
মোঃ মাহবুবউল ফেরদৌস (রতন):
”বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধ্যেক তার করিয়াছে নারী অর্ধ্যেক তার নর”।
শুধু সৃষ্টিতে নয় টেকসই উন্নয়নে নারীর ভূমিকা সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ন এ কারনে যে, আমরা এমডিজি অর্জন করেছি এখন এসডিজি বাস্তবায়ন করছি। কিন্তু এই এসডিজিতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রবৃদ্ধির সঙ্গে ন্যায্যতা এবং সমতার ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হলেই টেকসই উন্ন্য়ন সম্ভব। অনুন্নত বা উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে পরিবারের আয় বর্ধনে নারীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করছে।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাএার শুরুর দিকে শ্রম বাজারে নারীর অংশগ্রহন অনেক কম ছিল। কারণ নারীরা শুধু গৃহস্থালী কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল। সে সময় পর্দা প্রথা ও ধর্মীয় গোড়ামি প্রচন্ড শক্তিশালী ছিল। বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে নারীর অংশগ্রহনের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে ফলে ঘরের বাইরে গ্রামীণ নারীর পদচারনা শুরু হয়। যেহেতু পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও বিভিন্ন ক্ষেএে অবদান রাখছে আর সে জন্য সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভাবে নারীর ক্ষমতার প্রয়োজন তথা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা ইত্যাদি সব বিষয়ে নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা জরুরী।
বাংলাদেশের সংবিধানে তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে ”রাষ্ট্র ও গনজীবন সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন”। ২৮(২) সংবিধানে দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে বলা হয়েছে ”জাতীয় জীবনে সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহন নিশ্চিত করিবার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে” এবং ২৯(৩) অনুচ্ছেদে আরও বলা আছে ,”কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ,নারী-পুরুষ ভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মেও নিয়োগ বা পদ লাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেইক্ষেত্রে তাহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না”।
বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার নারীর সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ খসড়া ঘোষনা করেছে। এতে কি কি বিষয় রয়েছে সেগুলো আমরা অনেকেই জানি না, এতে ৩টি ভাগ ও ৪৯টি উপভাগ রয়েছে। মূল বিষয় গুলো হচেছ: জাতীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে নারী পুরুষের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা। নারীকে শিক্ষিত ও দক্ষ মানব সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা। নারী সমাজকে দারিদ্রের অভিশাপ থেকে মুক্তকরা। সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিমন্ডলে নারীর অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান করা। নারী ও মেয়ে শিশুর প্রতি সকল নির্যাতন দূর করা। নারী ও মেয়ে শিশুর প্রতি সকল বৈষম্য দূর করা। রাজনীতি, প্রশাসন, আর্থসামাজিক কর্মকান্ডে, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া এবং পারিবারিক জীবনের সর্বত্র নারী পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করা। নারীর স্বার্থের অনুকুলে প্রযুক্তি উদ্ভাবন আমদানী করা এবং নারীর স্বার্থ বিরোধী প্রযুক্তির ব্যবহার নিষিদ্ধ করা। নারীর সুস্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহন করা। নারীর জন্য উপযুক্ত আশ্রয় এবং গৃহায়ন ব্যবস্থায় নারীর অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা। প্রাকৃতিক দূর্যোগ ও সশস্ত্র সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত নারীর পুর্নবাসনের ব্যবস্থা করা। গণমাধ্যমে নারী ও মেয়ে শিশুর ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরাসহ জেন্ডার প্রেক্ষিত প্রতিফলন করা। নারী উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সহায়ক সেবা প্রদান করা।
নারীরা কৃষি উৎপাদনের অন্যতম প্রধান ও অপরিহার্য ব্যক্তি এক গবেষণায় দেখা গেছে বিশ্বব্যাপী ৬৬ শতাংশ নারী কৃষি কাজের সাথে সম্পৃক্ত। অপর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে বাংলাদেশের ৮৮ শতাংশ গ্রামীণ নারী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে কৃষি কাজে জড়িত (বারকাত- ড: আবুল এইচডি আরসি:২০০২) বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া তথ্যানুযায়ী কৃষি অর্থনীতিতে গ্রামীণ নারীর অবদান ৬৪.৮৪ শতাংশ এবং পুরুষের অবদান ৫২.৮ শতাংশ সত্তেও ভূমির মালিকানা বা বাজার ব্যবস্থাপনায় নারীর প্রবেশাধিকার নেই বললেই চলে।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪৯.৪ শতাংশ নারী, অথচ ভূমির গ্রামীণনারীর মালিকানা মাএ ২.৪ শতাংশ এবং বাকি ৯৬ শতাংশ জমির ব্যক্তি মালিকানা রয়েছে পুরুষের নামে। একদিকে লিঙ্গবৈষম্য এবং পুরুষ তান্ত্রিকতার সামগ্রিক আবহের কারনে কৃষি সংক্রান্ত প্রযুক্তিগত তথ্য, কৃষি সম্প্রসারণ সেবা, সার,বীজ,সেচের পানি, বাজার ব্যবস্থা ইত্যাদি সুবিধা থেকে যেমন নারী বঞ্চিত হচ্ছে অন্য দিকে নারী কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি না থাকার কারণে কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত নারীরা প্রয়োজনীয় ব্যাংক লোন পাচ্ছে না। খাস জমি বিতরনে নীতিমালা অনুযায়ী অগ্রাধিকার তালিকায় নারীর যৌথ মালিকানায় কথা বলা হয়েছে। সেখানে বিধবা নারীদের ক্ষেএে সক্ষম পুএ সন্তানসহ আবেদন করার জন্য বলা হয়েছে। কিন্তু ভূমিহীন নারীদের একক নামে সরকারী খাস জমি বরাদ্ধ দেওয়ার জন্য সরকারের এই নীতিমালায় কোথাও কিছু বলা হয়নি। আলোর পিছনে যেমন অন্ধকার থাকে তেমনি উন্নয়নের ক্রমবর্ধমান এই ধারার সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে তা হচ্ছে নারী।
১৯৭০-৮০ এর দশকে বাংলাদেশের খুব কম নারীই বাড়ীর বাইরে গিয়ে কৃষি কাজে অংশগ্রহন করতেন। তবে ৯০ এর দশকের শুরু থেকেই নারীরা জমি প্রস্তুত, ধান রোপন, ধান কাটা থেকে শুরু করে সকল কাজই করে। পাশাপাশি বাড়ীর গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগী পালনে কাজ কর্মের সঙ্গে নারীরা জড়িত। নারীর এ অংশগ্রহন শতকরা ৪৫ থেকে ৮৫ ভাগ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য মতে ২০১০ সালে কৃষি কাজে নিয়োজিত ছিলেন ২ কোটি ৫৬ লাখ শ্রমিক। এর মধ্যে নারীই প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ। এক দশক আগে তা ছিল মাএ ৩৫ লাখ। অর্থাৎ ১০ বছরের ব্যবধানে কৃষি কাজে যুক্ত হয়েছেন প্রায় ৭০ লাখ নারী।
শ্রীমঙ্গল মৌলভীবাজার জেলায় ছোট বড় ৯২ টি চা বাগান রয়েছে। এসব বাগানে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক কাজ করেন তার মধ্যে নারী শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ২৬ হাজার এখনো দক্ষিন পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোয় কৃষিতে নারীর অংশগ্রহন তুলনামূলক ভাবে কম। তবে অগ্রগতি হয়েছে, উত্তর বঙ্গের বেশ কয়েকটি জেলায় বিশেষ করে কুড়িগ্রাম, রংপুর,দিনাজপুর, পঞ্চগড়,নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও ও লালমনিরহাট জেলায়।
জানা গেছে বৈশাখ ও অগ্রহায়ণ মাসে আমন ও বোর ধান কর্তন শুরু হলে এতে ৭০ শতাংশ নারী কৃষকের ব্যস্ততায় জড়িয়ে পড়ে। বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক ২০০৯-২০১২ সাল পর্যন্ত পরিচালিত এক গবেষণা বলছে, বর্তমানে কৃষিতে নারীর অংশগ্রহন ১৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে। আর গ্রামীণ নারীর ৭১ শতাংশই এখন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিকাজে নিয়োজিত।
ব্র্যাকের অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে, তুলনামূলক নিম্নমজুরি এবং পুরুষদের পেশা পরিবর্তন কৃষি কাজে নারীদের যুক্ত হতে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। এছাড়াও সরকারী ও বেসরকারী খাতের উদ্যেগ কৃষিকাজে নারীদের এগিয়ে আসার সুযোগ করে দিচ্ছে [সূত্র: দৈনিক সংবাদ, ১৮/০১/১৫]। কৃষি ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের যৌথ অংশগ্রহনে বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূতা অর্জন করেছে।
শিক্ষা, মেধা-মননে নিজকে যোগ্য করে পুরুষের পাশাপাশি এগিয়ে চলছে আজকের নারীরা। দেশপ্রধান, বিরোধীদলের নেত্রী, সংসদ সদস্য, স্পিকার, বিচারক, সামরিক ও বেসামরিক অফিসার, সাংবাদিক, উদ্যোক্তা, কোথায় নাই তারা? সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘরের কাজ শেষ করেই সংসারের সফলতার জন্য তাকে ছুটতে হয় কর্মক্ষেত্রে কিন্তু সেখানেও মেলে না ন্যায্য মজুরি ও ন্যায্য মূল্যায়ন এবং কোথাও কোথাও হতে হয় নির্মম নির্যাতনের শিকার।
সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গুলোতে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। অভিযোগ দেয়ার ব্যাবস্থা ও তা নিষ্পত্তির জন্য সুষ্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে কিন্তু অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের গবেষণায় দেখা গেছে ৮৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ওই কমিটির ব্যাপারে অবগত নন। জীবনের প্রয়োজনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও বাড়েনি তাদের ক্ষমতায়ন। এতো দৃঢ়তা আর এত মনোবল সত্ত্বেও কোথায় যেন তাল কেটে যাচ্ছে, সঠিক সুরে বাজছে না।
বিশ্ব আজ অনুধাবন করতে পেরেছে নারীর উন্নয়ন-উন্নতি ছাড়া জাতি বা বিশ্ব উন্নয়ন সম্ভব নয় তাই এসডিজিতে নারীর সম্পিক্ততার কথা বলা হয়েছে। সমাজের একটি বিশেষ অংশকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের জনগণও আজ বুঝতে শিখেছে দেশের উন্নয়নের জন্য অর্ধ্যকে জনগোষ্ঠি নারীর অবস্থার উন্নয়ন অত্যাবশ্যকীয়।
মোঃ মাহবুবউল ফেরদৌস (রতন), বিআইজিডি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।
তথ্যসূত্র: বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এর ওয়েবসাইট, ভূমিবার্তা,কৃষি কথা ও বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা