
গোলাম মোস্তফা আনছারী (রংপুর):
রংপুর বিভাগের ৮ জেলার বিভিন্ন স্থানের ছোট বড় গরু ও ছাগলের খামারিরা করোনাকালেও ভালো লাভের আশায় বুক বেঁধেছেন। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে গবাদি পশু গরু ছাগল মোটা তাজা করণে ব্যস্ত সময় পাড় করছেন তারা। এবার রংপুর বিভাগে কোরবানির জন্য ৫ লাখ ৬৮ হাজার গরু ও ১ লাখ ৫০ হাজার ৪০৯টি ছাগল ও ভেড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।
এবার পশুর ভাল দাম পাওয়ার প্রত্যাশায় খামারিরা জানান, ক্ষতিকর হরমোন কিংবা ইনজেকশনের ব্যবহার ছাড়াই দেশীয় পদ্ধতিতে গবাদি পশু পালন করছেন তারা। কিন্তু করোনার এই পরিস্থিতিতে গরুর ন্যায্য দাম নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে হাটে গরু উঠানোর দাবি খামারিদের।
খামারিরা জানান, গবাদি পশু খাদ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা হলে দেশে ছোট বড় খামারিদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। এতে মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
রংপুর মহানগরীর দর্শনা সুতরাপুর এলাকার খামারী শাহ মোঃ আশরাফুদৌলা আরজু জানান, ঈদে বিক্রয়ের জন্য তার খামারে ব্রাম্মা, শাহীবল, ফ্রিজিয়ান ও ভারতীয়সহ বিভিন্ন জাতের প্রায় শতাধিক গরু প্রস্তুত করা হয়েছে। একটি গরুর পিছনে প্রতিদিন ব্যয় হচ্ছে ২০৬ টাকা থেকে ২১০টাকা পর্যন্ত। প্রতিটি গরু ভাল ও তরতাজা। তাই ভাল দাম পাওয়ার প্রত্যাশা করছি।
মিঠাপুকুরে বলদিপুর এলাকার গরু খামারি নজরুল ইসলাম জানান, ৪৫ হাজার টাকায় ৩ বছর আগে হলেস্টিয়ান জাতের একটি গরু কিনেছিলাম। গত বছর এর দাম সাড়ে ৫ লাখ টাকা উঠেছে, কিন্তু বিক্রি করিনি। তিনি আরও জানান, গরুটির বয়স ৩ বছর ১১ মাস। শরীরের দৈর্ঘ্য ১০ ফুট, প্রস্থ ৬ ফুট। এর ওজন প্রায় ২০ মণ। ষাঁড়টির কাঁচা ঘাস, খৈল, গমের ভুসি এবং চালের পালিশ (ধান ভাঙানোর সময় চালের গায়ে থাকা ভিটামিনসমৃদ্ধ গুঁড়ো) নিয়মিত খাওয়ানো হয়। নিয়মিত গোসল করানো হয়। প্রতিদিন এর পিছনে প্রায় ২০০ টাকা খরচ হয়।
রংপুর সদর উপজেলার চন্দনপাট ইউনিয়নের শরিফুল ইসলাম জানান, একটি গরুর জন্য দিনে ১৩৫ টাকা খরচ হয়। প্রতিদিন খাবার হিসেবে খৈল, ভুসি, কুড়া, ফিড ও কাঁচা ঘাস দিতে হয়।
তিনি আরও বলেন, এ বছর ১২টি গরু মোটাতাজা করছেন। মানভেদে প্রতিটি গরুর দাম ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত হবে। গরু বিক্রি করে এবার লাভের আশা করছি। একই গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম বলেন, করোনার এই পরিস্থিতিতে গরু মূল্য নিয়ে চিন্তায় রয়েছি। তিনি বলেন, যদি হাটে গরু ছাগল উঠাতে না পারি তা হলে কীভাবে ন্যায্য মূল্য পাওয়া যাবে।
রংপুর জেলা ডেইরি ফার্মাস এসোসিয়েশনের সভাপতি লতিফুর রহমান মিলন জানান, করোনা পরিস্থিতিতে সরকার বিভিন্ন সেক্টরে প্রণোদনা চালু রেখেছেন। ব্যবসায়ীদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করা হচ্ছে। কৃষকরা প্রণোদনা পাচ্ছেন। কিন্তু রংপুর জেলায় সাড়ে তিন হাজারের উপরে গরুর খামার রয়েছে। এখানে প্রায় ৭ হাজার শ্রমিক কর্মচারীর কর্মসংস্থান হচ্ছে। এই দুর্যোগে তারা কোনো জায়গা থেকে সাহায্য পায়নি। এতে করে ছোট বড় অনেক খামার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ও বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন খামারি জানান, কোরবানি ঈদ ঘনিয়ে এলে সীমান্ত এলাকার ভারতীয় কাঁটাতারের ফাঁক গলিয়ে আসতে থাকে ভারতীয় গবাদি পশু। স্থানীয় কিছু জনপ্রতিনিধির তত্বাবধানে ও সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর সহযোগিতায় একাধিক চক্র সীমান্ত দিয়ে দেশে গরু প্রবেশে সহায়তা করেন। অনেকটা রুগ্ন ও অপুষ্ট এসব গরু বাজারে কমমূল্যে বিক্রি করা হয়। এতে দেশীয় খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রংপুর কেন্দ্রীয় বাসটার্মিনাল এলাকার গবাদি পশু খাদ্য সরবরাহকারী রশিদুল ইসলাম জানান, পশু খাদ্যের মূল্য তালিকা প্রতিদিন উঠানামা করছে। দেখো গেছে একদিনের ব্যবধানে গমের ভুষি প্রতি বস্তায় বেড়েছে ১শ’ টাকা থেকে ১৫০ টাকা। তিনি বলেন, গমের মোটা ভুসি ৩৭ কেজি বিক্রি করা হচ্ছে ১ হাজার ২শ’টাকা, চিকন ভুসি ৫৫ কেজি ১ হাজার ৬৫০ টাকা। ১৫ কেজির ডাবলি বিক্রি হচ্ছে ৫৮০ টাকা। ২৫ কেজির মসুরের ছোলা বিক্রি করা হচ্ছে ৮৫০ টাকা। ৩৭ কেজি ধানের গুঁড়া বিক্রি করা হচ্ছে ৪৮০ টাকা। ৫০ কেজির ধানের খুদ বিক্রি করা হচ্ছে ১ হাজার ৩শ’টাকা। এছাড়াও বিভিন্ন কোম্পানিভেদে গরু ফিড বিক্রি করা হচ্ছে।
রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য মতে, রংপুর বিভাগে ৩ থেকে ৫টি গরু পালন করে এমন গরুর খামার রয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৮০৩টি। ৬ থেকে ১১টি গরু পালন করে এমন খামার রয়েছে ১২ হাজার ৭৭৯টি। ১২ থেকে ২৯টি গরু পালন করে এমন খামার রয়েছে ১ হাজার ১শ’৬৫টি এবং ৩০ থেকে ৫০টি গরুর খামার রয়েছে ১শ’৯টি। এছাড়াও ৫১টির উপরে পালন করে এমন খামার রয়েছে ৩০টি।
রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের উপ-পরিচালক হাবিবুল হক জানান, গত বছর কোরবানিতে রংপুর বিভাগে ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮৩০টি গরু ৯৬৬টি মহিষ জবাই করা হয়েছিল। এ ছাড়াও ১ লাখ ছাগল ও প্রায় দেড় লাখ ভেড়া কোরবানি করা হয়।
তিনি আরও বলেন, এই অঞ্চলের খামারিরা যাতে করোনার এই পরিস্থিতিতে গবাদি পশুর ন্যায্য মূল পান সেই দিক বিবেচনা করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে গরুর হাট বসানোর চিন্তা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, রংপুর বিভাগে এবার কোরবানির উদ্বৃত্ত পশু রয়েছে। বিভাগের চাহিদা পূরণ করে অন্যান্য এলাকায় জোগান দেওয়া সম্ভব হবে। পশুর শরীরে যাতে ক্ষতিকর ইনজেকশন পুশ না করতে পারে সেদিকে আমরা নজর রাখছি। একই সঙ্গে খামারিদেরও উদ্বুদ্ধ করছি।
এম২৪নিউজ/আখতার।
সম্পাদক ও প্রকাশক মো: শামীম আখতার | বার্তা বিভাগ- মেইল- m24newsdesk@gmail.com
Copyright © 2026 M24News । Rangpur. All rights reserved.