হিরোশিমা : ইতিহাসের এক ঘৃণিত অধ্যায়

শেয়ার করুন

(গত ৬ আগস্ট ছিল হিরোশিমা দিবস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির পারমাণবিক বোমা হামলায় জাপানের হিরোশিমা নগরী সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। এই ধ্বংসলীলার শোকাবহ স্মৃতিকে স্মরণ করে প্রতি বছর জাপানসহ সারা বিশ্ব। দিবসটি উপলক্ষে নিবেদিত হলো লেখাটি।)

নূরুল ইসলাম বরিন্দী :

৬ আগস্ট, ১৯৪৫ সাল। এশিয়ার মূল ভূখন্ডের নিকটতম জাপানি শহর হিরোশিমার আকাশে তখন কুয়াশার বুক চিরে রাঙ্গা সূর্য উঁকি দিচ্ছে। ঘন কুয়াশা কেটে গিয়ে সূর্যালোকিত ভোরের আভাস ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।

শহরের ৪ লাখ নিদ্রামগ্ন বাসিন্দা প্রাত্যহিক নিয়মে স্বাগত জানালো দিনের আগমন ঘোষণাকারী রক্তিম সূর্যকে,–আজকের দিনটি যেন নিরুদ্বেগ এবং নির্বিবাদে অতিবাহিত হয়। এরপর নিত্য-নৈমিত্তিক কাজকর্মে ব্যস্ত হয়ে পড়লো শহরের অধিবাসীরা। ততক্ষণে স্তিমিত হয়ে আসছে পাখ-পাখালির কল-কাকলি। উদীয়মান সূর্যের সোনালী আভায় ঝলমল করছে প্রকৃতি। উত্তরের অতা নদী থেকে উঠে আসা হিমেল বাতাসের আর্দ্রতা কমে আসছে ক্রমশ। ঝলমলে রোদ্দুরে স্নাত, সদাব্যস্ত শহর হিরোশিমায় কোথাও কোনো অস্বাভাবিকতা নেই,–নেই কোনো অশুভ -অমঙ্গলের চিহ্ন।

বিস্ফোরণ-পূর্ব মুহূর্ত

সকাল ৮টা বেজে ৩০ মিনিট। হঠাৎ সমস্ত নিসর্গ তোলপাড় করে , আকাশ প্রকম্পিত করে পশ্চিম দিক থেকে ছুটে এলো একটি বিমান । মাত্র একটিই। সাইরেন বেজে উঠলো যথারীতি। আতংকিত লোকজন সুবিধামতো জায়গায় আশ্রয় গ্রহণ করলো নিত্যদিনের মতো। বিকট গর্জন তুলে বিমানটি দিগন্তে অদৃশ্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আত্মগোপনকারী মানুষজন বেরিয়ে এলো যে যার আস্তানা থেকে। এ রকম জঙ্গিবিমান তো হামেশাই চোখে পড়ছে সবার। তাদের ধারণা হয়তোবা মিত্রবাহিনীর কোনো গোয়েন্দা বিমান বোমা নিক্ষেপের স্থান নির্বাচনে ছবি তুলতে এসেছিল। লোকালয়ে তো আর বোমা ফেলবার আইন বা নিয়ম নেই। হোক সে শত্রুপক্ষ। অতএব পশ্চিম দিক থেকে উড়ে আসা এবং পুবদিকে মিলিয়ে যাওয়া অজ্ঞাত বিমানটিকে তেমন কোনো আমল দিল না কেউই। কেউ জানতেও পারলো না তাদের দুর্ভাগ্যের জন্য অজ্ঞাতে অপেক্ষা করছে কী ভয়াবহ মারাত্মক পরিণতি! 

মিনিটের কাঁটা লাফিয়ে লাফিয়ে আটটা চল্লিশের ঘর ছুঁই ছুঁই করছে। এমনি সময়ে সাতরঙ্গা বিদ্যুচ্ছটা ঝলকে উঠলো কোথা থেকে?  আকাশটা কী বিস্ফোরিত হয়ে ফেটে পড়লো তুমুল আক্রশে? অতা নদীর হিমশীতল অঙ্গে এ কিসের দাবদাহ! সকালের সুর্যটা কী অগ্নিবর্ষণে উন্মত্ত হয়ে উঠলো গোটা হিরোশিমাকে গ্রাস করার জন্য? ভয়ার্ত, হতচকিত শহরের বাসিন্দারা কোনো কিছু চিন্তা করারও অবকাশ পেলো না মুহূর্তের জন্য। অসহ্য দাহিকা শক্তিসম্পন্ন আগুনের ঝাপ্টা এসে ঝলসে দিল দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। আধুনিক সভ্যজগতের মানবেতিহাসে সংযোজিত হলো যুদ্ধের ভয়াবহ বিভীষিকাময় আর একটি কলংকিত অধ্যায়। মানুষের বিরুদ্ধে মারণাস্ত্রের এই সদম্ভ ঘোষণা ইতিহাস ধরে রাখবে আবহমান কাল।

সেই ভয়াবহ সময়

বোমাটি বিস্ফোরিত হয়েছিল শূন্যে—ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫ শ ৭০ মিটার উপরে। বিস্ফোরিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বোমাটি সৌরবলয়াকৃতি ধারণ করে সৃষ্টি করেছিল ২শ ফিট পরিধিবিশিষ্ট একটি অগ্নিচক্র। বিমান থেকে বিচ্যুতি ঘটার মুহূর্তের মধ্যে অ্যাটমটি ধূমকেতুর মতো জ্বলন্ত পুচ্ছ সৃষ্টি করে তীব্রবেগে ছুটেছিল হিরোশিমার মাটি স্পর্শ করতে। আকাশে বিস্ফোরণ ঘটারকালে যে প্রচন্ড শব্দের সৃষ্টি হয়েছিল তাতে শহরের সিকিভাগ মানুষ সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছিল। বোমাটি যে বিন্দুতে নিচে নেমে এসেছিল তার মাইলটাক পরিধিতে সৃষ্টি করেছিল প্রচন্ড গতিবেগসম্পন্ন ঝড়ের। সন্ধানী গবেষক-বিজ্ঞানীরা সেই তেজস্ক্রিয় অগ্নিশলাকা বা বিন্দুটির নামকরণ করেছেন ‘এপিসেন্টার’। আর ২ শ ফিট পরিধি নিয়ে যে তেজময় সূর্য বা সৌরবলয় নেমে এসেছিল তার নামকরণ করা হয়েছে ‘হাইপোসেন্টার’। সেই হাইপোসেন্টার সর্বপ্রথম হানা দিয়েছিল হিরোশিমার শিমা হাসপাতাল প্রাঙ্গণে।

গ্রানাইট পাথর বা শক্ত ধাতব পদার্থ নিমেষে হয়েছিল দ্রবীভূত। হাইপোসেন্টার যে ঝড়ের সৃষ্টি করেছিল তার গতি ছিল সর্বোচ্চ ঝড়ের গতিবেগের ৭ গুণ বেশি। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা প্রায় ৬ হাজার গবেষণা কেন্দ্র থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছেন সেই ভয়াবহ বোমাটির তেজস্ক্রিয়তার রূপ। সহজদাহ্য কাঠ এবং অন্যান্য আসবাবপত্র সে আগুনের বিস্তৃতিলাভের প্রধানতম সহায়ক ছিল। বোমাটি ভূপৃষ্ঠে পতিত হবার পর সারা হিরোশিমা শহরে আগুন ছড়িয়ে পড়তে সময় লেগেছিল ১৫ থেকে ২০ মিনিট। আকাশে আণবিক তেজে ছত্রাকারে আসংখ্য ধোঁয়ার কুন্ডলি তেজস্ক্রিয় বৃষ্টির রূপ নিয়ে অবিরাম ৬ ঘন্টা বর্ষণের ফলে মানুষের জন্য এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। সন্ধ্যা অবধি সুন্দর ছিমছাম হিরোশিমার আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। ৩ দিন ধরে সর্বগ্রাসী আগুনে পুড়ে পুড়ে শান্ত হলো হিরোশিমা!

বিস্ফোরণোত্তর ক্ষয়ক্ষতি

গোটা শহরের ৫ মাইল ব্যাসার্ধের মধ্যে কোনো প্রকারে আণবিক তেজ ও বেগ ধারণ করে জরাগ্রস্তের মতো দাঁড়িয়েছিল কংক্রিটের তৈরি মাত্র ১৭ খানা বাড়ি। বিস্ফোরণের মূল কেন্দ্র থেকে ১ হাজার ৬শ ৫০ ফিটের মধ্যে যেসব হতভাগ্যের অবস্থান ছিল তারা হয়েছিল সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন! যারা ৪ হাজার ফিটের আওতায় ছিল তারা ঝলসে  গিয়েছিল আগুনের তাপদাহে। দেহের অসহ্য জ্বালা নিবারণের আশায় যারা ছুটে গিয়েছিল হিমশীতল অতা নদীর বুকে তারা লাভ করলো সলিল সমাধি। বোমার পতনবিন্দুর কেন্দ্রস্থল শহরের বড়বাজার এবং শিমা হাসপাতালের পাশে শুধু অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়েছিল ইন্ডাস্ট্রিয়াল মিউজিয়াম ।

অ্যাটমটি নিক্ষিপ্ত হওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল ৬০ হাজার আদম সন্তান। মারাত্মকভাবে আহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লাখে। সম্পূর্ণরূপে ধংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল ৬৭ হাজার ঘরবাড়ি। বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্র ও হাসপাতালে কর্মরত ৩শ ডাক্তারের মধ্যে ৩৩ জন ও ২ হাজার ৫শ নার্সের মধ্যে দৈবক্রমে বেঁচেছিলেন মাত্র ৬শ জন। আহত লোকজনের চিকিৎসা কিংবা আগুন নেভাবার কোনো ব্যবস্থাই নেয়া সম্ভব হয়নি। অনেক পরে টোকিও থেকে উদ্ধারকারী টিম এলে বাড়িঘরের কিংবা মাটির নিচে চাপাপড়া আহতদের বাঁচাবার জন্য সমুদ্রকূলের ডকে সাময়িকভাবে স্থাপন করা হয়েছিল একটি হাসপাতাল। ৭ আগস্ট গোয়েন্দা বিমানের মাধ্যমে টোকিও জানতে পারে হিরোশিমার এই ধ্বংসের ব্যাপকতা। টোকিও থেকে ছুটে আসেন বিজ্ঞানীরা হিরোশিমায় নিক্ষিপ্ত প্রথম আণবিক বোমার তেজ এবং শক্তির প্রচন্ডতা নিরূপণের জন্য।

ট্র্যুম্যানের সদম্ভ ঘোষণা

এদিকে হিরোশিমা যখন পুড়ছে, বোমা নিক্ষেপের ঠিক ১৬ ঘন্টা পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্র্যুম্যান বেতারযোগে পৃথিবীর লক্ষ-কোটি মানুষকে স্তম্ভিত করে দিয়ে সদম্ভে ঘোষণা করলেনঃ “এখন থেকে ১৬ ঘন্টা আগে আমাদের বোমারু বিমান থেকে হিরোশিমায় নিক্ষিপ্ত হয়েছে একটিমাত্র বোমা। এই বোমার তেজশক্তি ছিল ২০ হাজার টন টিএনটি, আর এই যুদ্ধে এযাবৎকাল যতগুলো বোমা নিক্ষেপিত হয়েছে তার যেকোনোটির চেয়ে এটি ২ হাজারগুণ বেশি শক্তিশালী এবং মারাত্মক। এই অ্যাটমে সেই শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে যা বিরাজিত রয়েছে এই পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলে–সূর্যগর্ভে। এই বোমা ব্যবহার করা হয়েছে দূরপ্রাচ্যের যুদ্ধকে শেষ পরিণতিতে পর্যবসিত করার জন্য। আমরা এই অ্যাটমটি তৈরি করতে ব্যয় করেছি ২ হাজার মিলিয়ন ডলার। পৃথিবীর বুকে এর চাইতে বড় ভয়াবহ বৈজ্ঞানিক জুয়াখেলা আর হয়নি। তবে পরিণামে জয়ী হয়েছি আমরাই।” কী নির্লজ্জ দম্ভোক্তি!

 যে বিমান ও বৈমানিক বোমা ফেলেছিল

বি-২৯ সুপার ফরট্রেস এনোলা গে (B-29 Super fortress Enola gay) বোমারু বিমানের সাহায্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল অভিশপ্ত অ্যাটমটি। বিমানটির বৈমানিক ছিলেন কর্নেল ডব্লিউ ফেরেনি এবং তার সহগামী ছিলেন ক্যাপ্টেন পারসন্স। তারা দূরপ্রাচ্য যুদ্ধাঞ্চলের সামরিক কমান্ড থেকে নির্দেশ ছাড়াও মিত্রশক্তির কেন্দ্রীয় কমান্ড থকে চূড়ান্ত নির্দেশে ঠিক ঠিক পরিকল্পনানুযায়ী কাজ সম্পন্ন করেন। কোনো কোনো সামরিক বিশেষজ্ঞের মতে, বোমাটি নিক্ষেপ করেন বৃটিশ বৈমানিক ক্লড ইথারলি। পরবর্তীতে এই বৈমানিকের নাকি মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটে। হিরোশিমার ভয়াবহ স্মৃতি তাকে তাড়িয়ে নিয়ে ফিরতো সারাক্ষণ। পাগল হয়ে ঘুরতেন লন্ডনের রাস্তায় রাস্তায়।

বর্তমানের হিরোশিমা

অন্যান্য জাপানি শহরের মতো হিরোশিমাও আজ ছুটে চলেছে অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে। ধ্বংসের ওপর সে আজ রচনা করছে নতুন বুনিয়াদ। ১৯৪৫ সালের হিরোশিমার সঙ্গে আজকের হিরোশিমার কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। স্কুল-কলেজ-কল-কারখানা সবই গড়ে উঠেছে নতুন আঙ্গিকে। হিরোশিমার নগরায়িত আধুনিক জীবন আজ যেন আণবিক যুগের নির্মম স্মৃতিকে নিজের বুকে ধারণ করতে অনীহা প্রকাশ করছে। সে ভুলে যেতে চাইছে তার বুক ঝাঁজরা করা অবিস্মরণীয় স্মৃতিকে । কিন্তু অভিশপ্ত হিরোশিমার হাজার হাজার মানুষ, যারা অ্যাটম বোমার তেজস্ক্রিয়তার শিকার হয়ে আজও বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে তারা কী ভুলতে পারবে সেই ভয়ংকর বিভীষিকাময় ৬ আগস্টকে? কিংবা যারা বংশপরম্পরায় দেহের অভ্যন্তরে আজও বয়ে বেড়াচ্ছে পারমাণবিক অজ্ঞাত ব্যাধি, –তারাও কী ভুলে থাকতে  পারবে সেই অবিস্মরণীয় স্মৃতিকে ?

উপসংহার

৬ আগস্টের স্মৃতিকে চিরজাগরূক করে রাখার জন্য হিরোশিমার মেমোরিয়াল পার্কে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল এক স্মৃতিসৌধ। প্রতি বছর এইদিনে লাখ লাখ হিরোশিমাবাসী সমবেত হয় এই স্মৃতিসৌধের পাদমূলে। তারা লাখো কন্ঠে প্রার্থনা জানায়ঃ আর যেন এমন ধ্বংসযজ্ঞের পুনরাবৃত্তি না ঘটে পৃথিবীতে। আর যেন কোনো শান্ত-সমাহিত জনপদ ক্ষত-বিক্ষত না হয় যুদ্ধ-উন্মাদদের আধুনিক মারণাস্ত্রের আঘাতে!

সেই লাখ লাখ হিরোশিমাবাসীর কন্ঠের সাথে  কন্ঠ মিলিয়ে আধুনিক সভ্যজগতের শান্তিকামী মানুষ আমরাও প্রার্থনা জানাইঃ বন্ধ হোক মরুপ্রান্তর, ভূগর্ভ-অভ্যন্তর, অতলান্তিক কিংবা প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা,–প্রশমিত হোক পৃথিবীর সকল গোলার্ধের উত্তাপ-উত্তেজনা! আর যেন কোথাও দেখতে না হয় আধুনিক মারণাস্ত্রের বৈজ্ঞানিক জুয়াখেলা কিংবা দ্বিতীয় কোনো হিরোশিমার ধ্বংসলীলা!

নূরুল ইসলাম বরিন্দী, Email: nibarindi@gmail.com

এম২৪নিউজ/আখতার