
মিঠাপুকুর২৪নিউজ ডেস্ক:
ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্তে অস্থির হয়ে উঠেছে দেশের পেঁয়াজের বাজার। হু হু করে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যের দাম। গত সোমবার ভারতের রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্তের পর এক দিনের ব্যবধানে রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। খুচরা বাজারে এখন প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১১০ টাকায়, যা রীতিমতো অবিশ্বাস্য! এতে বিপাকে পড়েছে স্বল্প আয়ের মানুষ।
পেঁয়াজ আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ভারতের মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশসহ পেঁয়াজের বড়ো সরবরাহকারী রাজ্যগুলোতে বন্যায় পেঁয়াজের উত্পাদন কমে যাওয়ায় ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারে। তবে ভোক্তাদের অভিযোগ, সরবরাহের সংকটের কথা বলে ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ নিয়ে কারসাজি করছেন। তারা ইচ্ছামতো পেঁয়াজের দাম বাড়াচ্ছেন। চাহিদার বেশি পেঁয়াজ দেশে রয়েছে
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করলেও দাম এতটা বাড়ার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। কারণ বর্তমানে চাহিদার বেশি পরিমাণ পেঁয়াজ দেশে রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে মোট পেঁয়াজ উত্পাদন হয়েছে ২৩ দশমিক ৩০ লাখ টন। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ সংগ্রহকালীন ও সংরক্ষণকালীন ক্ষতি বাদ দিলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১৬ দশমিক ৩০ লাখ টন। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ১০ দশমিক ৯১ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। এছাড়া চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ২ দশমিক ১৩ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। সব মিলিয়ে মোট পেঁয়াজের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ২৯ দশমিক ৩৪ লাখ টন। দেশে প্রতি বছর পেঁয়াজের চাহিদা ২৪ লাখ টন। এই হিসাবে গত বছর থেকে এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ পেঁয়াজ দেশে আছে, তা চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র বলেছে, আগামী ডিসেম্বর নাগাদ দেশে নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসবে। প্রতিদিন সারাদেশে ৬ হাজার টন পেঁয়াজের চাহিদা। এই হিসাবে আগামী দুই মাসে পেঁয়াজ লাগবে সাড়ে ৩ লাখ টন। এই পরিমাণ পেঁয়াজ এখন দেশের ভেতরেই আছে। তাহলে এভাবে লাগামহীনভাবে পেঁয়াজের দাম বাড়ছে কেন? সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের অজুহাতে একশ্রেণির ব্যবসায়ী কারসাজি করে পেঁয়াজের দাম বাড়াচ্ছেন।
হাকিমপুর (দিনাজপুর) সংবাদদাতা জানান, দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরের পাইকারি বাজারে এখন প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ টাকায়, যা রপ্তানি বন্ধের আগে ছিল ৪৭ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে। গতকাল হিলি স্থলবন্দরের পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে জানা গেছে, রপ্তানি বন্ধের ঘোষণার আগে গত রবিবার দুপুরে ভারত থেকে পেঁয়াজবোঝাই ১৪টি ট্রাকে ২৬৮ টন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে। আমদানি করা এই পেঁয়াজ সন্ধ্যায় বন্দরের পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৭৫-৮০ টাকায়। তবে দুটি ট্রাকের পেঁয়াজ বিক্রি করা হলেও অন্য ১২টি ট্রাকের পেঁয়াজ বেশি দামের আশায় বিক্রি করা হয়নি।
বন্দরের আমদানিকারক মো. মোবারক হোসেন জানান, ভারতের হঠাত্ এই সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা চরম বিপাকে পড়েছেন। এখনো বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় পেঁয়াজবোঝাই ৪০-৫০টি ট্রাক সীমান্তের ওপারে আটকে আছে। অনেকের নতুন এলসি করা আছে, সেগুলো আগামী ২ অক্টোবরের মধ্যে ঢোকার কথা ছিল।
পেঁয়াজ আমদানিকারক নারায়ণ চন্দ্র রায় গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করায় আমদানিকারকেরা এখন মিয়ানমার, তুরস্ক ও মিশর থেকে পেঁয়াজ আমদানি করছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আনতেও ১০-১২ দিন সময় লাগে। আর মিশর থেকে আনতে সময় লাগে ৩০ থেকে ৩৫ দিন। তবে পেঁয়াজ আসা শুরু হয়েছে, দাম কমে আসবে।
এক প্রশ্নের জবাবে এই আমদানিকারক জানান, পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ হওয়ার খবরে ভোক্তারা বাজারে পেঁয়াজ কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন। এতে চাহিদার ওপর একধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি ভোক্তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত পেঁয়াজ না কেনার পরামর্শ দেন।
পেঁয়াজের বাজার তদারকিতে ১০টি টিম মাঠে নেমেছে
পেঁয়াজের অবৈধ মজুতকারীদের ধরতে সারাদেশে মাঠে নেমেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ১০টি টিম। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে বাণিজ্যসচিব ড. মো. জাফর উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, দেশি পেঁয়াজ এখন আর কাউকে মজুত করতে দেওয়া হবে না। যার কাছে যে পরিমাণ পেঁয়াজ আছে, তা বাজারে ছাড়তে হবে। তিনি বলেন, পেঁয়াজের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ১০ জন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে ১০টি টিম গঠন করা হয়েছে। কেউ যেন অসত্ উদ্দেশ্যে পেঁয়াজের সংকট সৃষ্টির জন্য মজুত করতে না পারে, তা তদারক করা হবে। ইতিমধ্যে এই টিম পেঁয়াজ উত্পাদনশীল এলাকা বিশেষ করে পাবনা, ফরিদপুর ও উত্তরবঙ্গে রওনা হয়ে গেছে বলে তিনি জানান।
এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যসচিব বলেন, ইতিমধ্যে মিশর থেকে দুটি পেঁয়াজবাহী জাহাজ বন্দরে এসে পৌঁছেছে। সেটি খালাস হয়েছে। তুরস্ক থেকেও আমদানি করা পেঁয়াজ আসছে। এছাড়া মিয়ানমার থেকে বর্ডার ট্রেডের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত পেঁয়াজ আসছে। জনগণকে আতঙ্কিত না হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বাণিজ্যসচিব বলেন, পেঁয়াজের এই পরিস্থিতি বেশি দিন থাকবে না।
সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক (০১.১০.২০১৯)
সম্পাদক ও প্রকাশক মো: শামীম আখতার | বার্তা বিভাগ- মেইল- m24newsdesk@gmail.com
Copyright © 2026 M24News । Rangpur. All rights reserved.