১৫ আগস্ট ইতিহাসের রাজনৈতিক হত্যাকান্ড

মোঃ ইদ্রিস আলী মন্ডল:

৯৭৫ সালে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই শেখ ফজলুল করিম (সেলিম) ও শেখ ফজলুল করিম (মারুফ) প্রথম দিল্লী আসেন। তাদের বাসায় আনার জন্য ডা. এম. এ. ওয়াজেদ নয়াদিল্লী রেলওয়ে স্টেশনে যান। তথন তারা ছিলেন সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও মানসিকভাবে বিপযস্ত। শেখ সেলিম প্রায় মাস দেড়েক ডাঃ ওয়াজেদের বাসায় ছিলেন। দিল্লী থেকে পুনরায় কলকাতায় ফিরে যান। পক্ষান্তরে শেখ মারুফ অসুস্থতার কারণে ২ মাসের অধিক কাল ডা. এম এ ওয়াজেদের বাসায় ছিলেন। ডা. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়া শেখ হাসিনা, শেখ রেহেনা, জয় ও পুতুল ভারত সরকারের রাজনৈতিক আশ্রয়ে দিল্লীতে বসবাস করতেন।

শেখ মারুফ, বিশেষত শেষ সেলিমের কাছ থেতে জানতে পারা যায় ১৫ আগস্ট (১৯৭৫)- এর সংঘটিত ঘটনাবলি সম্বন্ধে অনেক তথ্য। রাষ্টপতি বঙ্গবন্ধুর পূর্বানুমোদিত কর্মসূচি অনুসারে ১৪ আগস্ট (১৯৭৫) রাতে ঢাকা ক্যান্টমেন্টস্থ আর্মড কোরের প্রায় ৪০০ জন সৈন্যের একটি সামরিক মহড়া-কাম-প্রশিক্ষণের জন্য জয়দেবপুরের দিকে গিয়েছিল। এই দলের নেতৃত্বে ছিল লে. কর্নেল ফারুক। লে. কর্নেল রশিদ এবং আটজন মেজরও এই দলটিতে অন্তভূক্ত ছিলে। তাদের প্রদান করা হয়েছিলে সীমিত অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ। সঙ্গে তিনটি ট্যাংক নেওয়ারও অনুমতি প্রদান করা হয়েছিলে এই দলটিকে। কিন্তু ঐ ট্যাকগুলোয় কোন গোলাবারুদ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। জয়দেবপুরে মহড়া ও প্রশিক্ষণ শেষে এ দলটি (তৎকালীন) কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে এসে সমবেত হয় রাত সাড়ে তিনটার দিকে। তখন লে. কর্নেল ফারুক সমবেত সৈন্যদের উদ্দেশ্যে একটি ভাষণ দেন। উক্ত ভাষণে লে. কর্নেল ফারুক বঙ্গবন্ধু সরকারের তীব্র সমালোচনা করে উপস্থিত সৈন্যদলকে ঐ রাতেই বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সম্মত করায়। কিন্তু তখন সৈন্যদের বলা হয়নি যে, বঙ্গবন্ধু বা তাঁর পরিবারবর্গের কোন সদস্য কিংবা আত্মীয় স্বজনকে হত্যা করা হবে। ঐ সময়ের মেজর (অব.) শরিফুল হক ডালিম সামরিক পোশাকে সজ্জিত অবস্থায় সেখানে উপস্থিত হয় এবং তাদের দলে যোগদান করে।

উল্লেখ্য যে, মেজর (অব.) ডালিম  বঙ্গবন্ধুর পরিবারের কতিপয় সদস্যের সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে মেলামেশা করতো। তার শাশুড়ি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘোর সমর্থক এং তিনি ঘন ঘন বঙ্গবন্ধুর বাসায় এসে শেখ রেহানার বিছানায় শুয়ে থাকতেন। মেজর (অব.) ডালিমের স্ত্রী নিম্মি ছিল শেখ রেহানার স্কুলের সহপাঠিনী এই সুবাদে শেখ সাহেবের বাসায় নিম্মী থাকত। এই পরিবেশে শেখ কামালোর কুদৃষ্টি পড়ে মেজর ডালিমের সুন্দরী স্ত্রী নিম্মীর উপরে। জোরপূর্বক ধর্ষন ছিলো নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। বিচার প্রাপ্তি হয়েও কোন কাজ হয়নি। উপরোন্ত শেখ সাহেবের উক্তি ছিলে এসব ভুলে যা, যা হবার তা হয়ে গেছে। মেজর ডালিমের গড়ে উঠেছিলে জিঘাংসা। তার মা বেঁচে ছিলেন না এই দুঃখ প্রকাশ করে মেজর (অব.) ডালিম শেখ সাহেবের স্ত্রীকে মা বলে সম্মোধন করত। মেজর ডালিম  শেখ সাহেবে এই অজুহাতে সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ম-শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও অন্যান্য অপরাধে দোষী সাবাস্থ করে মেজর ডালিমকে সেনাবাহিনী থেকে অবসর প্রদানে বাধ্য করা হয়েছিল।

যা হোক, সে রাতে আর্মড কোরের ঐ ক্ষুদ্র দলটিকে পাঁচটি উপদলে বিভক্ত করা হয়। ২০-২৫ জনের একটি গ্রুপকে একজন মেজরের নেতৃত্বে পাঠানো হয় বঙ্গবন্ধু ছোট বোনের জামাই ও মন্ত্রিপরিষদের সদস্য আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের মিন্টো রোড়স্থ বাসায়। ১৫-২০ জনের অপর একটি গ্রুপকে অপর একজন মেজরের নেতৃত্বে পাঠানো হয় শেখ ফজলুল হক মণির ধানমন্ডির ১৩/১ (পুরাতন) রোড়স্থ বাসায়। ৩০-৪০ জনের তৃতীয় গ্রুপটিকে মেজর (অব.) ডালিমের নেতৃত্বে প্রেরণ করা হয় শাহবাগস্থ ঢাকা বেতার ভবনে। একটি ট্যাংক চালিয়ে কর্নেল ফারুক নিজে প্রায় ১০০ জন সৈন্যকে সঙ্গে নিয়ে তেজগাঁও বিমানবন্দর ও কুর্মিটোলা বিমানবন্দর এলাকার বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে অবস্থান নির্ধাণে ব্যাপৃত হয়। অবশিষ্ট ১০০-১২৫ জনের পঞ্চম গ্রুপটি দু’জন মেজরের নেতৃত্বে পাঠানো হয় বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ঘেরাও করার জন্য। ১৫-২০ জনের একটি বিশেষ টাস্কফোর্সকে হাবিলদার মোসলেহ উদ্দিনের নেতৃত্বে আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, শেখ ফজলুল হক মণি ও বঙ্গবন্ধুর বাসায় বিশেষ কাজের জন্য গোপনে ব্রিফ করে পাঠানো হয়।

১৫ আগস্ট ভোর রাত সাড়ে চারটার মধ্যেই উপরে উল্লেখিত গ্রুপ তিনটি যথাক্রমে আব্দুর রব সেনিয়াবত, শেখ ফজলুল হক মণি ও বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ঘেরাও করে সেখানে বিভিন্ন কৌশলগত জায়গায় অবস্থান নেয়। ভোর পাঁচটার দিকে আব্দুর রব সেরনিয়াতের বাসায় চারদিক থেকে গুলিবর্ষণ করা হয়। অতঃপর একজন মেজর, একজন নায়ক ও কিছুসংখ্যক সৈন্যসহ উক্ত বাসার ভেতরে প্রবেশ করে আব্দুর রব সেরনিয়াবাতেকর জ্যেষ্ঠ পুত্র আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ্ তখন উপর তালার একটি স্টোররুমে লুকিয়েছিল। মেজরের চক্রের লোকেরা তাঁকেও ধরার জন্য ঐ বাড়ির সমস্ত কক্ষ তন্ন তন্ন করে খুঁজেছিল। এর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে দু’জন সৈন্য স্টেগান হাতে টলতে টলতে উক্ত ড্রইংরুমের দরজার কাছে এসেই সেখানে জড়োকৃত সবার ওপর ব্রাশফায়ার করে চলে যায়। আব্দুর রব সেরনিয়াবাদের পরিবার বেঁচে যাওয়া সদস্যরা জানান যে, ঐ সময় উক্ত দু’জন সৈন্যকে নেশাগ্রস্ত দেখাচ্ছিল। প্রায় একই সময়ে দু’জন সৈন্য শেখ ফজলুল হক মণির বাসার উপতলার উঠে শেখ মণি ও তাঁর পাশে দাড়ানো তাঁ অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে স্টেনগানে পরপর দু’দফায় ব্রাশফায়ার করে।

১৫ আগস্ট ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে বঙ্গবন্ধুর বাসা চতুর্দিক থেকে ঘেরাও করে আক্রমণ করা হয়। প্রায় মিনিট বিশেক গোলাগুলির পর দু’জন পুলিশের সদস্য তাদের বাধা দিলে তারা ঐ তিন ব্যক্তিকে গুলিতে মারাত্মক ভাবে আহত করে। স্টেনগানের ব্রাশফায়ারের আওয়াজ ও আহত পুলিশের আর্তচিৎকার শুনে শেখ কামাল নিচের অভ্যর্থনা কক্ষে গিয়ে পৌঁছামাত্রই তারা তাকেও ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে। অতঃপর ঐ দু’জন মেজর কয়েকজন সশস্ত্র সৈন্যকে সঙ্গে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসার দোতলায় ওঠে।

প্রথমে তারা বঙ্গবন্ধুকে পদত্যাগ করার প্রস্তাব করে। এর জবাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলেন, “যে দেশের সেনাবাহিনীর সদস্যরা দেশের ও সেনাবাহিনীর আইন-শৃঙ্খলা ও সংবিধান লংঘন করে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির বাসায় আক্রমণ করতে পারে. আমি তার রাষ্ট্রপতি থাকতে চাই না। তবে তোমাদের মতো অধস্তন কর্মকর্তাদের নিকট আমি পদত্যাগপত্র পেশ করতে পারি না। অতএব সেনাবাহিনাীর চীফ ও ডেপুটি চীফদের এখানে নিয়ে এলে আমি তাঁদের নিকট আমার ইস্তফা প্রদান করবো।’’

এরপর ঐ দু’জন মেজর বঙ্গবন্ধুকে বলেন যে, সেক্ষেত্রে তাঁকে ঢাকাবেতার কেন্দ্রে গিয়ে বেতারে তাঁর পদত্যাগ ঘোষণা করতে হবে। একটু ইতঃস্তত করে তখন বঙ্গবন্ধু তাদের বলেন যে, তিনি বেতার কেন্দ্রে যেতে সম্মত রয়েছেন কিন্তু শেখ কামালকে তাঁর সঙ্গে যেতে দিতে হবে। অতঃপর ঐ দুই মেজর বঙ্গবন্ধুকে ঘেরাও করে উপরতলার প্রধান প্রবেশ দরজার নিকট নিয়েআসে। ঐ সময় হাবিলদার মোসলেহ উদ্দিন ও অপর দুই বাসায় হত্যাযজ্ঞ শেষ করে বঙ্গবন্ধুর বাসায় ঢুকে সিঁড়ির গোড়ায় গিয়ে পৌঁছায়। বঙ্গবন্ধু যখন সিঁড়ির গোড়ায় গিয়ে পৌঁছায়। বঙ্গবন্ধু যখন সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে উদ্যত হয়েছিলেন ঠিক ঐ মুহূর্তে হাবিলদার মোসলেহ উদ্দিন তাঁর দিকে মেশিনগান তাক করে ব্রাশ ফায়ার করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে সপরিবার হত্যাকান্ডের মিশনে অংশ নেয় তার মেধ্যে মোসলেহ উদ্দিন অন্যতম। গুলির শব্দ শুনে বঙ্গবন্ধু যখন বিষয়টি জানার জন্য নিচে নামছিলেন সেই সময় সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুকে নিজহাতে গুলি করে হত্যা করে এই মোসলেহউদ্দিন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর অন্য খুনিদের সাথে তিনিও দেশ ছেড়ে থাইল্যান্ড হয়ে পাকিস্তানে পালিয়ে যান। এরপর জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। কয়েক বছর পর যান ভারতে। সেখানে উত্তর চব্বিশ পরগনার ঠাকুরনগর এলাকায় স্থীয়ভাবে বসবাস শুরু করেন। বুলেটে ক্ষতবিক্ষত বঙ্গবন্ধুর দেহ তক্ষুণি সিঁড়ির ওপর লুটিয়ে পড়ে। অতঃপর দু’জন মেজর ও হাবিলদার মোসলেহ উদ্দিন ফজিলাতুন নেছাসহ বঙ্গবন্ধুর পরিবারের অন্য সদস্যদের এক এক করে ঠান্ডা মাথায় গুলিতে হত্যা করে। এরই এক ফাঁকে রাসেল দৌড়ে নিচে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো বাড়ির কাজের লোকজনদের নিকট আশ্রয় নেয়। তাঁকে দীর্ঘকাল যাবৎ দেখাশুনাকারী কিশোর বালক আব্দুর রহমান রমা তখন রাসেলের হাত ধরে রেখেছিল। একটু পরেই একজন সৈন্য রাসেলকে বাড়ির বাইরে পাঠানোর জন্য রমার কাছ থেকে তাঁকে নিয়ে নেয়। রাসেল তখন ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, “আল্লাহ্র দোহাই, আমাকে জানে মেরে ফেলবেন না। বড় হয়ে আমি আপনাদের বাসায় কাজের ছেলে হিসেবে থাকবো। আমার হাসু আপা দুলাভাইয়ের সঙ্গে জার্মানিতে আছেন, আমি আপনাদের পায়ে পড়ি, দয়া করে আপনারা আমাকে জার্মানিতে হাসু আপা দুলাভাই এর কাছে পাঠিয়ে দিন।” তখন উক্ত সৈন্যটি রাসেলকে বাড়ির গেটস্থ সেন্ট্রিবক্সে লুকিয়ে রাখে। এর প্রায় আধঘন্টা পর একজন মেজর সেখানে রাসেলকে দেখতে পেয়ে তাকে দোতলায় নিয়ে গিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় হত্যা করে।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর থেকেই পাকিস্তান মিলিটারির ঐ অংশটি জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুকে নিশ্চিহ্ন করতে পারলেই হয় পাকিস্তানের ১৯৭১-এর পূর্বাবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা নতুবা বাংলাদেশ ও বর্তমান পাকিস্তানের মধ্যে একটি কনফেডারেশনের সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব হবে। পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক, সমৃদ্ধ ও শক্তিধর দেশগুলো বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সরকারকে যতদিন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সর্মথন ও সাহায্য প্রদান করছিল, পাকিস্তানের ঐ মহলটি ততদিন পর্যন্ত উক্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ পায়নি।

১৯৭৫-এর জানুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধু দেশে একদলীয় রাজনৈতিক ও শাসনব্যবস্থার প্রবর্তন সমস্ত রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে বাকশাল গঠন নিজেকে বাংলাদেশের আজীবন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা, সেনা বাহিনীর ক্ষমতা খর্ব করে রক্ষী বাহিনী গঠন, রক্ষী বাহিনী প্রধান করেন রাজনৈতিক নেতা তোফায়েল আহমেদকে যা সেনাবাহিনীকে অপদস্থ করা, শেখ কামালের মাধ্যমে সমস্ত ব্যাংক লুঠ, বাক স্বাধীনতা রুদ্ধ করা, নির্বিচারে জাসদ হত্যা করা, সমস্ত পত্রিকা বন্ধ করে, সরকার সমর্থিত চার পত্রিকা রাখা অনলাইনের সমস্ত পত্র পত্রিকা চিরতরে বিলুপ্ত করা। শেখ মুজিব গড়ে তুলেছিলো চিরস্থায়ী বন্দোবস্থ গড়ে তুলে ছিলো দ্বিতীয় প্রজন্মে দানব বাহিনীর মাধ্যমে। পাকিস্তানের ঐ মহলটির হাতে সে সুযোগ তুলে দেয় বললেই চলে। কারণ এর ফলে তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানসহ পাশ্চাত্যের সমৃদ্ধ দেশগুলো বঙ্গবন্ধুর ওপর বীতশ্রদ্ধ হয় এবং আস্থা হারিয়ে ফেলে। অতঃপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন, বিশেষত সি.আই.এ.-এর কাছ থেকে সবুজ সংকেত এবং লিবিয়ার প্রশাসন বিশেষত এর রাষ্ট্র প্রধান কর্নেল (অব.) গাদ্দাফীর সম্মতি পাওয়ার পর পাকিস্তানের মিলিটারির ঐ অংশটি জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বে তাদের দীর্ঘ চার বছরের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে তাদের এজেন্ট, গোঁড়া পাকিস্তানপন্থী ও সাম্প্রদায়িক সদস্য এবং পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর বিশিষ্ট নেতা ও আওয়ামী বিরোধী অন্যান্য মহল ও ব্যক্তিদের সহায়তায় ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবার ও নিকটতম আত্মীয় স্বজনের সদস্যদের হত্যা করে এবং ১৯৭৫ সালে ৩ নভেম্বর আওয়ামী লীগের চারজন প্রবীণ ও বিশিষ্ট নেতা যথা- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন (অব.) মনসুর আলী, তাজউদ্দিন আহমদ ও এ.এইচ.এম কামরুজ্জামানকে সেন্ট্রাল জেলে বন্দী থাকা অবস্থায় হত্যা করা হয়।

পাকিস্তানের বাংলাদেশি এজেন্টদের মধ্যে মাত্র অতি সীমিত সংখ্যক ব্যক্তিকেই যথা- খন্দকার মোশতাক আহমদ, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, মাহবুবুল আলম চাষী, লে. কর্নেল ফারুক, লে. কর্নেল রশিদ, মেজর (অব.) ডালিম এবং জনাকয়েক হাবিলদার ও (সুবেদার) নায়ককে অবহিত করা হয়েছে যে (১৯৭৫-এর) ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারবর্গের সদস্যদের হত্যা করতে হবে। বঙ্গবন্ধু, তারঁ পরিবারবর্গের সদস্যদের, আওয়ামী লীগের চার নেতা ও পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে স্বাধীনতার পক্ষের অনেক মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও সদস্যকে হত্যা নতুনা ক্ষমতা থেকে অপসারণের মাধ্যমে জুলফিকার আলী ভুট্টোর সরাসরি নেতৃত্বে গৃহীত ও পরিচালিত পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ঐ অংশের উক্ত পরিকল্পনা অনেকাংশে সফল হয়েছে বলে অনেকই অভিমত ব্যক্ত করেন।

১৯৭৪ সালে ১৫ই ইং আগষ্ট সকাল ১০টায় আমি লেখক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই। ১৯৭৫সালে ১৫ই ইং আমার বড় স্বমন্ধি জনাব আব্দুল লতিব সরকারের মাধ্যমে এই সংবাদটি শ্রবণ করি। লেখার শেষ অংশে মেজর ডালিম সম্পর্কে কিছু না বললেই নয়।

শেখ কামালের সাথে তার বন্ধুত্ব খাতিরে এবং শেখ মুজিবের বাড়িতে তার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। শেখ কামাল ও তার স্ত্রী সুলতানার সাথে মেজর ডালিম ও তার স্ত্রী নিম্মির অন্তরঙ্গ আড্ডার পুরানো ফটোগ্রাফ অনলাইনে খুঁজলে পাওয়া যাবে। শেখ মুজিবের স্ত্রী ফজিলাতুন্নেসাকে মেজর ডালিম মা বলে ডাকতেন।

৭১ পরবর্তী আওয়ামী দুঃশাসনের তুঙ্গে মেজর ডালিম তার স্ত্রী ও শালাবাবুকে নিয়ে আওয়ামী নেতা গাজী গোলাম মোস্তফার পারিবারিক একটি বিয়ের নিমন্ত্রণে যান। এসময় বিয়ে বাড়িতে হাতাহাতির ঘটনায় উক্ত নেতার সাথে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটে এর কিছুদিন পরই সেনাবাহিনী থেকে ডালিমকে বরখাস্ত করা হয়।

মুজিব হত্যার প্রধান কুশীলব মেজর ফারুক রহমান এবং মেজর রশিদের অনুরোধে ১৫ই অগাস্টের অপারেশনে যোগদান করেন ডালিম। খুব সংক্ষেপে এই হলেন তিনমাসের সূর্যসন্তান রেড়িও জকি মেজর ডালিম। শেখ মুজিবের বিশিষ্ট অনুচর তৎকালীন অর্থমন্ত্রী খন্দকার মোশতাকের নির্দেশে রেড়িওতে মুজিব হত্যার ঘোষণাটা তিনিই দিয়েছিলেন। অপারেশনের অন্যতম হোতা নব্য প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক দেশের উদ্দেশ্যে সম্প্রচারিত তার প্রথম ভাষণে ডালিম, ফারুক, রশিদ সহ অপারেশনে যোগদানকারী সবাইকে সূর্যসন্তানের মর্যাদা দেন। এই সূর্য সন্তানেরা অমীয় বাণী প্রচার করেছিলো। শেখ মুজিব কেমন সৈরাচার খারাপ লোক ছিলো তা প্রমাণ করার জন্য শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে জীবিত রাখা হলো তার পরবর্তী জেনারেশন বুঝতে পারে যে, শেখ পরিবারে সদস্য আচারণ ব্যবহার কেমন হতে পারে?

মেজর ডালিম বলেন, প্রথম কথা, ১৫ই আগস্ট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। এটার সূত্রপাত হয় মুক্তি চলাকালীন অবস্থায়। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধটা ভারতের ইন্টারেস্টে হচ্ছে? এটা কি আমাদের ইন্টারেস্টের জন্য হচ্ছে যে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করবো। নাকি ভারতের উদ্দেশ্যে কাজ করবো। 

এই বীর বিক্রম বলেন, যখন সাতদফাতে চুক্তি করে নজরুল ইসলাম, তাজ উদ্দিনকে পারমিশন দেওয়া হলো একটা প্রভিশনাল গর্ভেমেন্ট গঠন করার। সাতটা লাইন পড়ে সাইন করার পর নজরুল ইসলাম ফিট হয়ে পড়ে গিয়েছিলেন যে, আমরা ক্রমান্বয়ে ভারতের একটা করদরাজ্য-অঙ্গরাজ্যে পরিণত হব।

তিনি বলেন, ‘শেখ মুজিব তার জুলুমের মাত্রা এতাটাই তীব্র করেছিল স্বৈরাচারী আচরণের মতো যে, তখন মানুষ রবের কাছে মুক্তি চাচ্ছিল মুজিবের জুলুমের অবসানের জন্য।

মেজর ডালিম বলেন, মুজিবের মৃত্যুর খবর জানার পর আর বাকশালের পতনের খবর জানার পর শহর বন্দর গ্রামের লাখ লাখ মানুষ আনন্দ মিছিল করছিলো।  ফেরাউনের/নমরুদের পতন হলো রাজনৈতিক নেতা বা দলগুলো আন্ডার গ্রারাইন্ডে ছিল তারাও জনসমর্থন নিয়ে রাস্তায় চলে আসে। এভাবেই জনস্বাকৃতি পেয়েছিল ১৫ আগস্টের বৈপ্লবিক সামরিক অভ্যন্থান। 

আমি কোন লেখক নই। একজন লেখকের যেসব গুণাবলী থাকা দরকার তার ধারের কাছে আমি নই। তবে মহা পবিত্র আল-কুরআন সহ বিভিন্ন ধর্মীয় পেপার পত্রিকা ইংরেজী বাংলা বিশ্বকোষ পড়ে এর নির্জ্জাস থেকে আমার এ লেখা। পাঠকগণ পড়ে ১৫ই আগস্ট সম্পর্কে জানতে পারবেন এইটাই আমার স্বার্থকতা। 

তথ্যসূত্র-
১। কিছু স্মৃতি কিছু কথা বই থেকে সংকলিত।
২। গুগল

লেখক-
মোঃ ইদ্রিস আলী মন্ডল
সাবেক প্রধান শিক্ষক
পায়রাবন্দ বি.আর.এম বালিকা উঃ বিঃ
মিঠাপুকুর, রংপুর।
মোবাইল নং- ০১৭১৫-৩৪৭০৪২ / ০১৮৮২-০৪০৫৬৪

Leave a Reply