেই গাওয়া হয় ভাওয়াইয়া গান। গ্রামীণ মানুষের জীবনের হাসি-আনন্দ, ব্যথা-বেদনায় সৃষ্টি হয়েছে লোকগীতি বা ভাওয়াইয়া গানের। কয়েকটি ভাওয়াইয়া গানের উদ্ধৃতি দিয়ে তার অন্তর্গত ভাবের তাৎপর্য তুলে ধরা যাক।

কোনো পতিব্রতা নারী হয়তো বেড়াতে গেছে তার নানির বাড়িতে। কিছুদিনের মধ্যে স্বামীসঙ্গহীনা সেই নারীর মনটা ব্যাকুল হয়ে ওঠে স্বামীর জন্য। না জানি তার স্বামী একা একা কতোই না কষ্ট পাচ্ছে। এক নিশীথ রাতে সে স্বপ্নে দেখে স্বামী তার অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তখন সে কাতর কন্ঠে জানায় নানিকে তার স্বপ্নের কথাঃ

“ও তুই জাগেক নানি মোক থুইয়া আয় অ্যালায়

আইজ ক্যানে নানি মোক থাকিবার না মোনায়।

মোর সোয়ামির হইচে জ্বর নিন্দতে মুই পানু খবর

সারা রাইতোত তাঁয় পানি বুলি খ্যাংগায়।”

নানি তখন তাকে সান্ত্বনা দেয়। বলেঃ স্বপ্ন সব সময় সত্যি হয় না। তুই নিশ্চিন্তে থাক। কিন্তু নারীর মন প্রবোধ মানতে চায় নাঃ

“রাইত দোপরে দেখিনু স্বপন স্বপন মিছা নয়—

ছালার ভেতর নানি জেটিটা ঠিক ঠিকায়।”

নানি তাকে নানাভাবে বোঝাবার চেষ্টা করে। গয়নাগাটির লোভ দেখায়। কিন্তু স্বামীকে একনজর দেখার জন্য সে ছটফট করতে থাকে,বলেঃ

“না ন্যাও নানি তোর ফাইল্যা ফিতা/না ন্যাও নানি তোর রেশমি চুড়ি

পাইসা হইলে নানি হাটত পাওয়া যায়।”

গ্রাম্য নারীরাও যে তাদের স্বামীকে কতো ভালোবাসে, কতো আপন ভাবে তাই  ব্যক্ত হয়েছে এই গীতিকাটিতে।

রংপুরের গ্রামাঞ্চলের মেয়েরা সাধারণত বাপের বাড়ি, স্বামীর বাড়ি, স্বজনদের বাড়ি বেড়াতে যায় টাপরবাঁধা (ছাউনি) গরুর গাড়িতে চড়ে (এখন অবশ্য গরুর গাড়ি প্রায় নেই বললেই চলে)। কোনো নারী গরুর গাড়িতে চড়ে বাপের বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়ি, স্বামীর বাড়ি থেকে বাপের বাড়িতে যাওয়াকে ‘নাইওর’ বলা হয়। স্বামীর ঘর করতে গেলে কোনো নববধূর একদিকে যেমন স্বামীসঙ্গ পাবার আনন্দ, অন্যদিকে বাবা-মায়ের স্নেহচ্ছায়া থেকে বঞ্চিত ও আবাল্যের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি-গ্রাম ছেড়ে অচেনা –অজানা ভিনগাঁইয়ে যেতে তার মন নিদারুণ ব্যথায় ব্যথিত হয়ে ওঠে। গাড়ি চলতে থাকলে সে গাড়িয়ালকে তার প্রাণের আকুতি জানায় এভাবেঃ

“আস্তে বোলাও গাড়িরে গাড়িয়াল/ধীরে বোলাও গাড়ি

আরেক নজর দেখিয়া নেও মুই/দয়াল বাপের বাড়িরে গাড়িয়াল

আস্তে বোলাও গাড়ি।

তোমার গাড়ির চাকারে গাড়িয়াল/কান্দে ঘুরি ঘুরি

মা-ও মোর না দেখিয়া কান্দে /আন্ধার ঘরে বসিরে” —-

গাড়ির চাকা ঘোরে আর পল্লীবালার অন্তর যেন নিষ্পেষিত হতে থাকে  মেঠোপথে এগিয়ে চলে 

আর বালিকাবধূর কান্নার ধ্বনি যেন আর্তনাদ করে চাকার নিচে চাপা পড়ে। তার দুচোখ বেয়ে ঝরে পড়ে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু। চিরন্তনী এ বিয়োগান্ত দৃশ্য।  

বাড়ির পাশ দিয়ে রাস্তায় গরুর গাড়ি যেতে দেখলে বাপের বাড়িতে অবস্থানরত স্বামীসঙ্গহীনা অথবা স্বামীর বাড়িতে থাকা বাবা-মায়ের আদর সোহাগবঞ্চিত নারীর মন বিষাদে তিথিয়ে ওঠে। সে বাপ-মায়ের মুখদর্শন আশায় অধীর হয়ে ওঠে। তার বাপ মা তাকে ভুলে গেছে এ রকম একটা ধারণায় সে বাবা -মার প্রতি আকুল আবেদন জানায় এভাবেঃ

“বাপ মাও মোর না বুঝিয়া/ছোট্টকালে দিচেন বিয়া

নিঠুর নিদয়া তাদের হিয়া।

শাশুড়ি-ননদের জ্বালা/শরীলটা মোর হইচে কালা

 মুই নারী কান্দো অভাগিনী”।

কেঁদে কেঁদে চোখের জলে বুক ভেসে যায়। অপসৃয়মান গাড়ির দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে ঝাপসা হয়ে আসে চোখের কোণ। তার অভিমানী ক্ষুব্ধ হৃদয় অনুনয় জানায় অচেনা গাড়োয়ানকেঃ

“ভিন গেরামের ও গাড়িয়াল/বাপ মাও-এর ঘরে

দয়া করি দ্যান গো খবর/ নাইওর নিবার তরে”।

গাড়ি চলে যায়। বিরহিনী আঁচলে চোখের জল মোছে। প্রতিক্ষায় দিন গুনতে থাকে।

এমনই হাজারো উদাহরণ দেয়া যায় ভাওয়াইয়া গানকে উপজীব্য করে। সেসব জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে  “ও বাপুই চ্যাঙ্গেড়ারে/গাছোত উঠিয়া দুইটা হা /ও মোক জলপই পাড়িয়া দে”, “দোলা মাটির মোর বতুয়ারে শাগ/বতুয়া হলপল করে”,  “ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দেরে,”  “ওকি গাড়িয়াল ভাই/হাঁকাও গাড়ি তুই চিলমারীর বন্দরে,” “ও মুই না শোনোং না শোনোং /তোর বন্ধুয়ার কথারে/ও মোক ছাড়িয়া গেলু ক্যানে,” “ও কন্যা জল ছ্যাঁকিতে জল ছ্যাঁকিতে সেঁউতির ছিঁড়িল দড়ি/গলার হার খসায়া কন্যা হে / ও কন্যা সেঁউতিত নাগাইম দড়ি”—-ইত্যাদি বহু জনপ্রিয় গান গীত হয়ে থাকে জনপ্রিয় শিল্পীদের কন্ঠে।

রংপুরের ঐতিহ্যবাহী লোকসঙ্গীত ভাওয়াইয়া গানের আদি উৎস খুঁজতে গেলে আমাদের যেতে হবে অতীত ইতিহাসের সন্ধানে। ভাওয়াইয়া শুধু গান নয়, এটি একটি পৌরাণিক ভাষাও। বন্ধুবর প্রয়াত ইতিহাসবিদ শাহ আব্দুল মজিদ বুলু তাঁর ঐতিহাসিক  “পঞ্চডালের পারিজাত” গ্রন্থে লিখেছেন– “একসময় বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি,‌ আসামের গোয়ালপাড়া জেলার ধুবড়ি মহকুমার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ছিলো কামতাপুর রাজ্য। এই বিশাল এলাকার মানুষেরা একই সুরে, একই ঢং-এ , একই ভাষায় কথা বলতো। আর এই ভাষারই জনপ্রিয় গান ভাওয়াইয়া। ভাব বা ভাও শব্দের সঙ্গে ‘ইয়া’ প্রত্যয় যোগ করে ভাওয়াইয়া শব্দের জন্ম। ভাওয়াইয়া ভাষার আবার চারটি রূপ আছে। সেগুলো হলোঃ রাজবংশী, কামতাবিহারী, কোচবিহারী এবং বাহে। বাহে (যার অর্থ বাপু হে) শব্দ একটা সম্বোধনসূচক পদ। এটি এসেছে কামতাপুরী ভাষা থেকে।  মূলত ভাওয়াইয়া গান কামতাপুরী ভাষায় রচিত। ভাওয়াইয়া গানের একটা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তা হলো হারমোনিয়াম ব্যতীত প্রধান বাদ্যযন্ত্র বাঁশের বাঁশি এবং দোতারা সহযোগে গাওয়া হয়”।

লোকসঙ্গীতসম্রাট গায়ক আব্বাস উদ্দিন আহমেদের পৈতৃক নিবাস ছিলো কোচবিহারের তুফানগঞ্জ মহকুমার বলরামপুর গ্রামে যা এক সময় ছিলো রংপুরের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। মূলত এই শিল্পীর কন্ঠেই ভাওয়াইয়া গানের জনপ্রিয়তা এবং বিস্তার ঘটে উত্তরবঙ্গ তথা সারা বাংলাদেশে। পরবর্তীতে তার দেখানো পথ ধরে প্রথিতযশা ভাওয়াইয়া গানের শিল্পী হিসেবে যারা জনপ্রিয়তা লাভ করেন তাদের মধ্যে অন্যতম মুস্তাফা জামান আব্বাসী, ফেরদৌসী রহমান, হরলাল রায়, রথীন্দ্রনাথ রায়, নমরুদ্দিন, কছিমুদ্দিন, সিরাজ উদ্দিন, বেগম সুরাইয়া, শরীফা রাণী, আশরাফুজ্জামান সাজু, খাদেমুল ইসলাম বসনিয়া, নাদিরা বেগম প্রমুখ।

নূরুল ইসলাম বরিন্দী, Email: nibarindi@gmail.com