
নূরুল ইসলাম বরিন্দী:
দৃশ্যপট একঃ স্থান রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানার গ্রাম্যহাট রাণীপুকুর। সময় বিকাল ৫টা। হাটবার। জেলার রবিশস্য উৎপাদনকারী এলাকা হিসাবে খ্যাত। অবস্থান ঢাকা–রংপুর মহাসড়ক থেকে ৪ কিলোমিটার ভেতরে, পাকা রাস্তার পাশে। হাটের লাগোয়া হাফিজ মিয়ার তরকারির আড়ৎ। বাজার থেকে মালামাল কেনাকাটা শেষ। আড়তের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকে বোঝাই করা হচ্ছে তরি-তরকারির বস্তা। কেনা কৃষিপণ্যের মধ্যে রয়েছে প্রধাণত করলা, পটল, বেগুন। এখন যেহেতু অফ সিজন সেহেতু মাত্র একটি ট্রাকই ঢাকা যাতায়াত করছে। তাও ২/৩ দিন পর পর। আজ লোড হলো ৫০ বস্তা মাল। অর্থাৎ সাকুল্যে ২৫০ মণ। সন্ধ্যা ঠিক ৭টার সময় মাল বোঝাই ট্রাক রওনা দিল ঢাকার কাওরান বাজারের উদ্দেশে। হাফিজ মিয়া গ্রামের হাট থেকে রহিমুদ্দিন, ছলিমুদ্দিন প্রমুখ প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকে করলা, পটল, বেগুন কিনেছেন গড়ে ১০ টাকা কেজিদরে। ট্রাকে উঠেছে ৫০ বস্তা কাঁচা মাল। প্রতি বস্তায় আড়াই মণ অর্থাৎ ৫০ গুণন ১০০ কেজি= ৫০০০ হাজার কেজি মাল। প্রতি কেজে ১০ টাকা হিসাবে ৫০০০ হাজার গুণন ১০= ৫০০০০ হাজার টাকা পুঁজি খাটিয়েছেন হাফিজ মিয়া।
দৃশ্যপট দুইঃ ঢাকার কাওরান বাজার। সময় ভোর ৫টা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শয়ে শয়ে ট্রাক বোঝাই হয়ে আসা মাল আনলোড হচ্ছে আড়তগুলোর সামনে। হাফিজ মিয়া তার ট্রাকের মাল খালাস করে আড়ৎদার কালু মিয়ার কাছ থেকে কেজি প্রতি ৫ টাকা লাভ ধরে ৫০ বস্তার দাম লাভে-আসলে ৭৫০০০ হাজার টাকা গুনে নিয়ে রওনা হলেন রংপুরের উদ্দেশে। তিনি হিসাব কষে দেখলেন এক ট্রিপে তার লাভ হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে খরচ গিয়েছে ট্রাক ভাড়া ১০ হাজার টাকা, রংপুর থেকে ঢাকার কাওরান বাজার আসতে আসতে রাস্তার থানা পুলিশ, পরিবহন ইউনিয়ন, মাস্তান-চাঁদাবাজ আর শ্রমিকদের মজুরি বাবদ চলে গেছে আরো ১০ হাজার টাকা। অর্থাৎ ২৫ হাজার টাকা লাভের মধ্যে তার নিট প্রফিট থাকছে মাত্র ৫ হাজার টাকা। এ হিসাব শুধু রংপুরের তরকারি বেপারী হাফিজ মিয়ার বেলায়ই নয়, গোটা দেশের আনাচে-কানাচে থেকে ঢাকায় আসা সব বেপারীর বেলাতেই প্রযোজ্য।
দৃশ্যপট তিনঃ ট্রাকগুলো আনলোড হবার পর কাওরান বাজার তরকারির আড়তগুলোর সামনে এখন রাজধানীর বিভিন্ন বাজার থেকে আসা খুচরো বেপারীদের ভীড়ভাট্টা। তারা পাইকারি দরে মাল কিনে ভ্যানে-রিকশায় করে চলে যাচ্ছে যার যার বাজার-মহল্লায়। কালু মিয়ার আড়ৎ থেকে খুচরো বেপারী নিউমার্কেটের সেলিম, রামপুরা বাজারের আমিনুল ২০ টাকা কেজিদরে ৫ বস্তা করে মাল কিনে ভ্যানে তুলে চলে গেল নিজ নিজ দোকান বা ফুটপাতে। নিউমার্কেটের সেলিম উচ্চবিত্তের এলাকার সুবাদে ওই ২০ টাকা দরে কেনা পটল, করলা, বেগুনের দাম হাঁকছে ৪০ বা ৪৫ টাকা। রামপুরা বাজার বা ফুতপাতের খুচরো বেপারী আমিনুল বিক্রি করছে ৩০ বা ৩৫ টাকা কেজি। তাদের পরিবহন খরচ পড়েছে ভ্যানভাড়া বাবদ মাত্র ২০০ বা ৩০০ টাকা। আর দোকানভাড়া বা চাঁদা দেওয়া বাবদ খরচ হয়েছে ওই পরিমাণ টাকা। অর্থাৎ মাত্র ১০০০০ টাকা পুঁজি খাটিয়ে প্রায় দুইগুণ লাভ গুণছে তারা।
কাওরান বাজারের আড়ৎদার কালু মিয়া পর্যন্ত পণ্যের দামে একটা নির্দিষ্ট অংক ছিল। নিউমার্কেটের সেলিম আর রামপুরার আমিনুলের হাতে পড়ার সাথে সাথে সেই কৃষিপণ্যের ঘটতে থাকে লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি। আর সে মূল্যবৃদ্ধির যাঁতাকলে পিষ্ট হতে থাকে রাজধানীর সীমিত আয়ের ভোক্তাসাধারণ। নিউমার্কেটের বা রামপুরার খুচরো দোকানদার স্বল্প পুঁজিতে অল্প মেহনতে এই যে দ্বিগুণ দামে জিনিস বিক্রি করছে এর জন্য কী কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে এ পর্যন্ত? এ চিত্র শুধু একদিনের নয়, সারা দেশে নিত্যদিনের , পুরো বছরের। চাল, ডাল, লবণ, তেল, মসলা ইত্যাদি অপচনশীল দ্রব্যের ক্রমমূল্য বৃদ্ধি রোধের যেমন কোনো উদ্যোগ নেই তেমনি নেই গ্রাম বা শহরের মধ্যে দ্রব্যমূল্যের বিস্তর ফারাক কমাবার কার্যকর বাস্তব পদক্ষেপ। মাঝেমধ্যে রাজধানীর বাজারগুলোয় মনিটরিং সেলের ঢিলেঢালা কার্যক্রম পরিদৃষ্ট হলেও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন চোখে পড়ে না সারা বছর।
উপরে যে চিত্র তুলে ধরা হলো তা কিন্তু একেবারেই সহজ সরল হিসাবের বাস্তব চিত্র। এখানে দেখা যাচ্ছে রংপুরের প্রান্তিক চাষি রহিমুদ্দিনরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তাদের উৎপাদিত যে শস্য বা পণ্য ১০ টাকা কেজিদরে বিক্রি করে উৎপাদন খরচও ওঠাতে পারেনি, এক রাতের ব্যবধানে ৭/৮ ঘন্টার পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকার কাওরান বাজার হয়ে সাধারণ ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে তার দাম পড়ছে প্রতি কেজি ৪০ টাকা। অর্থাৎ লাভের সিংহভাগটাই চলে যাচ্ছে মধ্য স্বত্বভোগীদের পকেটে। ওদিকে নিরন্তর বঞ্চিত হচ্ছে প্রান্তিক চাষিরা তাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে।
আগে রংপুর-দিনাজপুর তথা উত্তরাঞ্চলের লোকেদের ট্রেনে বা বাসে ঢাকায় আসতে সময় লাগতো ১৩/১৪ ঘন্টা। যমুনা ব্রিজের সুবাদে এখন সময় লাগে ৬/৭ ঘন্টা। এতে সময়ের যেমন সাশ্রয় ঘটেছে তেমনি নিত্যপ্রয়োজনীয় অর্থাৎ কৃষিপণ্যের বাজারও সম্প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু আমরা যখন দেখি গ্রামের হাটবাজারে যে পণ্য বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকা কেজিদরে সেই পণ্যই রাজধানীর কাঁচাবাজারে বিক্রি হচ্ছে ৩০ বা ৪০ টাকায় তখন যমুনা ব্রিজের উপযোগিতা থাকলো কোথায়? এ প্রশ্ন ওঠা কী অবান্তর? বাজারদরের এই উর্ধ্বগতি, এই অসংগতি, এই তারতম্য দেখে মনে হওয়াটা স্বাভাবিক যে , দেশের বাজার-ব্যবস্থাপনা সরকারের কোনো দপ্তরের হাতে নেই। তা নাহলে মূল্যবৃদ্ধির যুক্তিসংগত কোনো কারণ ছাড়াই তা বাড়বে কেন? আর বাড়লেও তা বন্ধ করার ব্যবস্থা নেই কেন? দেখে শুনে মনে হয় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য আর কারসাজি এমনই নিপুণ যে, নিত্যপণ্যের বাজারদর তাদের হাতের মুঠোয় বন্দি হয়ে আছে।
দৃশ্যত মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত অথবা সাধারণ ভোক্তাশ্রেণির নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নাভিশ্বাস উঠুক, দেয়ালে পিঠ ঠেকুক তাতে কারো কিছু যায়-আসে না। বাজারদর নিয়ে এই যে চারদিকে এত প্রতিবাদ আর ক্ষোভের আগুন, এটা সাধারণ মানুষের মধ্যে সীমাহীনভাবে ছড়িয়ে পড়তে কতক্ষণ? আমাদের জিজ্ঞাসা, এই মধ্যস্বত্বভোগীদের ধরবার, বলবার, শাস্তি দেবার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করার কেউ কী নেই? সত্যি, কী বিচিত্র এ দেশ সেলুকাস!
নূরুল ইসলাম বরিন্দী, email:- nibarindi@gmail.com
সম্পাদক ও প্রকাশক মো: শামীম আখতার | বার্তা বিভাগ- মেইল- m24newsdesk@gmail.com | @ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Copyright © 2026 M24News । Rangpur. All rights reserved.