
নূরুল ইসলাম বরিন্দী :
“সেভেন অ্যান্ড ওয়ান সেভেনটি ওয়ান। কামিং অফ এজ টুইনটি ওয়ান। ডাউনিং স্ট্রিট, নাম্বার টেন”--- গুরু গম্ভীর স্বরে কল দিয়ে চলেছেন কলার। একটার পর একটা। আটত্রিশ কলের মাথায় গিয়ে চৌদ্দটা নাম্বার কেটে ফেললেন আবুল হোসেন তালুকদার। আর মাত্র একটা কল অর্থাৎ একটা ঘর বাকি, ওয়ান শর্ট অফ দ্য টপ, অর্থাৎ এইটি নাইন।
তীব্র উত্তেজনায় ঘেমে-নেয়ে উঠছেন তালুকদার। দ্রুততালে ওঠানামা করছে শ্বাস-প্রশ্বাস। মাথার তালুটা গরম হয়ে ওঠে অসম্ভব উত্তাপে। চোখের সামনে জোনাকির আলোর মতো ঝিলমিল করে নাচতে থাকে এক লাখ টাকা উইথ বিশ ইঞ্চি কালার টিভি। মাত্র আটত্রিশ কলে বাম্পারের চান্স, ভাবা যায়? এমন লাকি চাল কদাচিৎ জোটে দু-একজনের ভাগ্যে। ঘোর লাগা লাটিমের মতো বন বন করে ঘুরতে থাকে তালুকদারের মাথা। খুশি আর উত্তেজনায় বোর্ডসহ শিটটা সশব্দে চেয়ারের ওপর রেখে তড়াক করে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। ধুক ধুক করছে হৃৎপিণ্ড। প্রচণ্ড শীতেও দরদর করে ঘাম ছুটছে তার সমস্ত শরীর বেয়ে। আশপাশের কয়েক জোড়া কৌতূহলী চোখের দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো তালুকদারের দিকে। দু-একজন ফিস ফিস করে জিজ্ঞেস করলো , “কী ভাই, চৌদ্দটা কেটে ফেলেছেন? কতো নাম্বার বাকি?”
কিন্তু তালুকদার নির্বাক পাথরের মূর্তির মতো নিশ্চল। এ মুহূর্তে তার কানে শুধু কলারের গলার আওয়াজ ছাড়া পৃথিবীর কোনো শব্দই প্রবেশ করছে না। প্রতিটি পল, অনুপল কাটছে সীমাহীন উত্তেজনায়। তীব্র উৎকণ্ঠায় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে তার।
ইতিমধ্যে আরো সাত-আটটা কল আউট হয়ে পৌঁছে গেছে হাফ অফ এ হাউজে অর্থাৎ পঁয়তাল্লিশে। সাধারণত পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চান্ন কলের ভেতরেই ‘ইয়েস’ হয়ে যায় হাউস। সে হিসেবে এখনো গোল্ডেন চান্স রয়ে গেছে তালুকদারের। কল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনাও বাড়ছে প্রবলভাবে। স্মরণে থাকা দোয়া-দরুদ্গুলো মনে মনে আউড়েছেন। কাজ হচ্ছে না দেখে এখন তালুকদারের মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে নানান খিস্তি-খেউড়, অশ্রাব্য গালিগালাজ। এভাবে কলার আর নিজের কপালের বাপান্ত করতে করতে তালুকদার যখন প্রচণ্ড আবেগে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে কাঁপছেন ঠিক তখনই পেছন থেকে ‘ইয়েস’ শব্দটা তীক্ষ্ণ তীরের ফলার মতো কানে এসে বিঁধলো তার!
পঞ্চাশকলের মাথায় ‘পার্কার পেন’ উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘ইয়েস’ বলে চিৎকার দিয়ে উঠেছে লোকটা। পুরো অডিয়েন্সের দৃষ্টি গিয়ে নিবদ্ধ হয় লোকটার দিকে। মৃদু গুঞ্জন, ফুসফাস, হৈ-হুল্লোড়, চিৎকারের মধ্যে কলারের চেকিং শেষ। একজন ভাগ্যবানই পেয়েছেন আজকের বাম্পার এক লাখ টাকা এবং সঙ্গে বিশ ইঞ্চি কালার টভি। প্রচণ্ড দুঃখে, ক্ষোভে হাতের পেশিগুলো টান টান হয়ে ওঠে তালুকদারের। হাতেধরা হাউজির নাম্বারিং শিটটা টুকরো টুকরো করে ছিড়ে ফেলেন তিনি । দপ দপ করে লাফাতে থাকে কপালের দুপাশের শিরাগুলো। নিদারুণ আক্রোশে মাথার চুলগুলো ছিড়ে ফেলতে ইচ্ছে হলো তার। কিন্তু তিনি কিছুই করতে পারলেন না। হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু অভিশাপ দিতে থাকলেন নিজের ভাগ্যকে।
সময় কতোক্ষণ কেটে গেছে মনে নেই, চারপাশের চেয়ারের দুড়দাড় শব্দে চমক ভাঙ্গে তালুকদারের। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখেন হাউজির প্যান্ডেল প্রায় শূন্য। বৈদ্যুতিক সুইচ গুলো অফ হয়ে যাচ্ছে একেক করে। আশপাশে কেউই নেই। সবাই চলে গেছে যার যার গন্তব্যে।
স্খলিত পদক্ষেপে ক্লাবের খোলা গেট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন আবুল হোসেন তালুকদার। অন্যদিনের মতো আজ আর রিকশায় উঠলেন না। ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকলেন ফুটপাত ধরে। অনুভব করতে লাগলেন ঠাণ্ডা শীত খোঁচা দিচ্ছে তার উন্মুক্ত হাতে পায়ে বুকে। উত্তেজনা কমে এসেছে অনেকটা। এখন শুধু হতাশা আর দুঃখবোধগুলো হুল ফোটাচ্ছে শরীর ভেদ করে বুকের অনেকদূর গভীরে। এতো হতাশা আক্রান্ত করতে পারতো না তাকে যদি শেষ সম্বল চার শ’ টাকা দিয়ে হাউজির পুরো শিটটা না কিনতেন। হাঁটতে হাঁটতেই পকেট হাতড়ে সিগারেট বের করলেন। চোখ তুলে তাকালেন সামনে ডি আইটির ঘড়ির দিকে। বিড় বিড় করে উচ্চারণ করলেন নিয়ন সাইনে উদ্ভাসিত লেখাগুলো—“হে আল্লাহ! প্রতিপালক, তুমি এই শহরকে রক্ষা করো”। দুঃখের ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে উঠলো তালুকদারের শুকনো ঠোঁটে। --“এই শহরের মতো আমাকেও তুমি বিপদমুক্ত করো প্রভু”—বিড় বিড় করে কথাগুলো উচ্চারণ করতে করতে এগোতে থাকলেন উত্তরে, স্টেডিয়ামের পুব গেট বরাবর। আটত্রিশ কলে চৌদ্দটা নাম্বার কাটার অর্থই হলো অবধারিত বাম্পার। কিন্তু দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কী! কজনের ভাগ্যে জোটে এমন বাম্পারের চান্স? অথচ সেই একান্ন কলে গিয়ে বাম্পার মারলো কিনা ফকিরাপুলের সেই কুট্টিটা—যে নাকি বছরে কম করে হলেও বাম্পার মারে চার পাঁচটা। শালা এরই নাম কপাল! মাথার মধ্যে থেকে হাউজির এ ভূতটা কিছুতেই নামছে না আজ, বুঝতে পারেন আবুল হোসেন তালুকদার। তিনি আনমনে হাঁটতে থাকেন রাজধানীর রাতের নির্জন ফুটপাত ধরে।
পরশু ইদ! আগামীকাল শেরপুরের গ্রামের বাড়িতে যাবার কথা তালুকদারের। আহা! কতো আশা নিয়েই না স্ত্রী,পুত্র,কন্যারা অপেক্ষা করছে তার জন্য! স্ত্রী হাজেরা খাতুন আর সন্তানদের কথা মনে হতেই একটা হিমশীতল অনুভূতি কুঁকড়ে মুষড়ে দিতে থাকে তালুকদারকে। ঝাপসা হতে থাকে দু-চোখের দৃষ্টি। বুকের ভেতর থেকে মোচড় দিয়ে ওপরে উঠতে থাকে বড়ো বড়ো দীর্ঘনিঃশ্বাস। আধ কপালের ব্যথাটা তীব্র হয়ে উঠতে থাকে ক্রমান্বয়ে। পরের অংশ দ্বিতীয় পর্বে.....
নূরুল ইসলাম বরিন্দী, Email: nibarindi@gmail.com
সম্পাদক ও প্রকাশক মো: শামীম আখতার | বার্তা বিভাগ- মেইল- m24newsdesk@gmail.com
Copyright © 2026 M24News । Rangpur. All rights reserved.