
মোঃ শামীম আখতার |
মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ১৪৩তম জন্ম ও ৯১তম মৃত্যুদিবস আজ (৯ ডিসেম্বর)। দিবসটি নিয়ে নানা আয়োজন থাকলেও রোকেয়ার জন্মস্থানে তার ভক্ত-অনুরাগীদের মন ভালো নেই। বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র ও স্মৃতিবিজড়িত ভিটেমাটি অযতত্ন আর অবহেলায় বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে। কলকাতা থেকে পায়রাবন্দে রোকেয়ার দেহাবশেষ আনার উদ্যোগটিও ফাইলবন্দী। দিনটি কেবলই আনুষ্ঠানিকতা আর নানা আশ্বাসে কেটে যায়। রোকেয়াবাসী জানে না তাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার আলো ফুটবে কবে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালের ৯ ডিসেম্বর রোকেয়া মেলার আলোচনা সভায় তার ভাতিজি রনজিনা সাবের দাবি তোলেন বেগম রোকেয়ার দেহাবশেষ কলকাতা থেকে ফিরিয়ে আনার। রংপুরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক বিএম এনামুল হক দাবিটির প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করে উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। ২০১০ সালে একই স্থানে বিএম এনামুল হক বলেছিলেন, রোকেয়ার দেহাবশেষ পায়রাবন্দে আনার ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দফতরে আবেদন করা হয়েছে। ২০১১ সালের রোকেয়া দিবসের আগে তার দেহাবশেষ পায়রাবন্দে আসবে। এ ঘোষণায় সেদিন পায়রাবন্দবাসী আনন্দিত হয়েছিল। কিন্তু পেরিয়ে গেল এক দশক। এ ব্যাপারে আর কোনো উদ্যোগ নেয়নি জেলা প্রশাসন।
রোকেয়ার বাস্তুভিটা সংলগ্ন পায়রাবন্দ সরকারি বেগম রোকেয়া স্মৃতি মহাবিদ্যালয়ের উচ্চ মাধ্যমিক পড়ুয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শুধু ৯ ডিসেম্বর এলেই আমাদের মনে পড়ে বেগম রোকেয়া নামে এখানে কেউ ছিলেন। কিন্তু দিবসটি পার হলেই আমরা তাকে মোটেও স্মরণ করি না। আমাদের ইচ্ছা আমরা রোকেয়ার কবরে ফুল দেব। কিন্তু ভারত থেকে তার দেহাবশেষ আনার কোনো উদ্যোগ নেই। দিন দিন বেগম রোকেয়ার ভিটেমাটি ও সম্পত্তিও বেহাত হয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে আগামী প্রজন্মের মাঝে রোকেয়ার স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। নীতিনির্ধারকরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন পায়রাবন্দে বেগম রোকেয়া স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল।
তিনি বলেন, বিবিসির জরিপে বিশ্বসেরা ২০ নারীর তালিকায় বেগম রোকেয়ার স্থান ৬ নম্বরে। অথচ তার দেহাবশেষ দেশে আনতে বছরের পর বছর গুনতে হচ্ছে। এটা দুঃখজনক। তৎকালীন জেলা প্রশাসকের প্রতিশ্রুতি এখন ফাইলবন্দি।
তিনি আরো বলেন, বেগম রোকেয়াকে নিয়ে দেশে কাঠামোগত কিছু পরিবর্তন এসেছে। যেমন রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র নির্মাণ, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাসহ রোকেয়ার নামে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে। কিন্তু রোকেয়ার দর্শন ও চেতনাকে মনের মধ্যে লালন করা হচ্ছে না। স্মৃতিকেন্দ্রের পাঠাগারে রোকেয়া সম্পর্কিত দুটো বইপুস্তকও নেই। রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও রোকেয়াকে নিয়ে গবেষণা, পড়াশোনা হয় না। যার নামে বিশ্ববিদ্যালয় তার স্মৃতিস্মরণে ভাস্কর্যও নেই। রোকেয়ার বাস্তভিটাকে প্রতœসম্পদে পরিণত করতে কোনো উদ্যোগ নেই। আমার কাছে মনে হয় এখন যা হচ্ছে, তা রোকেয়াকে ধারণ করে নয়, বরং এটা শুধুই আনুষ্ঠানিকতা।
বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের ইনচার্জ আবিদ করিম মুন্না বলেন, নতুন একটি প্রকল্পের মাধ্যমে স্মৃতিকেন্দ্রে বন্ধ থাকা বৃত্তিমূলক সেলাই প্রশিক্ষণ চালু করাসহ নারীদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সেই লক্ষ্যে প্রস্তাবনা তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি বেগম রোকেয়ার জীবন, সাহিত্য, কর্ম-দর্শন ব্যাপক প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে বাংলা একাডেমি থেকে আরও কিছু উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই স্মৃতিকেন্দ্রটি আরও আধুনিক করা হবে। গবেষকদের জন্য বিশেষায়িত একটি গবেষণামূলক পাঠাগার ও ডরমিটরি করা হবে। এতে বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত শিক্ষার্থী, দর্শনার্থী, গবেষক ও পর্যটকরা উপকৃত হবেন। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রটি আবারো প্রানবন্ধ হয়ে উঠবে।
বাংলা একাডেমিকর পরিচালক ডা. কে.এম মোজাহেদুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনের সবুজ পাতায় তালিকাভুক্ত হয়েছে। ২০২৩ জুলাই থেকে ২০২৬ অর্থবছরের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। স্থাপত্য অধিদপ্তর নকশা প্রণয়ন করবে। রোকেয়া স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল জানান, গত ২০০৭ সালে তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে স্মৃতি কেন্দ্রকে বিকেএমই গার্মেন্টস প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করা হয়। সেনা সমর্থিত সরকার চলে যাওয়ার পর এটি দখলমুক্ত করে রোকেয়া চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার দাবি থাকলেও বাস্তবে তেমন কিছু হয়নি।
এদিকে জেলা প্রশাসনের সভায় বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র চালুর পাশাপাশি সোদপুরে থাকা রোকেয়ার কবরটি আনার ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহরিয়ার রহমান। তিনি বলেন, বেগম রোকেয়া শুধু মিঠাপুকুর বা পায়রাবন্দের নয়, তিনি সারা বাংলাদেশের। তিনি নারী জাগরণের অগ্রদূত ছিলেন। তার যে বাস্তভিটা এবং সম্পত্তি নিয়ে দুটি মামলা চলমান রয়েছে। আমরা সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে আদালতে একটা জবাব দিয়ে দিয়েছি। আমরা চেষ্টা করছি সেগুলো মনিটর করার। একই সঙ্গে ভারতের সোদপুরে থাকা বেগম রোকেয়ার কবরটি বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারেও কথাবার্তা হচ্ছে। এটি দুটি রাষ্ট্রের সরকার পক্ষের ক‚টনৈতিক বিষয়।
উল্লেখ্য, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সে সময় মুসলিম সমাজে মেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর কোন চল ছিল না। তাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও পরিবারের সবার অগোচরে তার বড় ভাইয়ের কাছে উর্দু, বাংলা, আরবি ও ফারসি পড়তে এবং লিখতে শেখেন। তার জীবনে শিক্ষালাভ ও মূল্যবোধ গঠনে তার ভাই ও বড় বোন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। পরবর্তীতে বিহারের ভাগলপুরে সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বিয়ে হয়। স্বামীর উৎসাহে ও নিজের আগ্রহে তিনি লেখাপড়ার প্রসার ঘটান। বেগম রোকেয়া ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর মারা যান। বেগম রোকেয়া ২০০৪ সালে বিবিসি বাংলার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জরিপে ষষ্ঠতম নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক হিসেবে পরিচিত। তার উল্লেখযোগ্য রচনা হলো ‘মতিচূর’, ‘সুলতানার স্বপ্ন’, ‘পদ্মরাগ’, ‘অবরোধ-বাসিনী’।
এম২৪নিউজ/আখতার
সম্পাদক ও প্রকাশক মো: শামীম আখতার | বার্তা বিভাগ- মেইল- m24newsdesk@gmail.com
Copyright © 2026 M24News । Rangpur. All rights reserved.