
স্টাফ রিপোর্টার:
রংপুরের মিঠাপুকুর সমাজ সেবা কার্যলয়ে পদে পদে হয়রানীর শিকার হচ্ছেন উপকারভোগীরা। কয়েকজন চিহ্নিত দালাল উৎকোচের বিনিময়ে নিম্ন ধরনের প্রতিবন্ধিদের কার্ড করে দিচ্ছেন। প্রকৃত ব্যক্তিরা একাধীকবার ঘুরেও কার্ড পাচ্ছে না।
উপজেলা সমাজ সেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থ বছরে প্রায় ৬শত আবেদন করেছিল প্রতিবন্ধী কার্ডের জন্য। চিকিৎসা সনদসহ সকল কার্যক্রম সম্পাদন করা থাকলেও দালালদের মাধ্যমে আবেদন করায় সকল প্রতিবন্ধি ব্যক্তির কার্ড বাতিল করা হয়েছে। নতুন নিয়মানুযায়ী পুনরায় প্রতি মাসের শেষ বুধবার চিকিৎসা সনদ প্রদান করবেন। সেটি সমাজসেবা কার্যালয়ে জমা দিয়ে কার্ড নিতে হবে। এরপরই মিলবে প্রতিবন্ধী কার্ড।
ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের অভিযোগ, সমাজসেবা কার্যালয়ে কয়েকজন চিহ্নিত দালাল রয়েছে। তারা প্রকৃত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে উৎকোচের বিনিময়ে নিম্ন ধরনের প্রতিবন্ধিদের কার্ড করে দিয়েছেন। প্রকৃত ব্যক্তিরা বছর খানের ধরে একাধীকবার ঘুরেও কার্ড পাচ্ছে না। তেমনি একজন কাঁঠালী গ্রামের মৃত মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী রুপালী বেগম। তিনি ২০২২ সালের জানুয়ারী মাসে প্রতিবন্ধী কার্ডের জন্য আবেদন করেছিলেন। চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল তাকে কার্ড দেওয়ার কথা। কয়েকবার সমাজসেবা কার্যালয়ে ঘুরেও কার্ড পাননি। পরে তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়- তার কার্ডটি বাতিল হয়েছে। পুনরায় সকল কার্যক্রম সম্পন্ন করে তাকে কার্ড নিতে হবে। রুপালী বেগম বলেন, ‘ঠিকমত চলব্যার পারোনা। মুই গরীব মানুষ, খায়া না খায়া থাকো। কার্ড করব্যার যায়া ম্যালা ট্যাকা নষ্ট হলো। ফির নাকি সোগগুল্যা কাম করব্যার নাগবে।’
এদিকে, গতকাল বুধবার উপজেলা সদরের সীমান্তবর্তী বাতাসান ময়েনপুর গ্রাম হতে প্রতিবন্ধী কার্ডের চিকিৎসা সনদের জন্য ভোরে রওনা দেন ছল্লুমা খাতুন (৬৫)। প্রায় প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ শেষে তিনি মিঠাপুকুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছান। কিন্তু সনদ প্রদানকারী ওই চিকিৎসক নেই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। তিনি প্রশিক্ষণের জন্য ঢাকায় আছেন। শুধু ছল্লুমা বেগমই নয়- তাঁর মত সহস্রাধীক প্রতিবন্ধী নারী-পুরুষ হয়রানীর শিকার হচ্ছেন সমাজসেবা কার্যালয়ে প্রতিবন্ধি কার্ড করতে এসে।
নতুন নিয়মানুযায়ী প্রতি মাসের শেষ বুধবার মিঠাপুকুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক আবেদিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পরীক্ষা করে সনদ প্রদান করবেন মিঠাপুকুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. এমএ হালিম লাবলু। সেই অনুযায়ী গতকাল বুধবার সকাল হতেই দুর-দুরান্ত হতে প্রায় দু’শ ব্যক্তি এসেছিলেন মিঠাপুকুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। কিন্তু, তারা কেউ চিকিৎসকের দেখা পাননি। তিনি প্রশিক্ষণের জন্য ঢাকায় অবস্থান করছেন।
সরেজমিনে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, শতাধীক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সমাজসেবা কার্যালয়ে সামনে দাড়িয়ে আছেন। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক না পেয়ে জানতে এসেছেন আমরা এখন কি করব? কিন্তু সমাজসেবা কার্যালয়ের কেউ তাদের সাথে কথা বলছেননা। কয়েকজন প্রতিবন্ধী সমাজসেবা কর্মকর্তা শরিফুল ইসলামের সাথে কথা বললেও তিনি অসৌজন্য মুলক আচরণ করছেন। ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে কথা বলতে চাচ্ছেন না। তেমনি একজন ২০ কিলোমিটার দুর হতে আসা ভাংনী ইউনিয়নের তোফায়েল আহমেদ।
তিনি বলেন, ‘হামরা গরীব মানুষ। ৫’শ ট্যাকা ভ্যান ভাড়া করি আসছো। ডাক্তার নাই, কেউ কিছুই কওছেনা।’ আরেক ভুক্তভোগী লতিবপুর ইউনিয়নের আমেনা বেগম বলেন, ‘প্রতিবন্ধী বাচ্ছাকে নিয়ে সেই সকালে না খেয়ে এসেছি। ডাক্তার নাই, কেউ কোন কথাও বলছেনা।’ একই অবস্থা লতিবপুর ইউনিয়নের সেকেন্দার আলী, খলিল হোসেন, পায়রাবন্দ ইউনিয়নের হারুন্নুজ্জামান, দূর্গাপুর ইউনিয়নের বুলবুলি বেগমে মত প্রায় দু’শ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির।
কার্ড করতে আসা একাধীক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, সমাজসেবা কর্মকর্তা বরাবরেই আমাদের হয়রানী করছেন। অফিস আসলে সরকারী লোকজন ঠিকমত কথা বলেন না। কিন্তু, দালালদের সাথে তারা ঠিকই কথা বলেন, কাজ করে দেন। আমরা অসহায়-দুঃস্থ্য মানুষ। কার কাছে বিচার দেব।
মিঠাপুকুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. এমএ হালিম লাবলু বলেন, ‘আমি প্রশিক্ষণের জন্য ঢাকায় আছি। বিষয়টি আমি সমাজসেবা কর্মকর্তাকে অবগত করতে একাধীকবার মোবাইল ফোনে কল করেছিলাম। কিন্তু, তিনি ধরেননি। পরে ওই কার্যালয়ে আরেক কর্মকর্তাকে জানিয়েছি। তারা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের না জানালে, আমি কি করতে পারি।’
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতি মাসের শেষ বুধবার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসা সনদ প্রদান করার কথা। কিন্তু, চিকিৎসক প্রশিক্ষণে ঢাকায় অবস্থান করছেন। আমাকে তিনি জানাননি।’ একাধীকবার ঘুরেও প্রতিবন্ধী কার্ড হচ্ছেনা, সমাজসেবা কার্যালয়ে হয়রানী করা হচ্ছে-এমন প্রশ্নের জবাব না দিয়ে সমাজসেবা কর্মকর্তা কার্যালয় ত্যাগ করেন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফাতেমাতুজ জোহরা বলেন, ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের হয়রানী করা হলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
এম২৪নিউজ/আখতার