
নূরুল ইসলাম বরিন্দী :
আগে আগে হাঁটছে মোহরালি। পেছনে জুলেখা। মাত্র হাততিনেকের ব্যবধান। নিঃশব্দে হাঁটছে ওরা। নিবিড় বন-জঙ্গল পেছনে ফেলে এসেছে অনেকক্ষণ। এদিকটায় জঙ্গল কিছুটা পাতলা। মাটির ঢিবি আর ছোট ছোট ঝোপঝাড় রাস্তার দুপাশে। আর একটু এগুতেই পথ আগলে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা ভরা বর্ষার টইটুম্বুর চৌদ্দভুবনের বিল দৃষ্টির সামনে পড়লো ওদের। এদিক-ওদিক দু-একখন্ড কালো মেঘ ছাড়া ঝকঝকে আকাশ। চাঁদের আলো মোমের মতো গলে গলে পড়ছে বিলের স্বচ্ছ পানিতে। এই মধ্যরাতে দুজন নারী-পুরুষের ভীতিময় অস্তিত্বের চারপাশে এখন বিশাল চরাচরব্যাপী অখন্ড নিস্তব্ধতা। জনহীন প্রান্তরে দুধসাদা জ্যোৎস্নার লুটোপুটি খেলার অবাক দর্শক ওরা মাত্র দুজন। লোকালয় এখনও বেশ দূরে। প্রায় মাইল দুয়েকের পথ পাড়ি দিতে হবে। চৌদ্দভুবন পার হলে পড়বে মহিষবাথানের নিধুয়া পাথার। সেই পাথার পার হলে মির্জাপুর। তারপর চেতনাগঞ্জ, ওদের শেষ গন্তব্য স্থল।
মোহরালি হাঁটছে নিঃশব্দে। অস্তিত্বহীনের মতো। হাঁটছে আর মাঝেমধ্যে ঘাড় কাত করে পেছন ফিরে দেখছে জুলেখাকে। পরিষ্কার দৃষ্টিগোচর হয় না, আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে চাঁদের আলো জুলেখার পিঠের ওপর পিছলে পিছলে পড়ছে। মুখের দিকটা ছায়ান্ধকার। তবে মোহরালি অনুভব করতে পারছে জুলেখার মনের ভীতি-বিহবলতা
এখনও কাটিয়ে ওঠেনি , যেমনটি ছিলো গভীর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে আসার সময়। সেই আগের মতোই মোহরালির নিকট-দূরত্ব বজায় রেখে স্খলিত পায়ে হাঁটছে জুলেখা।
প্রায় তিন মাইল নিবিড় জঙ্গলে গা ছমছম করা ভূতুড়ে ভয়ের ভেতর দিয়ে আসার সময় জুলেখার ভেতর শরীর হিমকরা ভয় লক্ষ্য করেছিলো মোহরালি। দুপাশে বন-জঙ্গলের মধ্যে বন্যজন্তুর দুর্বোধ্য আওয়াজ কানে আসতেই মোহরালির দেহের সঙ্গে একেবারে সেঁটে গিয়েছিলো জুলেখার দেহ। খুব ঘনিষ্ঠভাবে, এতো ঘনিষ্ঠ যে, ওর গরম শ্বাস-প্রশ্বাস মুখে চোখে এসে পড়ছিলো মোহরালির। থরথর করে কাঁপছিলো জুলেখা। মোহরালির ডান হাতের কব্জি সজোরে চেপে ধরে বলে উঠেছে, “মোর যে ভীষণ ভয় নাগোচে মোহরালি ভাই”।
[quads id=1]
জুলেখাকে অভয় দিয়ে নিজের শুকনো ঠোঁট জোড়া জিবের আগা দিয়ে ভিজিয়ে নিয়ে মোহরালি বলেছে, “অ্যালা ভয়ের কিচু নাই। দুদিয়ার কাটালত (বন) আগের মতো আর বাঘ ভাল্লুক নাই এখন”। মুখে বলেছে ঠিকই ভয়-ডরের কিছু নেই। কিন্তু ভয় যে মোহরালির নিজের বুকের ভেতরের হৃৎপিন্ডের গতি ক্রমশ বাড়িয়ে দিচ্ছে তা জুলেখাকে বোঝাবে কীভাবে? সাপ-খোপ, জন্তু-জানোয়ারকে ডরায় না মোহরালি। বন উজাড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ তল্লাট থেকে বাঘ-ভালুকও পালিয়ে গেছে অনেক আগেই। তবে মোহরালির ভয় অন্য জায়গায়, অন্য কারণে। তা হলো জব্বার পরামানিকের বিবাহিতা সোমত্ত মেয়ে জুলেখাকে নিয়ে।
আব্দুল জব্বার পরামানিকের প্রথম স্ত্রীর একমাত্র মেয়ে জুলেখা। ছোটবেলা মা-হারা মেয়েটা দুই সৎমায়ের বিষদৃষ্টির সামনে থেকে আড়াল হয়েছিলো দু’বছর আগে। পদাগঞ্জের মিয়াবাড়ির সর্বকনিষ্ঠ ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে পরামানিক দুই বউয়ের আপদ তাড়িয়েছিলেন বাড়ি থেকে। পদাগঞ্জের মিয়াদের আগে নামডাক ছিলো। এখন কোনো- রকম খুঁড়িয়ে চলা অবস্থা। পোড়া কপাল মা-মরা মেয়েটার । শান্তি হয়নি। স্বামীটা লম্পট, দুশ্চরিত্র। নক্সাল না কী যেন একটা সন্ত্রাসী দলের সদস্য। থানায় কেস আছে সন্ত্রাস আর ডাকাতির।
বিয়ের পর আর কোনোদিন বাপের বাড়ির দিকে পা মাড়ায়নি জুলেখা। পরামানিক দু’চারবার লোক পাঠিয়েছিলেন মেয়েকে নেয়ার জন্য। ফিরিয়ে দিয়েছে। মেয়ের বাপ সশরীরে হাজির না হলে নাকি বউকে পাঠাবেন না মিয়ারা। পরামানিকের আরো দুই বউয়ের ডজনখানিক কাচ্চা-বাচ্চা। ওদের দেখভাল করতেই দিন রাতের সময় হাওয়ায় ভর দিয়ে উড়ে যায়। মেয়ে-জামাইয়ের খোঁজ-খবর নেবার তার ফুরসৎ কোথায়?
তবু মা-মরা মেয়েটার জন্য মাঝেমধ্যে মনটা আনচান করে ওঠে পরামানিকের। আপন বলতে একমাত্র বাপ ছাড়া আর কেইবা আছে মেয়েটার? লোকমুখে মাঝেমাঝে নানান খবর আসে মেয়ের শ্বশুরবাড়ি থেকে। শাশুড়ির গঞ্জনা, জামাইয়ের শারীরিকভাবে নির্যাতন-আত্যাচার। পরামানিক শোনেন। মুখ বুজে থাকেন। যাই যাই করেও যাওয়া হয়ে ওঠে না তার। একদিন খবর আসে ফেরারি নক্সাল জামাইটা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে এখন কয়েদখানায় বসে লাল ভাত খাচ্ছে। মেয়ে জুলেখার জন্য সত্যি সত্যি ব্যাকুল হয়ে ওঠেন পরামানিক। কল্পনায় জুলেখার মুখের অবয়বে আবিষ্কার করেন মৃত বউয়ের
মুখ। উথাল-পাথাল বুকের ভেতর চিন চিন করে ওঠে পিতৃস্নেহ। আর তারই জের হিসেবে আজ দুপুর বেলা মোহরালিকে পাঠিয়ে দেন পদাগঞ্জে মেয়েটার খোঁজ-খবর জানতে।
বিকেল নাগাদ পদাগঞ্জের মিয়াবাড়িতে পৌঁছে যায় মোহরালি। ওকে দেখেই জুলেখার সে কী হুহু কান্না! হোক সে চাকর-বাকর। তবু তো বাপেরবাড়ির লোক। কোলে-পিঠেও
করেছে ছোটবেলায়। জুলেখার কান্না দেখে নিজের চোখের পানিও চেপে রাখতে পারেনি মোহরালি। মাথা নিচু করে চোখ মুছেছে লুঙ্গির খোঁট দিয়ে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতও গভীর হয়েছে। এর আগে মোহরালি বারকয়েক মিয়াবাড়িতে এসেছে। কিন্তু কোনোবারই রাত কাটাতে হয়নি। জুলেখাকে বাপের বাড়ির খবর দিয়েছে। আবার জুলেখার খবর নিয়ে চলে গেছে নিজ গ্রামে, পরামানিকের বাড়িতে। আজও যে মোহরালি রাতে থাকার জন্য এখানে আসেনি তা জুলেখা ভালো করেই জানে।
রাতে ফেরার সময় মনিব জব্বার পরামানিকের প্রস্তাবটা পেশ করেছিলো মোহরালি জুলেখার জাঁহাবাজ শাশুড়ির কাছে এভাবে—“আম্মাজান, পরামানিক চাচায় কইছিলো জুলেখাকে কয়দিনের জন্য বাপের বাড়ি নাইওর নিবার। তোমরা যদি হুকুম দেন তাইলে”—শুনে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছেন শাশুড়ি—“বৌওক হামরা পাটাইবার কে? কার হুকুম নিয়া তাঁয় যাইবে বাপের বাড়ি? স্বামীর হুকুম ছাড়া যদি যাবার পারে যাউক। হামরা আটকেবার কে?”
জবাব শুনে একেবারে চুপসে গেছে মোহরালি। কান্নারত জুলেখাকে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেনি বিদায় নেবার সময়। অভাগী মেয়েটার জন্য তার মতো চাকর শ্রেণীর লোকের করার মতো কি-ইবা আছে আর। আব্দুল জব্বার পরামানিক পদাগঞ্জের মিয়াবাড়িতে মা-মরা মেয়েটাকে গছিয়ে দিয়ে যে ভুল করেছেন সে ভুল শোধরাবার কী সাধ্য বা অধিকার আছে মোহরালির মতো হা-ভাতে মানুষের। অতঃপর মাথা নিচু করে সে বেরিয়ে এসেছে মিয়াবাড়ির আঙ্গিনা ছেড়ে। গ্রামের শেষ মাথায় এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে হয়েছে মোহরালিকে। পেছনে কার যেন পায়ের অস্ফুট আওয়াজ শুনতে পায় সে। অন্ধকারে পেছনে এসে দাঁড়ায় ছায়ামূর্তি। মোহরালি আলী চিনতে পারে ছায়ামূর্তিটি আর কেউ নয়, জুলেখা। ঢিপ ঢিপ করে ওঠে বুকটা মোহরালির। কাঁপা গলায় ফিস ফিস করে শুধায় “ কামটা কী উচিত হইলো বইন। কাইল সকালে যখন সবাঁয় জানবার পাইবে মিয়াবাড়ির বউ মোহরালি বাউরার (পাগলের) হাত ধরি তার সাথে শ্বশুর বাড়ি থাকি পালায়া গেইচে তখন কেমন করি মুখ দেকামো হামরা?”
“তোমরা আর মোক বাধা দেন না মোহরালি ভাই। ওই বাড়িটা মুই জনমের মতো ছাড়ি আনু আইজ। তোমরা যদি সাথে করি না নিয়া যান, তাইলে কাইল বিয়ানবেলা মোর মরা মুখ দেকপে তামান গেরামের মানুষ! ” বলে গুমরে গুমরে কেঁদে উঠেছে জুলেখা।
মোহরালি কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। তার স্থির বিশ্বাস জন্মে এ মেয়ে মুখে যা বলবে কাজেও তা-ই করবে। অজানা এক আশংকায় বুকটা কেঁপে ওঠে মোহরালির। শেষমেশ চূড়ান্ত একটা সিদ্ধান্ত নিতেই হয় তাকে। মুখে কিছু না বলে হাত ইশারায় জুলেখাকে আসতে বলেছে তার পেছন পেছন।
ভাগ্য সুপ্রসন্নই ছিলো ওদের। লোকালয় ছাড়ার পর দুধিয়ার কাঠালের (জঙ্গলের) কাছাকাছি আসতেই চাঁদ উঁকি দেয়া শুরু করেছে পুবের আকাশে। কিছুটা আস্বস্ত হয় মোহরালি। এমন গহিন অরণ্যে সাপ-খোপ, জন্তু-জানোয়ারের ভয়-ডর আছে ঠিকই, কিন্তু মিয়াবাড়ির গ্রামের মানুষদের আর ভয় নেই। এখন তারা সবার নাগালের বাইরে। ধরা পড়ে যাবে সে আশংকাটা নেই বললেই চলে। জীবনে বোধকরি এই প্রথমবারের মতো কঠিন এক সমস্যার মুখোমুখি হয় মোহরালি। সংসার- ধর্ম নেই, নেই কোনো
ঝুটঝামেলাও। চাল-চুলোহীন মানুষের যখন যেদিক ইচ্ছে চলে যাওয়া যায়—এই রকম একজন হাবাগোবা পাগলা কিছিম মানুষের মধ্যে একজন ভয়ানক দুর্দান্ত সাহসী মানুষের আত্মা ভর না করলে এই রাত-বিরাতে এক বিবাহিতা মেয়ে মানুষকে অন্ধকারের সঙ্গী করতে পারে কেউ? এই মুহূর্তে নিজেই নিজের সাহস দেখে মনে মনে তাজ্জব হয়ে যায় মোহরালি।
বয়স কতো হবে মোহরালির? পঁয়তাল্লিশ কিংবা পঞ্চাশ? কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের মগডাল। সেটা পার হলেই প্রৌঢ়ত্ব। জীবনের এতগুলো বছর। শীত, বসন্ত, শরৎ, হেমন্ত। ঋতু বদলের কতো পালাই তো পার করে এসেছে মোহরালি। কিন্তু নিজের এই নিঃসঙ্গ
একাকী জীবনের পালা-বদল ঘটেনি কোনোদিন। দশ গ্রামের দশ বাড়িতে দড়ি পাকানো, ফুটফরমাশ খাটা, বিনিময়ে দুবেলা দুমুঠো পেট পুরে খাবার। রাত হলে আব্দুল জব্বার পরামানিকের খানকাঘরের এককোণায় কুকুরের মতো কুন্ডলি পাকিয়ে শুয়ে ঘুমানো। এই তো মোহরালি পাগলার সারা জীবনের রোজনামচা।
মোহরালির বাপ-দাদার জমি-জিরাত ছিলো মন্দ না। খু-উ-ব ছোটবেলায় , মোহরালির এখনো স্পষ্ট মনে আছে, গোয়ালে দুধেল গাই ছিলো বাপের। গোলার ধান বিক্রি করেই চলতো সারা বছর। কামলা খাটতো লোকেরা ওদের বাড়িতে। দাদা মারা যাওয়ার পর মোহরালির বাপ রজবালি বছর সাতেকের মধ্যেই পৈতৃক জমিজিরাত সব বিক্রি করে বসে বসে খেয়ে শেষ করেন। অবশিষ্ট বাড়িভিটাটুকুও যখন আব্দুল জব্বার পরামানিকের ভোগদখলে চলে যায় তখন রজবালির অন্তিম কাল। তার মৃত্যুর পর কাফনের কাপড়টুকুরও ব্যবস্থা করতে হয় জব্বার পরামানিককে। গ্রামের লোক, এমনকি মোহরালিও জানে যে তার বাপের খাসির কলিজার মতো সাত/আট বিঘা ধানী জমি পানির দরে কিনে নিয়ে জব্বার পরামানিক আজ গ্রামের একজন সবচেয়ে সম্পন্ন গেরস্থ।
সেই সুবাদে অবশ্য পরামানিকের বাড়িতে আশ্রয়টুকু জুটেছে মোহরালির। ওর আবার ওই এক স্বভাব, উড়নচন্ডি। এক জায়গায় থাকা, এক জায়গায় খাওয়া-দাওয়া ওর পোষায় না। দশ বাড়িতে কাজ করে, দশ বাড়িতে না খেলে পেটের ভাত নাকি হজম হয় না। সময় সময় নিজেই এ কথা বলে বেড়ায় সে। আর তাই পরামানিকও অন্য চাকরবাকরদের মতো ওকে স্থায়ীভাবে রাখার চেষ্টা করেননি।
একবার গ্রামের লোকেরা পরামানিককে ধরে মোহরালির বিয়ের ব্যবস্থাও পাকা করে ফেলেছিলো। একটা মেয়ে মানুষ জীবনসঙ্গী হলে হয়তোবা পাগলটার উড়নচন্ডি স্বভাব কিছুটা হলেও পাল্টাবে। আড়ালে-আবডালে যখন এ রকম জল্পনা-কল্পনা চলছিলো তখন কার কাছে যেন জানতে পেরে একরাতে মোহরালি গ্রাম থেকে হাওয়া। দীর্ঘ দুই-তিনটি বছর ওর টিকিটিরও সন্ধান কেউ পায়নি। দিনাজপুরের রাণীশংকইল উপজেলায় দুইটি বছর আত্মগোপনে কাটিয়ে আবার নিজের গ্রামে, পরামানিকের সেই খানকাঘরে আশ্রয় নেয় মোহরালি। সেই থেকে গ্রামের দুর্মুখ লোকেরা প্রচার করে বেড়ায়—মোহরালি পুরুষত্বহীন, নপুংসক ইত্যাদি।
লোকেরা কে কী ভাবে ভাবুক । কে কী বলে বলুক। মোহরালির তাতে কিছু যায় আসে না। ওর একটাই সান্ত্বনা, তা হলো দশ গ্রামের লোক ওকে ভালোবাসে, বিশ্বাস করে। কী ছেলে কী বুড়ো আর কী নারী-পুরুষ। এ কারণে সব বাড়ির ভেতর-বাইর এমনকি রান্নাঘর পর্যন্ত ওর অবাধ গতায়াত। কোনোদিন কোনো মেয়ে মানুষের দিকে মুখ তুলেও তাকায়নি, কারো কোনো অন্যায় করেনি, কাউকে কোনোরকম দুঃখ-আঘাতও দেয়নি। এ রকম একজন অজাতশত্রু মানুষ মোহরালি কোনো কোনো সময় ওর সারা জীবনের দিন-রাতের পাপ-পুণ্যের হিসেব করেছে, মনের বাটখারা দিয়ে মাপজোখ করেছে। তাতে ওর ভাগে পুণ্যের পাল্লাটাই ভারী বলে মনে হয়েছে মোহরালির কাছে।
বিশ্বাসই বড় কথা, বিশ্বাসই জান্নাত-জাহান্নাম। বিশ্বাসই আল্লাহ-রাসুল। তা না হলে এই ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতে স্বামীর ঘর ছেড়ে জুলেখার মতো সুন্দরী যুবতী মেয়ে মানুষ তার সঙ্গে বেরিয়ে আসবে কোন সাহসে? “ না হয় মুই বাউরা-পাগলা মানুষ। কিন্তুক রক্ত-মাংস দিয়া গড়া একজন মানুষ তো। মোর কী কোনো চাওয়া-পাওয়া নাই, মোর কী শরীর-মনের কোনো চাহিদা থাকব্যার পারে না?”—এসব ভাবনা ভাবতে ভাবতে , এতো ভয়ের ভেতর দিয়ে রাস্তা পাড়ি দিতে দিতেও অদ্ভূত হাসি পায় মোহরালির। নিজের ভেতর অসীম শক্তিধর এক মহামানবের অবয়ব আবিষ্কার করে বুকটা ফুটবলের ব্লাডারের মতো ফুলে-ফেঁপে ওঠে মোহরালির। সে নিজের মনে বিড় বিড় করে বলতে থাকে—“সাক্ষী থাকো আল্লা-মাবুদ, সাক্ষী থাকো আকাশের চাঁদ-সুরুজ। আয় আল্লাহ! তোমার কাছে কারো মনের পাপ লুকায়া থাকে না। আর কেউ তা লুকায়া থুবারো পারে না।”---
দুধিয়ার জঙ্গল ছেড়ে কাঠের পুলটা পার হয়ে চৌদ্দভুবনের বিলের মাঝামাঝি এসে পড়েছে ওরা। জুলেখার চলার গতি মন্থর। হাঁটতে বোধকরি খুব কষ্ট হচ্ছে মেয়েটার। জঙ্গলের জন্তু-জানোয়ারের ভয় নেই আর। কিন্তু তারচেয়েও অনেক ভীতিপ্রদ জায়গাটায় এসে পড়েছে ওরা। জুলেখা জানে না। মোহরালি ভালো করে জানে। আর সে কারণেই বুকের ধুকপুকানিটা আগের চেয়ে বেড়ে গেছে মোহরালির। জুলেখা টের পাচ্ছে না। মোহরালি টের পাচ্ছে। সেই ভয়টা কীসের?
চৌদ্দভুবনের বিলের পাড়ের এই জায়গাটার বহু অঘটনের খবর জানা আছে মোহরালির। এ জায়গাটা যে দুর্ধর্ষ ডাকাতদের আখড়া, আশপাশের দশ গ্রামের লোক তা ভালো করেই জানে। এমন কোনো মাস নেই যে মাসে বিলের কচুরিপানার ভেতর থেকে মানুষের লাশ পাওয়া না গেছে। সন্ধ্যার পর পারতপক্ষে এ রাস্তা দিয়ে চলাচল করে না কেউ। আর সেই জায়গাটায় , রাতের শেষ প্রহরে এসে পড়েছে মোহরালি। তাও আবার সঙ্গে এক সুন্দরী যুবতী মেয়ে মানুষ! রাস্তার পাশে চাঁদের আলো আবডাল করে দাঁড়িয়ে আছে শ্যাওড়া গাছটা। দুপাশে বিলের জলে থকথকে জ্যোৎস্না। নিঃশব্দে, ছায়ান্ধকার শ্যাওড়া গাছটার নিচে এসে দাঁড়ায় ওরা। ভ্যাপসা গরমে ঘামে ভিজে জবজব করছে মোহরালির সারা শরীর। বাতাস নেই সামান্য। গাছের পাতাগুলো স্থির, নড়ছে না মোটেও।
[quads id=2]
হঠাৎ এ সময় গাছের ওপর থেকে ঝুপ ঝুপ করে লাফিয়ে পড়লো ছয়টি ছায়ামূর্তি। শরীরের সমস্ত রোমকূপ খাড়া হয়ে গেলো মোহরালির। মুহূর্তের মধ্যে টর্চের তীব্র আলো একবার মোহরালি আরেকবার জুলেখার মুখের ওপর পড়তে লাগলো সমানে।-- “কী মজা! কী মজা! এমন সুন্দর চেংড়ি মাইয়া মানুষ তোমরা কোনটে থাকি আননেন বাহে”---তিড়িংবিড়িং করে লাফাতে লাফাতা বলে ওঠে একজন। হাউমাউ শব্দে কেঁদে ওঠে মোহরালি। সে কোনোরকমে উচ্চারণ করে --“ দোহাই বাবারা। তোমরা হামার ধর্মের বাপ! ওই মাইয়াটা মোর মালিকের বেটি। তোমরা মোকে খুন করি ফ্যালান, আপত্তি নাই। কিন্তুক উয়ার গাওত হাত দেন না। তোমরা মোর---” মোহরালির কথা শেষ হয় না, “চোপ শালা। আর একটা কতা কইবি তো তোর পাছার মধ্যে আঝোড়া বাঁশ ঢুকায়া দিমো।” --পাশ থেকে ধমক দিয়ে ওঠে আরেকজন। এরপর মোহরালিকে দুপাশ থেকে চেপে ধরে দুজন লোক। চিৎ করে শুইয়ে দেয় ধুলোর ওপর। গলার ঠিক টুঁটির কাছে ছুরির ফলাটা ছোঁয়ায় একজন। দ্বিতীয়জন তার ডান পাটা রাখে মোহরালির তলপেটে। তারপর চাপ দিতে থাকে আস্তে আস্তে। মোহরালির গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোয় না আর। নিয়তির কাছে একজন পরাভূত মানুষের মতো নিজের প্রিয় প্রাণের আশা ছেড়ে দিতে দিতেও এদিক-ওদিক তাকায় সে। দেখতে পায় আততায়ী ছয়জনের মধ্যে চারজন জুলেখার মুখে কাপড় চাপা দিয়ে চ্যাংদোলা করে নিয়ে যাচ্ছে রাস্তার ওপাশে, সবুজ ঘাসের বিছানায়। ধীরে ধীরে দুচোখ বুজে আসে মোহরালির ক্ষোভে, দুঃখে, হতাশায়!
অনেকক্ষণ পর একটু জ্ঞান ফিরে আসে মোহরালির। পায়ে ভর দিয়ে কোনোরকমে টলতে টলতে উঠে দাঁড়ায় সে। কতোক্ষণ এভাবে অচেতন হয়ে পড়েছিলো মনে করতে পারে না মোহরালি। ছয়জন যমদূতের ছায়া ছায়া শরীর আর জুলেখার কথা মনে পড়ে যায় তার। আধো অন্ধকারে, এদিক-ওদিক চোখ ফেরাতেই দেখতে পায় অদূরে ঘাসের ওপর নিঃসাড়ে পড়ে থাকা জুলেখাকে।
ঠিক এ সময়ে কড় কড় ঘড় ঘড় শব্দে আকাশ ভেঙ্গে অঝোরে বৃষ্টি নামে। ডুকরে কেঁদে ওঠে মোহরালি। তার হুহু কান্নার আওয়াজ আর দুচোখের অবিরল ধারা একাকার হয়ে যায় সেই হঠাৎ নেমে আসা বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে। চরাচরব্যাপী নেমে আসে একটা সকরুণ শোকের ছায়া !
তখন পুবাকাশে সূর্যের আলো উঁকি দিচ্ছে। চৌদ্দভুবন বিলের নিথর পানিতে চিক চিক করছে উদীয়মান সূর্যের আলো। কাছের মির্জাপুর গ্রাম থেকে প্রথম যে লোকটা অকুস্থলে আসে সে দেখতে পায় দৃশ্যটাঃ শ্যাওড়া গাছের গায়ে হেলান দিয়ে নির্বাক বসে আছে চেতনাগঞ্জের পাগলা মোহরালি। আর তার ঠিক সামনেই পড়ে আছে নিথর, নিস্পন্দ একটি নগ্ন-প্রায় নারীদেহ!
নূরুল ইসলাম বরিন্দী, email:nibarindi@gmail.com
সম্পাদক ও প্রকাশক মো: শামীম আখতার | বার্তা বিভাগ- মেইল- m24newsdesk@gmail.com | @ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Copyright © 2026 M24News । Rangpur. All rights reserved.