
নূরুল ইসলাম বরিন্দী:
বাইবেলের ছোট্ট একটি গল্প দিয়ে শুরু করা যাক আজকের লেখাটি। প্রভু যিশু দয়াপরবশ হয়ে দৃষ্টিদান করলেন একজন অন্ধ লোকের। কিছুদিন পর পথিমধ্যে তিনি দেখলেন দৃষ্টি ফিরে পাওয়া সেই অন্ধ লোকটি লোলুপ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে এক পতিতার দিকে। এ দৃশ্য দেখে প্রভু যিশু ভয়ানক ক্ষুব্ধ হলেন। তিনি লোকটিকে ডেকে তিরস্কার করে বললেনঃ এজন্যই কী আমি তোমাকে দৃষ্টিদান করেছি? লোকটি অত্যন্ত বিনীতভাবে জবাব দিলঃ প্রভু, আমার দৃষ্টিশক্তি ছিল না, আপনি অনুগ্রহ করে দৃষ্টিদান করেছেন। অন্ধজনে আলো দিয়েছেন। এখন আমি চক্ষুষ্মান হয়ে এছাড়া আর কি-ইবা করতে পারি!
গল্পটির মর্মার্থ এই যে, প্রভু যিশু লোকটির শুধু বাহ্যিক দৃষ্টিই দান করেছেন, অন্তর্দৃষ্টি দান করেননি। সে কারণে লোকটি শুধু কুদৃষ্টিই লাভ করেছে, সুদৃষ্টিসম্পন্ন হতে পারেনি।
গল্পটির অন্তর্নিহিত বিশ্লেষণ হলোঃ প্রকৃত চক্ষুষ্মান হতে হলে চাই উপযুক্ত শিক্ষা। যে শিক্ষা মানুষকে কুপথে পরিচালিত করে, যে শিক্ষা সৎ ও ভালো মানুষ হতে শেখায় না, সে শিক্ষা কারও জন্য গ্রহণীয় হতে পারে না। কুশিক্ষা অবশ্যই বর্জনীয়।
প্রশ্ন উঠতে পারে, আমরা কী সত্যি সত্যি সুশিক্ষালাভে ব্রতী হচ্ছি অথবা শিক্ষার্থীদের শেখাচ্ছি? দেশে এই যে হাজার হাজার শিক্ষক লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে শিক্ষাদানে নিয়োজিত রয়েছেন, তাঁরা কী সবাই স্ব স্ব দায়িত্ব পালনে সৎ এবং সক্ষম, উপযুক্ত কিংবা পারংগম? জীবন ধারণের তাগিদে অনেকেই বেছে নিয়েছেন এ পেশাকে এটা যেমন সত্য, তেমনি মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে কেউ কেউ তাদের মহান দায়িত্ব পালন করছেন তা-ও সত্য। পেশাগত সবক্ষেত্রেই ফাঁকি রয়েছে, রয়েছে দক্ষ-অদক্ষের ফারাক। সেক্ষেত্রে প্রশংসা আর অপবাদের দায়ভার বর্তায় যার যার কর্মে, আচরণে।
সন্দেহ নেই শিক্ষকতা একটি সম্মানজনক পেশা। অন্যান্য পেশাজীবীর মতো এ পেশায় নিয়োজিতরা ফাঁক আর ফাঁকি, অদক্ষ আর অযোগ্যতার অভিধায় অভিহিত হতে পারেন না। কারণ তারা প্রকৃত অর্থেই শিক্ষক।
কিন্তু বাস্তব অবস্থাটা কী? দেশের শিক্ষাংগনগুলোতে যারা শিক্ষাদানে ব্যাপৃত রয়েছেন তাঁরা কী ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ নাকি নিছক চাকরিজীবী, এ প্রশ্ন ওঠা আজ আর অবাস্তব নয়। জানি, অনেকেই ভীষণ মুখিয়ে উঠবেন। কিন্তু ব্যাপারটা কী আসলেই পাশ কাটিয়ে যাবার মতো কিংবা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবার বিষয়?
দেশে এই যে ব্যাংগের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা কিন্ডার গার্টেন, টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট, কোচিং সেন্টার, টোয়েফল, এস সি কিউ ইত্যাদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এরা কী সত্যিকারার্থে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানে ব্রতী না-কি এগুলোকে উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে-এ প্রশ্ন আজ শিক্ষার্থী, অভিভাবক সবারই।
সম্মানজনক পেশার জন্য সম্মানজনক পারিশ্রমিক আশা করা বাতুলতা নয়। আশার কথা আমাদের দেশে ইদানীং শিক্ষক সম্প্রদায় খুব একটা সচ্ছলভাবে না হলেও বড়ই দুরবস্থার মধ্যে আছে এ কথা অতি বড় দুর্মুখও বলতে পারবে না। এক ঘন্টা ক্লাস নিয়ে, সংসারের কাজ-কর্ম সেরে, ব্যবসা-বাণিজ্যের ঝুটঝামেলা গুছিয়ে, দুই/তিন জায়গায় প্রাইভেট টিউশনি সেরে স্কুলে গেলেও যখন মাসশেষে সরকারি বেতন বা অনুদানের টাকা বাড়তি হিসেবে পকেটে যায় তখন পেশাটাকে খুব একটা খারাপ বলে মনে না হওয়ারই কথা।
শিক্ষক মহোদয়গণ, নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য ইউনিয়ন করুন, ফেডারেশন করুন, স্বার্থ হাসিলের জন্য কর্তৃপক্ষের তাঁবেদারি করুন, বাড়তি আয়ের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার নামে টু-পাইস কামাবার নিমিত্তে ব্যবসায়িক কেন্দ্র গড়ে তুলুন আমাদের কোনো আপত্তি বা মাথাব্যথা নেই। কিন্তু যে অভিভাবকটি তার কষ্টার্জিত উপার্জনের বেশিরভাগ অর্থ সন্তানের সুশিক্ষা অর্জনের জন্য ব্যয় করেন তারদিকে একবার চোখ ফেরান। দেখুন, আপনার ছাত্রটি পাসের পর পাস দিয়ে যোগ্যতার সাথে তার কাজকর্ম সম্পাদন করতে পারছে কি-না, না পারলে সে দোষ কার? অভিভাবকের? ছাত্রের? নাকি শিক্ষক মহোদয়ের –যার সুশিক্ষা প্রদানের ফলশ্রুতিতে বাস্তব কর্মজীবনে নিপুণ কর্মযোগী হওয়ার কথা।
নিরেট সত্যভাষণ। বুকে হাত দিয়ে হলফ করে ক’জন শিক্ষক বলতে পারেন- “আমার শিক্ষাদানে কোনো খাদ ছিল না, কোনো স্বার্থ ছিল না। শিক্ষাদানের নামে শুধুই অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্য ছিল না।”
তবু, এ কথাও ঠিক যে, আলোচ্য বিষয়ে এককভাবে শিক্ষকদের দায়ী করার যৌক্তিকতা নেই। শিক্ষাংগনসহ দেশের গোটা সমাজে যেখানে অব্যবস্থা বিরাজ করছে সেখানে এককভাবে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা উচিতও নয়। তবে সুশিক্ষাদানের অভাবে হোক অথবা সুশিক্ষা গ্রহণের অনীহার কারণে হোক ছাত্রসমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই আজ বাইবেল কথিত দৃষ্টি ফিরে পাওয়া অন্ধ লোকটির মতো কুদৃষ্টিসম্পন্ন শিক্ষার্থীতে পরিণত হচ্ছে। হারিয়ে ফেলছে সুপথ আর কুপথ চেনার দৃষ্টি। অর্জন করতে পারছে না ভালো-মন্দ বিচার করার অভিজ্ঞতা। দেশ এবং জাতির জন্য এটা যে কী মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনছে তা সকলেরই অনুধাবন করার বিষয় বৈকি!
আজ দেশের শিক্ষাংগনে শিক্ষাব্যবস্থায় যে পরিবেশ-পরিস্থিতি বিদ্যমান তা অচিরেই দূরীভূত না হলে জাতির জীবনে যে অশুভ জগদ্দল পাথর চেপে বসবে, যে অচলায়তনের মজবুত শেকড় গেড়ে বসবে তা থেকে পরিত্রাণ পাবার কোনো উপায় খুঁজে পাওয়া যাবে না অদূর কিংবা সুদূর ভবিষ্যতে!
নূরুল ইসলাম বরিন্দী, email: nibarindi@gmail.com
সম্পাদক ও প্রকাশক মো: শামীম আখতার | বার্তা বিভাগ- মেইল- m24newsdesk@gmail.com | @ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Copyright © 2026 M24News । Rangpur. All rights reserved.