
রংপুর অফিস:
রংপুর বিভাগের অন্যতম চিকিৎসা কেন্দ্র রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহের ত্রুটির অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের অক্সিজেন লাইনগুলো ২৫-৩০ বছরের পুরনো হওয়ায় নিরবচ্ছিন্নভাবে অক্সিজেন সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটছে। গত তিনদিনে ২০ জন রোগী অক্সিজেনের অভাবে মারা গেছেন বলেও অভিযোগ করেছেন রোগীর স্বজনরা। এ অবস্থায় অনেক স্বজনরা বাইরে থেকে অক্সিজেন কিনে রোগীদের বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।
হাসপাতালের অক্সিজেন সরবরাহের দায়িত্বে থাকা কর্মচারীরা বলছেন, পুরনো হয়ে যাওয়ায় অক্সিজেন সরবরাহ পাইপ লাইনগুলো ঠিকভাবে কাজ করছে না। নিরবচ্ছিন্নভাবে অক্সিজেন পাচ্ছেন না রোগীরা।
রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ রেজাউল করিম অক্সিজেন লাইনে সমস্যার কথা সাংবাদিকদেও কাছে স্বীকার করেছেন।
তিনি বলেছেন, এ সংকট নিরসনের কাজ চলছে। আরও ১০ হাজার লিটার ক্ষমতা সম্পন্ন অক্সিজেন প্লান্ট স্থাপনের কাজও এগিয়ে চলছে। তবে অক্সিজেনের অভাবে রোগী মারা যাওয়ার বিষয়ে হ্যাঁ বা না, কোনও মন্তব্য করেননি তিনি।
গত দু’দিন ধরে রংপুর মেডিক্যালের হৃদরোগ বিভাগ, মেডিসিন বিভাগের ৩ ও ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে ঘুরে রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় অক্সিজেন সংকটের ভয়াবহ অবস্থার কথা। বিশেষ করে উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালের ৩ নম্বর ও ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের রোগীরা শ্বাসকষ্টের সময় প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সাপোর্ট পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনরা।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের শহিদুল নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, তিন দিন ধরে চাচার শ্বাসকষ্ট ও অক্সিজেনের সমস্যা চলছে। কোনও উপায় না পেয়ে বাইরে থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা দিয়ে অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে এনে অক্সিজেন সাপোর্ট দিতে হচ্ছে।
শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া লালমনিরহাটের আমিনুল ইসলামের মেয়ে আফরোজা বেগম বলেন, হাসপাতালের ওয়ার্ডে অক্সিজেন সরবরাহের লাইন দিয়ে ঠিকমতো অক্সিজেন আসছে না। কখনও ভালো সাপোর্ট থাকে, আবার অনেক সময় চাপ কমে যায়। এসময় অক্সিজেনের অভাবে বাবার অবস্থা খারাপ হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে এনে অক্সিজেন দিতে হচ্ছে।
জেলার পীরগঞ্জ থেকে আসা শ্বাসকষ্টের রোগী মমতাজ আলীর ছেলে মাসুদ বলেন, একটা লাইন দিয়ে দু’জনকে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। এতে করে নিরবচ্ছিন্নভাবে অক্সিজেন না পাওয়ায় ভয়াবহ সমস্যার মধ্যে পড়েছেন রোগীরা। গত তিন দিনে অন্তত ২০ রোগী মারা যাওয়ার দৃশ্য দেখতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২ নম্বর ওয়ার্ডের রোগীর স্বজনরা বলছেন সেখানকার অবস্থা বেশি খারাপ। কুড়িগ্রাম থেকে আসা রোগী আমিনুল ইসলাম বলেন, অক্সিজেন লাইন আছে সলোমিটার নেই, ফলে অক্সিজেন পাচ্ছিলাম না। সলোমিটারের জন্য বিভিন্ন দফতরে জানিয়েও পাইনি। পরে দেড় হাজার টাকা দিয়ে সলোমিটার সংগ্রহ করেছি ।
এদিকে করোনার উপসর্গ নিয়ে শত শত রোগী আসায় সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন হাসপাতালের ডাক্তার-নার্স ও অন্য কর্মীরা। অক্সিজেন সেবার দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ বলছে ৮০-এর দশকে ফিটিং করা পাইপ লাইনগুলো রয়েছে ঝুঁকির মুখে। ফলে ইচ্ছা থাকলেও ভালো সাপোর্ট দেওয়া যাচ্ছে না। রোগীর স্বজনরা শুধুই অক্সিজেনের হাহাকারের কথা বলছেন। কিন্তু রোগীর চাপ সামাল দিতে চিকিৎসক-নার্সসহ সব কর্মীই হিমশিম খাচ্ছেন। বাধ্য হয়ে একজনের অক্সিজেন সিলিন্ডারে দুটি সংযোগ স্থাপন করে সেবা দিতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দু’জন নার্স নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, উপসর্গ নিয়ে অনেক রোগী ভর্তি হচ্ছেন। বেশিরভাগই শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। তাদের করোনা পরীক্ষা করা হচ্ছে না। এমন অবস্থায় অনেকক্ষেত্রে নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট আসার আগেই রোগী মারা যাচ্ছে।
কর্তব্যরত একজন চিকিৎসক বলেন, চিকিৎসা সেবা ও অন্য বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা না বলার নির্দেশনা আছে। কিছু জানতে চাইলে পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। তিনিই সব জানাবেন।
রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পরিচালক ডাঃ রেজাউল করিম সাংবাদিকদের কাছে তিনি অক্সিজেন সংকটের কথা স্বীকার করে নেন।
তিনি বলেন, এই সংকট কাটিয়ে নতুনভাবে আরও একটি অক্সিজেন জেনারেটর স্থাপনের পরিকল্পনা চলমান রয়েছে। আরও ১০ হাজার লিটার ক্ষমতা সম্পন্ন অক্সিজেন প্লান্টও স্থাপন করা হচ্ছে। তবে অক্সিজেনের অভাবে করোনার উপসর্গ নিয়ে ২০ রোগী মারা যাওয়ার বিষয়টি জানা নেই বলে দাবি করেন হাসপাতালের পরিচালক। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোগীর মারা যাওয়া স্বাভাবিক ঘটনা বলে জানান তিনি।
এম২৪নিউজ/আখতার
সম্পাদক ও প্রকাশক মো: শামীম আখতার | বার্তা বিভাগ- মেইল- m24newsdesk@gmail.com | @ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Copyright © 2026 M24News । Rangpur. All rights reserved.