
নূরুল ইসলাম বরিন্দী:
সাড়ে পাঁচ বছরের ছোট্ট ফুটফুটে শিশু সামিউল। ঢাকার মোহাম্মদপুরের গ্রীন উডস স্কুলের নার্সারি শ্রেণীর ছাত্র। বাবা-মায়ের একমাত্র আদরের সন্তান। আর কয়েকদিন পরই সামিউলের ছয়তম জন্মদিন পালিত হওয়ার কথা মহাসাড়ম্বরে। এবারে সামিউল তার জন্মদিন উপলক্ষে বাবার কাছে আব্দার করেছিল গিফট হিসেবে তাকে যেন নীল রংয়ের একটা সাইকেল কিনে দেয়া হয়। বাবা আজম একমাত্র আদরের ছেলেকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এবারে নীল রংয়ের একটা সাইকেল উপহার দেবেন ছেলের জন্মদিনে। এ কথা বলার পর তিনি তার মনের চোখ দিয়ে দেখতে থাকেন-----ছেলে তার সেই নীল রংয়ের সাইকেলে চড়ে প্রজাপতির মতো সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে, তিনি তার পিছু পিছু হাঁটছেন, কখনো দৌড়াচ্ছেন, আবার কখনোবা আনন্দের আতিসহ্যে শিশুর মতো হাসছেন!
সেই ফুটফুটে সামিউলের বস্তাবন্দি লাশ পাওয়া গেল মোহাম্মদপুরের নবোদয় হাউজিং-এর এ ব্লকের ৮ নম্বর সড়কের ৭ নম্বর বাড়ির সামনে থেকে। সে নিখোঁজ হয়েছিল ঘটনার দুদিন আগে, ২০১০ সালের ২২ জুন সন্ধ্যার পরে। পুলিশ শিশু সামিউলকে খুন করার সন্দেহে তার মা এবং তার কথিত প্রেমিক শামসুজ্জামান আরিফকে আটক করে আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে নেয়। আরিফ এবং নিহত সামিউলের মা আদালতে যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় তা রীতিমত লোমহর্ষক, যেকোনো পাষাণ-হৃদয় মানুষের চোখে জল না এসে পারে না। অবশ্য শিশু সামিউলের মা এবং তার প্রেমিকপ্রবর আরিফের জবানবন্দির মধ্যে বিস্তর ফারাক লক্ষ্য করা গেছে। দেশের সাধারণ মানুষ এই লোমহর্ষক ঘটনার কথা পরে বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পেরে হতবাক হয়ে যায়। একজন মায়ের পরকীয়া প্রেমের বলি হতে পারে কী করে একটি সাড়ে পাঁচ বছরের শিশু ভাবতেও অবাক হতে হয়।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মা আয়েশা হোমায়রা এবং তার প্রেমিক শামসুজ্জামান আরিফের জবানবন্দি যাচাই-বাছাই করে যতটুকু সত্য বেরিয়ে এসেছে তা সাজানো হলো এভাবেঃ
২০০৩ সালে কে, আর, আজমের সাথে বিয়ে হয় আয়েশা হোমায়রার। স্বামী ব্যবসায়ী, মোটামুটি অবস্থাসম্পন্ন। বিয়ের পর ৩/৪ টি বছর তাদের দাম্পত্যজীবন বেশ সুখে এবং নির্বিবাদেই কাটে। ২০০৬ সালের শেষদিকে মোহাম্মদপুরের আদাবর এলাকায় বাসা ভাড়া নেন স্বামী আজম। এখানে নবোদয় হাউজিং-এর ৬ নম্বর রোদে শ্রাবস্তি নামক এক বিউটি পার্লারে আসা-যাওয়ার সুবাদে পরিচয় হয় পার্লারের মালিক সাথীর সাথে আয়েশা হোমায়রার। সাথীর সাথে সখ্যতার সুবাদে তার স্বামী শামসুজ্জামান আরিফের সাথেও পরিচয় ঘটে আয়েশার। আর এই পরিচয়ের সূত্র ধরেই একদিন কী করে যে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে প্রথমে টেরই পায় না আয়েশা। তিন বছর ধরে অবাধ মেলামেশার ফলে ধীরে ধীরে দৈহিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে দুজনের মধ্যে। আয়েশার স্বামী ব্যবসাসূত্রে সকাল সাতটার দিকে বেরিয়ে যান কর্মস্থল নরসিংদীতে। বাসায় ফেরেন সেই রাত দশ-এগারোটার দিকে। আরিফ আয়েশাদের বাসায়ও আসতো। আয়েশাকে সাথে নিয়ে মাঝেমধ্যে বাইরেও বেড়াতে যেত। আয়েশার স্বামী আজম আরিফকে জানতো তাদের পরিবারের একজন শুভাকাংক্ষী হিসেবে। আয়েশা-আরিফের সম্পর্ক যে এতদূর গড়াবে তা ভাবতেও পারেন নি কোনোদিন। আর শিশু সামিউলের কাছে তো আরিফ প্রিয় ‘আরিফ কাকু’ হিসেবে গণ্য।
আরিফের প্রতি আয়েশার অনুরাগ, ভালোবাসা যতই প্রগাঢ় হতে থাকে, ততই স্বামী আজমের অস্তিত্ব-সান্নিধ্য সহ্যের সীমা অতিক্রম করতে থাকে আয়েশার মনের মধ্যে। এমনকি রাতের শয্যাসঙ্গিনী না হয়ে পৃথক বিছানায় , পৃথক ঘরে শোয়ার ব্যবস্থা করে আয়েশা নানা ছলনা দিয়ে। ব্যবসা-পাগল স্বামী সহজ, সরলচিত্তে মেনে নেন স্ত্রীর এই কূটনৈতিক অজুহাত। আর এই সুযোগে কোনো কোনো রাতে আরিফকে ডেকে এনে নিজ শয্যাসঙ্গী করতো আয়েশা। আজম টেরই পেত না। শিশু সামিউল অবশ্য মায়ের সঙ্গেই শুতো। সে গভীর ঘুমে ঢলে পড়লে মা আয়েশার চলতো পরকীয়া প্রমের লীলাখেলা।
এভাবে দুই নারী-পুরুষের অবৈধ অভিসার চলতে থাকে সবার অগোচরে। এরপর আয়েশা সিদ্ধান্ত নেয় একদিন পালিয়ে যাবে আজমের ঘর-সংসার ছেড়ে। আয়েশা আস্তে আস্তে ঘরের দামি দামি মালপত্র, সোনাদানা সরাতে থাকে প্রেমিক আরিফের প্ররোচনায়। আরিফও সমানে ইন্ধন যোগাতে থাকে আয়েশার এসব কাজে। আজম একদিন টের পান স্ত্রীর এসব কায়-কারবার সম্পর্কে। তিনি লোকজন ডেকে সালিশী বসান। সালিশীতে মীমাংসা হয় আরিফ আর এ বাসায় উঠতে পারবে না, আয়েশাও কোনোদিন তার সাথে মিশতে পারবে না।
প্রায় বছর দুই-তিন এভাবে চলার পর আবার গোপনে গোপনে যোগাযোগ ঘটে দুজনের মধ্যে। ইলেক্ট্রিশিয়ানের পরিচয়ে গেটের বাধা অতিক্রম করে আসতে তেমন অসুবিধা হতো না আরিফের। আজম ঘুণাক্ষরেও টের পান না আরিফ তার ফ্লাটে কখন আসে, কখন যায়। আর অবুঝ শিশু সামিউল তো বুঝতে পারে না কিছুই। আরিফ আগের মতোই তার কাছে ‘আরিফ কাকু’, আদর-সোহাগের অফুরন্ত ভান্ডার। (বাকি অংশ অন্যদিন)
নূরুল ইসলাম বরিন্দী, E-mail: nibarindi@gmail.com
সম্পাদক ও প্রকাশক মো: শামীম আখতার | বার্তা বিভাগ- মেইল- m24newsdesk@gmail.com
Copyright © 2026 M24News । Rangpur. All rights reserved.