
অনলাইন ডেস্ক:
গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের উৎপাদন কম হচ্ছে অন্তত ২ হাজার মেগাওয়াট। শহরাঞ্চলে কিছুটা সহনীয় হলেও গ্রামে গড়ে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে শিক্ষাক্ষেত্র সবখানেই এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এই তিন মাস দেশে গরম যেমন বাড়ে, তেমনি বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ে। তবে এবার জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। তাপমাত্রা না কমলে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার তেমন কোনো আশা নেই।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির সংকট তৈরি হওয়ার পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাশ্রয় রোধে অফিসের সময় কমানো, শপিং মল দ্রুত বন্ধ করাসহ নানা প্রচেষ্টা শুরু করেছে সরকার। কিন্তু লোডশেডিং পরিস্থিতির কারণে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, সেসব ব্যবস্থা কতটা কাজে লাগছে।
যদিও এই সংকট কাটাতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। সংস্থাটি বলছে, জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি যান্ত্রিক ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমেছে। কয়লার সরবরাহ বাড়িয়ে এবং কেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ শেষে দ্রুতই পুরোদমে উৎপাদন শুরুর চেষ্টা করছে সরকার।
এদিকে বিগত সময়ের বকেয়া আদায়ে সরকারকে চাপ দিচ্ছে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকরা। একই সঙ্গে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আদানিও তাদের পুরনো পাওয়া পরিশোধে তাগিদ দিয়ে পিডিবিকে চিঠি দিয়েছে। সময়মতো বকেয়া পরিশোধ করা না হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্ন হতে পারে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।
দেশে আগে এপ্রিল থেকে মে মাস পর্যন্ত তীব্র তাপপ্রবাহের সময় হলেও নানা কারণে এখন তা দীর্ঘায়িত হতে দেখা যাচ্ছে। এমনকি অতীতে অক্টোবর, নভেম্বর মাস থেকেই ঠান্ডা অনুভূত হতে শুরু করলেও এখন সেই চিত্র বদলে গেছে।
আবহাওয়াবিদরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, এপ্রিল থেকে জুন মাসের মাঝে মোট ছয় থেকে আটটি তাপপ্রবাহ হতে পারে এবং এর মাঝে তিন থেকে চারটি হতে পারে তীব্র তাপপ্রবাহ।
বিপাকে শিক্ষার্থীরা: চাহিদার তুলনায় সরবরাহের ক্রমবর্ধমান ঘাটতিতে ঘন ঘন ও দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ের কারণে তীব্র গরমে জনজীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়েছে সবচেয়ে বেশি। গতকাল থেকে সারাদেশে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়েছে। বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় চরম বিঘ্ন ঘটছে।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার রাণীপুকুরের এসএসসি পরীক্ষার্থী ফয়জার রহমান জানায়, তীব্র গরমে ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার কারণে ঠিকমতো পড়ালেখা করা খুব কষ্টকর হচ্ছে। কিন্তু উপায় তো নেই, পরীক্ষা তো আর বাদ দেওয়া যাবে না।
মিঠাপুকুর উপজেলার খোড়াগাছ রুপসী এলাকার মোসলেম উদ্দিন পেশায় একজন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক। তিনি বলছিলেন, বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে আয়রোজগার কমে গেছে। কারণ এত ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়া-আসা করে যে গাড়ির ব্যাটারিই ঠিকমতো চার্জ হয় না।
রংপুরের পীরগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা শরীফ সুমন জানান, গত কয়েকদিন ধরে ভয়াবহ লোডশেডিং বেড়ে গেছে। দিনে কতবার যে বিদ্যুৎ যায়-আসে তার কোনো ঠিক নেই।
উদ্বিগ্ন কৃষকরা : যুদ্ধের কারণে বেশ কিছুদিন ধরেই কৃষকরা চাহিদামতো ডিজেল পাচ্ছেন না। এর সঙ্গে লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন তারা। ফসলের উৎপাদন ঠিকমতো হওয়া নিয়ে চরম দুশ্চিন্তা এখন তাদের।
কৃষকরা জানান, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ফলে বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পগুলো ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। কোনো কোনো এলাকায় দিনে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।
শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে উৎপাদন ব্যাহত : ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ফলে শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুতের এই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে উৎপাদন সচল রাখতে হিমশিম খাচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
গাজীপুরের এ জেড ফ্যাশনের স্বত্বাধিকারী মাহমুদুল হাসান জানান, মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানার উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিকল্প উপায়ে জেনারেটর দিয়ে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখাও মুশকিল। কারণ একে তো চাহিতামতো ডিজেল মিলছে না। তার ওপর আবার এটি অনেক ব্যয়বহুল।
লোডশেডিংয়ের চিত্র : চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ায় সর্বত্রই লোডশেডিং বেড়েছে। কোথাও ৩০ শতাংশ, কোথাও ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি থাকায় বাধ্য হয়ে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকছে।
দেশে অবস্থিত ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২৯ হাজার ২৬৯ মেগাওয়াট। যদিও বছরের পুরোটা সময় এ সক্ষমতার অর্ধেক অলস বসে থাকে। দেশে অবস্থিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৮৮ শতাংশ তেল, গ্যাস ও কয়লানির্ভর। তবে বর্তমানে জজ্বালানি সংকটে ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র ১০টি ও তেলভিত্তিক কেন্দ্র ৮টি। এ ছাড়া ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে উৎপাদন কমে গেছে ৩৫টির। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক ৯টি, তেলভিত্তিক ২৪টি ও কয়লাচালিত কেন্দ্র রয়েছে ২টি।
এবারের গ্রীষ্মে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে পিডিবি প্রক্ষেপণ করেছে। বর্তমানে গড়ে ১৫ থেকে সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াট। এই চাহিদার বিপরীতে গড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ১৪ হাজার মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি (পিজিসিবি) কোম্পানির সূত্র বলছে, গতকাল বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার মেগাওয়াটের ওপরে। লোডশেডিং হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। আগের দিন সোমবার সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৯৩২ মেগাওয়াট। রবিবার সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট। লোডশেডিং হয় ১ হাজার ৭৩০ মেগাওয়াট। শনিবার সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৭২৫ মেগাওয়াট, ঘাটতি ছিল ১ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট।
গত রবিবার বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৯২ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করে পেট্রোবাংলা। যেখানে পিডিবির চাহিদা কমপক্ষে ১০০ কোটি ঘনফুট। এদিনের তথ্য বলছে, কয়লা স্বল্পতা থেকে ৬১২ মেগাওয়াট, গ্যাস ও তেল ঘাটতির কারণে প্রায় ৫ হাজার মেগাওয়াট এবং মেরামতের কারণে ১ হাজার ৮১২ মেগাওয়াট উৎপাদন বন্ধ ছিল।
বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে একটা প্রভাব পড়ছে, তবে আমরা আশা করছি লোডশেডিং বড় আকারে হবে না। গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। তবে ফার্নেস তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় তেলভিত্তিক উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে, তাই আপাতত সেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন নির্দিষ্ট পরিমাণে করা হচ্ছে।
মোবাইল নেটওয়ার্ক বিঘ্নের শঙ্কা : দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে টেলিকম সেবা বড় ঝুঁকিতে পড়েছে বলে সতর্ক করেছে মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন (অ্যামটব)। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, লোডশেডিংয়ের কারণে টাওয়ার চালাতে প্রতিদিন প্রায় ৫২ হাজার লিটার ডিজেল ও ২০ হাজার লিটার অকটেন লাগছে।
অ্যামটব জানিয়েছে, ডেটা সেন্টার ও সুইচিং হাব বিদ্যুৎবিহীন হলে বড় ধরনের নেটওয়ার্ক বিভ্রাট হতে পারে। প্রতিটি ডেটা সেন্টারে ঘণ্টায় ৫০০-৬০০ লিটার জ¦ালানি লাগে, দিনে প্রায় ৪ হাজার লিটার পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পেলে কল ড্রপ, ইন্টারনেট বিভ্রাট ও জরুরি সেবায় বিঘেœর আশঙ্কা রয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, দেশে ৪৬ হাজারের বেশি টেলিকম টাওয়ার ও ২৭টি ডেটা সেন্টার ১৮ কোটির বেশি গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে। অপারেটররা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম. তামিম বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ফার্নেস অয়েল প্রয়োজন। সেটির একটি সংকট আছে। এ ছাড়া গ্যাসসহ জ্বালানি সংকট রয়েছে। যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এবার যদি গরম বাড়ে, তাহলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি অনেক বেশি খারাপের দিকে যেতে পারে। তথ্যসূত্র: দেশ রুপান্তর
এম২৪নিউজ/আখতার
সম্পাদক ও প্রকাশক মো: শামীম আখতার | বার্তা বিভাগ- মেইল- m24newsdesk@gmail.com | @ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Copyright © 2026 M24News । Rangpur. All rights reserved.