হনন-২ (একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে)

শেয়ার করুন

 নূরুল ইসলাম বরিন্দী:

আলাদা রুমে থাকার ব্যবস্থা করলেও আয়েশা মাঝেমধ্যেই স্বামী আজমের রুমে গিয়ে তার জৈবিক চাহিদা মিটিয়ে আসতো। বুঝতে দিত না আরিফের সঙ্গে পরকীয়া প্রেমের ব্যাপারটা। সামিউল নিখোঁজ হওয়া এবং একদিন পর নৃশংসভাবে খুন হওয়ার ব্যাপারটা অনাকাংক্ষিত ঘটনার প্রেক্ষাপটে ঘটেছে কি-না তা দেখা যেতে পারে সেদিনের ঘটনার পূর্বাপর বিশ্লেষণ করে।

অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও আয়েশা আরিফকে ফোনে ডেকে নেয় রাত নয়টার দিকে। সে এলে তাকে ছাদে আত্মগোপন করে থাকতে বলে। আজম বাইরে থেকে এসে গভীর রাতে শুয়ে পড়লে ফোনে আরিফকে তার ঘরে আসার আহবান জানায় আয়েশা। বরাবরের মতো সেদিনও মায়ের সঙ্গে সেই খাটে শুয়েছিল সামিউল। গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভঙ্গে গেলে সে দেখতে পায় আরিফ কাকু এবং তার মায়ের মিলন দৃশ্য। অবুঝ শিশুর অপরিপক্ব মস্তিষ্কে দুজন মানব-মানবীর মিলনদৃশ্য কী ছায়াপাত ঘটিয়েছিল তা মনোস্তত্ত্ববিদরাই ভালো জানবেন। তবে পরের দিন ভোরবেলা থেকে সামিউলের মাঝে একটা কৌতূহলোদ্দীপক পরিবর্তন লক্ষণীয় হয়ে উঠেছিল এটা টের পায় মা আয়েশা। রাতশেষে আরিফ আবার চলে যায় ছাদে। যথারীতি সকাল আটটার দিকে আজম বাসা থেকে বের হয়ে গেলে আরিফও ছাদ থেকে নেমে চলে যায়। মা আয়েশা সামিউলকে স্কুলে নেবার প্রস্তুতি নিতে গেলে অবোধ শিশু সামিউল বলে ফেলে—“মা, আমাকে চিকেন আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই না খাওয়ালে রাতে যা দেখেছি সব কিন্তু বাবাকে বলে দেবো”—কী ভয়ংকর শিশুসুলভ আব্দার! বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে আয়েশার। তাহলে রাতে আরিফের সাথে তার অনৈতিক দৃশ্যগুলো দেখে ফেলেছে সামিউল? তার পরকীয়ার একমাত্র সাক্ষী? বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে আয়েশার। ভাবতে থাকে সারাক্ষণ। ব্যাপারটা আরিফকে জানানো দরকার। ফোনে সবকিছু আরিফকে জানায় আয়েশা। ‘বিকেলের মধ্যেই একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে’– বলে আরিফ আশ্বস্ত করে আয়েশাকে।

বিকেলে কাজের বুয়ার সাথে নিচে খেলতে নামে সামিউল। খেলাশেষে ঘরে ফেরার মুহূর্তে কোথা থেকে আরিফ এসে সামিউলকে কোলে তুলে নেয়। চিকেন আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খাওয়াবার প্রলোভন দেখিয়ে ওকে নিয়ে চলে যায় একটা চায়নিজ রেস্টুরেন্টে। –“তোমার নানাভাই খুবই অসুস্থ, খবর পেয়ে বাবা-মা দুজনই চলে গেছে চিটাগাং। বাসা এখন তালাবদ্ধ। কালই চলে আসবে ওরা। চলো, আজ তুমি আমার বাসায় থাকবে”—এ কথা বলে সামিউলকে সাথে নিয়ে আরিফ চলে যায় সায়দাবাদ বাস টার্মিনালে। সে সিদ্ধান্ত নেয় টঙ্গিতে এক বন্ধুর বাসায় গিয়ে সামিউলকে খুন করবে। পথের কাঁটা সরিয়ে ফেলবে চিরদিনের জন্য। কথাটা সে আয়েশাকে জানাবে না। কারণ, হাজার হলেও সে মা। খুনের ব্যাপারে রাজী না-ও হতে পারে। সামিউল তার অনেকদিনের পরিচিত প্রিয় ‘আরিফ কাকু’র কথায় আশ্বস্ত হয় এবং বিশ্বাস করে। যা হোক, ওই রাতটা টঙ্গিতে কাটিয়ে আরিফ সকালে চলে আসে সায়দাবাদে। সারাদিন পুরনো ঢাকার এখানে-সেখানে ঘোরাঘুরির পর একটা বস্তা যোগাড় করে সে সন্ধ্যার দিকে চলে আসে মোহাম্মদপুরে। ইতিমধ্যে সামিউলকে আইসক্রিমের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দিয়েছে সে। এখন গভীর ঘুমের মধ্যে ডুবে আছে সামিউল। ৬ নম্বর রোডের পাশে অন্ধকার মাঠের মধ্যে নিয়ে গিয়ে ঘুমন্ত সামিউলের নাক-মুখ কাপড় দিয়ে চেপে ধরে আরিফ। অনেকক্ষণ পর মৃত্যু একেবারে নিশ্চিত করে লাশটা বস্তার ভেতর ঢুকিয়ে কাদা-পানির মধ্যে ফেলে দিয়ে অন্ধকারে মিশে যায় ঘাতক আরিফ। আগের দিন হারিয়ে যাওয়া সামিউলের বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার হয় পরের দিন!

শিশু সামিউলের বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধারের পর ঢাকার সব প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়াতে ফলাও করে প্রচারিত হয় খবরটা। পুলিশ এ বীভৎস ঘটনার নায়ক-নায়িকা, অর্থাৎ শিশু সামিউলের মা আয়েশা হোমায়রা এবং তার কথিত প্রেমিকপুরুষ শামসুজ্জামান আরিফকে গ্রেফতার করে। তবে আরিফ আদালতে তার জবানবন্দিতে দোষ স্বীকার করলেও মা আয়েশা তার জবানবন্দিতে ছেলেকে খুনের ব্যাপারে তার কোনো প্ররোচনা ছিল না বলে দাবি করে।

বিচারিক আদালতের রায়ে পরকীয়া প্রেমের ফলশ্রুতিতে শিশু সামিউলের হন্তারকদের কী শাস্তি হয়েছে অথবা হবে তা আমরা জানি না। আমাদের মনে শুধু একটাই প্রশ্নঃ কোনো এক অসতর্ক মুহূর্তে মায়ের সাথে তার প্রেমিকপ্রবরকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলে শিশুমনে কৌতূহলবশত তা প্রকাশ করে দেয়ার হুমকির অপরাধেই কী শিশু সামিউলকে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হলো? এতে কী নিজের সন্তানকে হত্যার ব্যাপারে মা আয়েশার সম্মতি ছিল? এ-ও কী সম্ভব? নাকি জন্মদাত্রী মায়ের জৈবিক প্রবৃত্তির তাড়না এতই প্রবল হয়ে উঠেছিল যে, তার কাছে জননীর অপত্য স্নেহ-বাৎসল্য পর্যন্ত হার মেনে গিয়েছিল?

নিরপরাধ শিশু সামিউলের বাবা কে,এম, আজম এ ঘটনার পর একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে পাগলপ্রায় হয়ে যান। নবোদয় হাউজিং-এর ওই ভাড়াটে বাসা ছেড়ে তিনি অন্যত্র চলে যান। এ রকম একটি বেদনাবিধূর স্মৃতি তাকে তাড়া করে ফেরে দিনরাত। সারাক্ষণ তিনি তার কল্পনার চোখে দেখতে পানঃ এবারের জন্মদিনের উপহার দেয়া নীল রংয়ের সাইকেলটায় চড়ে তার আদরের ধন ছোট্ট সামিউল প্রজাপতির মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে বাড়িময়। তিনি তার পিছু পিছু হাঁটছেন, আবার কখনোবা দৌড়াচ্ছেন। —শোকাবহ এই স্মৃতি তাকে বয়ে বেড়াতে হবে সারাটা জীবন!

আর মা আয়েশা হোমায়রা? মমতাময়ী মায়ের চিরায়ত বিশেষণ বিসর্জন দেয়া কলংকিত জীবন নিয়ে পারছেন কী সুখে-শান্তিতে দিন যাপন করতে? নিজ গর্ভের সন্তানের মর্মন্তুদ পরিণতির অপরাধে অপরাধীর শোকাশ্রু অবিরত ঝরতে থাকবে না কী তার দুচোখ বেয়ে! সমাপ্ত……………

নূরুল ইসলাম বরিন্দী, E-mail: nibarindi@gmail.com