
নূরুল ইসলাম বরিন্দী:
(পূর্ব প্রকাশের পর)- এ ঘটনার পর থেকে ফারজানা আর রাশেদের মধ্যে দূরত্বটা বাড়তে থাকে ক্রমশ। স্মৃতি বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকে রাশেদ আগের মতো আর ফারজানাকে সংগ দিতে চায় না। ঠিক সময়ে অফিস থেকে ফেরে না। অফিস ট্যুরের নাম করে মাঝেমধ্যেই বাইরে রাত কাটায়। এমনকি সামান্য ছুতা-নাতায় ফারজানাকে মারধরও করতে থাকে। নিজের সন্তান পবন-পায়েলকেও সহ্য করতে পারে না। শুধু তাই নয়, শ্বশুর-শাশুড়িও নির্দ্বিধায় পক্ষ নেয় ছেলের।
অতঃপর ২০০৮ সালে স্মৃতিকে বিয়ে করে রাশেদ উঠে যায় ইস্কাটনের ভাড়া বাড়িতে। বাড়ির সবাই এ বিয়ে মেনে নেয়। ফারজানার প্রতি শারীরিক-মানসিক অত্যাচার, তার দুই সন্তানের প্রতি অনাদর, অবহেলা, লাঞ্ছনা-গঞ্জনা বাড়তেই থাকে দিনের পর দিন। যেদিন বাড়িতে সালিশ বসে ‘তার দ্বিতীয় বিয়েতে আপত্তি নেই’ এবং এক মাসের মধ্যে বাড়ি ছাড়তে হবে বলে নোটিস দেয়া হলো সেদিনই ফারজানা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় সে আত্মহত্যা করে সকল লাঞ্ছনা-গঞ্জনার ইতি টানবে।
অবশ্য এর আগেও কয়েকবার সে আত্মহননের পথ বেছে নেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রাণপ্রিয় দুটি সন্তানের কথা ভেবে নিরস্ত থেকেছে। দু-একবার ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে হাসপাতালেও যেতে হয়েছে তাকে। চিকিৎসাশেষে প্রাণে বেঁচে ফিরে এসেছে। ফারজানা জানে তার সন্তান দুটি সবকিছুই বোঝে, অনুভব করতে পারে তাদের এবং মায়ের প্রতি এ বাড়ির সবার অবহেলা, অনাদর। দাদা, দাদি, বাবা, ফুপু সবার আদর সোহাগ থেকে বঞ্চিত অন্তর কুরে কুরে খায় ওদের। এসব কথা ভেবে ফারজানা মনে মনে ঠিক করে এবারে পবন-পায়েলকে জানাবে তার সিদ্ধান্তের কথা। এবং তার সাথে ওরাও এই পথ বেছে নেবে কি-না। কারণ মা বেঁচে না থাকলে ওদের বেঁচে থেকে কী লাভ!
ফারজানা আড়চোখে বাচ্চাদের দিকে চেয়ে দেখে। ওরা দুজন জাজিমের ওপর নিশ্চুপ বসে আছে। মাঝে মাঝে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের দিকে উদাস দৃষ্টি মেলে তাকাচ্ছে। ফারজানা যখন ওর বাচ্চাদের এই বলে প্রস্তাব দিয়েছিল যে, “আমি এ পৃথিবী ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে যাবো সেই দেশে যেখান থেকে আর কেউ কোনোদিন ফিরে আসে না। তোমরা কী সে দেশে আমার সাথে যাবার জন্য প্রস্তুত আছো?” তখন ওরা দুজন একবাক্যে রাজী হয়ে যায় মায়ের প্রস্তাবে।
ফারজানার মনে পড়ে একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় বাচ্চারা আবদার করেছিল রেস্টুরেন্টে চায়নিজ খাবে। তাদের সেই শেষ ইচ্ছেটাও পূরণ করেছে দুদিন আগে। এরপর নিরবে, নিঃশব্দে চলে তিনটি আদম সন্তানের স্বেচ্ছা-মৃত্যু-প্রস্তুতি। ঘরের মেঝেতে, দেয়ালে, স্কুলের খাতার কাগজে পবন-পায়েল তাদের কাঁপা কাঁপা হাতে লিখে যায়--“আমাদের মৃত্যুর জন্য বাবা রাশেদ কবীর, স্মৃতি, দাদু-দাদি, ফুপা-ফুপি—সবাই দায়ী। ” ফারজানাও একটা চিরকূটে তাদের তিনজনের আত্মহননের কারণগুলো সবিস্তারে লিখে রাখে যেন তাদের এই করুণ মর্মান্তিক মৃত্যুর অন্তর্নিহিত আসল কারণ জানতে পারে পৃথিবীর জীবন্ত মানুষেরা। শুধু চিরকূটেই নয়, গত বিশ বছরের বিবাহিত জীবনের খুঁটিনাটি সমস্ত ঘটনা লিপিবদ্ধ করে রেখেছে ফারজানা।
রাতের আয়ু ক্রমশ বেড়ে চলছে। ঘুমিয়ে পড়েছে সারা ঢাকা শহরের মানুষ। শুধু ঘুম নেই তিনটি আদম সন্তানের চোখে। পবন-পায়েল অপেক্ষা করছে মা কখন ওদের ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দেন। সেই অপেক্ষায় ওরা প্রহর গুনছে। এখন পুরো জুরাইন এলাকায় সুনসান নিরবতা! অস্থির হয়ে ওঠে ফারজানা! তার বিশ্বস্ত ড্রাইভার আমিনকে দেয়া হয়েছে ওষুধ আনার দায়িত্ব। ড্রাইভারকে ফারজানা খোলাখুলি বলেছে তারা আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে। একশোটা ঘুমের ট্যাবলেট এনে দিতে হবে। ওষুধ খাওয়ার পর মৃত্যু নিশ্চিত করে সে যেন ঘর থেকে বের হয়ে যায়। বিনিময়ে ড্রাইভার পাবে তার পাজেরো গাড়িটি।
ফারজানা দেয়াল ঘড়ির দিকে চোখ ফেরায়। রাত একটা বেজে সাত মিনিট। ঠিক এ সময়ে দরজা খোলার মৃদু শব্দ কানে আসে। এসে গেছে ড্রাইভার আমিন। তার হাতে ওষুধের প্যাকেট। কম্পিত হাতে ওষুধের প্যাকেটটা নেয় ফারজানা। তারপর টেবিলে রাখা জগটা হাতে নিয়ে তাতে একশোটা ট্যাবলেট গুলিয়ে তিনটি গ্লাসে ঢেলে নেয় সেগুলো। ঢালা শেষ হয়ে গেলে সে করুণ চোখে তাকায় মেঝেতে বসে থাকা পবন-পায়েলের দিকে। হাহাকার করে ওঠে বুঝিবা বুকের খাঁচাটা! মাতৃস্নেহের চিরন্তন আবেগ যেন উথলে ওঠে হুহু করে! কম্পিত পায়ে দুহাতে দুটো গ্লাস ধরে জাজিমের ওপর বসে থাকা দুই সন্তানের হাতে তুলে দেয় মা ফারজানা দুটি বিষের পেয়ালা! জিরো পাওয়ার বাল্বের স্বল্প আলোয় ভালো করে কেউ কারো মুখ দেখতে পাচ্ছে না ওরা। দুটি ভাই-বোন মায়ের মাথা নাড়ার ইশারায় ঢক ঢক করে এক নিশ্বাসে খেয়ে ফেলে গ্লাসের সমস্ত পানি! এরপর ওরা সটান শুয়ে পড়ে জাজিমের ওপর। আর এক মুহূর্ত দেরী না করে ফারজানা নিজের গ্লাসের সবগুলো পানি এক নিশ্বাসে গিলে ফেলে শুয়ে পড়ে দু’সন্তানের পাশে। কয়েক মিনিট মাত্র। তারপর সেই উচ্চমাত্রার বেঞ্জোডায়াজিপেনের প্রভাবে নিঃশব্দে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে মা ও তার দুটি নিষ্পাপ সন্তান!
ড্রাইভার আমিন পূর্ব পরিকল্পনা মাফিক তিনজনের গায়ে আলতোভাবে কাঁথা বিছিয়ে দিয়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
পরদিন। ২০১০ সালের ১১ জুন। সকালের সংবাদপত্র ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে সারাদেশের মানুষ জানতে পারলো ঢাকার জুরাইনের আলমবাগের ২২৯ নম্বর বাড়ি “সোনার তরী”র তিনতলার একটি কক্ষের মেঝের জাজিমে একটি কাঁথা দিয়ে ঢাকা একইসাথে মা এবং তার দুটি সন্তানের আত্মহননকৃত নিথর মৃতদেহ পড়ে থাকার খবর!
(এ ঘটনা নিয়ে “আত্মহত্যার প্ররোচনা” নামে ঢাকার একটি আদালতে মামলা হয়েছিল। সে মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে কি-না জানিনা। রায় ঘোষণা যাই হোক, দুটি মাসুম বাচ্চা ও তাদের মায়ের করুণ ও মর্মন্তুদ এই মৃত্যুর জন্য দায়ী কে? মিলবে কী এ প্রশ্নের সঠিক জবাব?)
নূরুল ইসলাম বরিন্দী, Email: nibarindi@gmail.com
সম্পাদক ও প্রকাশক মো: শামীম আখতার | বার্তা বিভাগ- মেইল- m24newsdesk@gmail.com | @ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Copyright © 2026 M24News । Rangpur. All rights reserved.