স্বীকারোক্তি

 নূরুল ইসলাম বরিন্দী :

লোকে লোকারণ্য পুরো আদালত প্রাঙ্গণ। সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে বহুল আলোচিত এবং আলোড়ন সৃষ্টিকারী মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হবে আজ ।

আমি, আনোয়ার আবিদ চৌধুরী, সরকারের প্রাক্তন মানবসম্পদ মন্ত্রী এ মামলার প্রধান এবং একমাত্র আসামী। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে মন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে স্বনামে-বেনামে সম্পত্তি দখল, ক্ষমতার অপব্যবহার, আয়ের সাথে সামঞ্জস্যহীন সম্পত্তির মালিকানা এবং দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাতের।

সরকারের পক্ষে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। ইতিপূর্বে কয়েকদফা শুনানিও হয়েছে এ মামলার। বাদি-বিবাদিগণের পক্ষ থেকে অনেক যুক্তিগ্রাহ্য আর্গুমেন্ট পেশ করা হয়েছে মাননীয় বিচারক সমীপে।  আজ চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করবেন তিনি। যেহেতু মামলাটি রাষ্ট্রস্বার্থ সংশ্লিষ্ট এবং রাজনৈতিক, সেহেতু এর চূড়ান্ত রায় শোনার জন্য আদালত প্রাঙ্গণে হাজির হয়েছেন বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, রাজনৈতিক তথা সমাজের সর্বস্তরের লোক। নিয়মানুযায়ী যথারীতি আমাকে দাঁড় করানো হলো আসামীর কাঠগড়ায়। সাক্ষীদের একে একে সাক্ষ্যগ্রহণ, আইনজীবীদের নিজের নিজের পক্ষে জোরালো বক্তব্য পেশ, নথিপত্রের আদান-প্রদান ইত্যাদি সবই সম্পন্ন হলো আনুষ্ঠানিকভাবে। এবারে প্রচলিত প্রথানুসারে অভিযুক্ত আসামীর পক্ষ থেকে কিছু বলার থাকলে তা পেশ করার জন্য মাননীয় বিচারকের বরাবর অনুমতি প্রার্থনা করা হলে বিজ্ঞ বিচারক টেবিলে হাতুড়ি পিটিয়ে “অর্ডার অর্ডার” বলে অনুমতি দান করলেন। আমি, আনোয়ার আবিদ চৌধুরী, বিগত সরকারের আমলের ম্যানপাওয়ার মিনিস্টার (একজন মুক্তিযোদ্ধাও বটে) আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে গেলাম। রেওয়াজ অনুযায়ী পবিত্র ধর্মগ্রন্থ হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলাম “যাহা বলিবো সত্য বলিবো, সত্য বৈ মিথ্যা বলিবো না” । তারপর বিজ্ঞ বিচারক এবং জুরি ও উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বলতে শুরু করলাম—“যেহেতু আমি একজন মুসলমান হিসেবে পবিত্র কুরআন হাতে নিয়ে শপথ করেছি সেহেতু এ আদালতে এক বিন্দু মিথ্যে বলার অধিকার আমার নেই এবং মিথ্যে বলবোও না। বিচারে আমার কী শাস্তি হবে জানি না। তবে মাননীয় বিজ্ঞ বিচারক আমাকে আদালতে বক্তব্য পেশ করবার সদয় অনুমতি দান করেছেন এজন্য আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। তবে আমার বক্তব্য একটু দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং তা অপ্রাসঙ্গিক হবে না এটুকু নিশ্চয়তা দিতে পারি। আশা করবো উপস্থিত সবাই , বিজ্ঞ বিচারক এবং সম্মানিত জুরিগণ ধৈর্য প্রদর্শন করে অপরাধীর বক্তব্য মনোযোগ সহকারে শুনবেন। ”

আমি আমার মস্তক আনত করে বিজ্ঞ বিচারকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করলাম। তিনিও মাথা ঝাঁকিয়ে ইঙ্গিতে অনুমতি দিলেন। আমি পুনরায় আমার বক্তব্য শুরু করলাম—“মাননীয় বিচারক মহোদয় এবং উপস্থিত জুরিমন্ডলী। আমি আনোয়ার আবিদ চৌধুরী, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক অজ পড়াগাঁয়ে আমার বাড়ি।  আমার বাবা ছিলেন একজন গরিব দিনমজুর।  ছোটবেলা কেটেছে অত্যন্ত দুঃখ-দারিদ্র্যের মধ্যে। লেখাপড়ার সঙ্গতি দূরের কথা, দুবেলা দুমুঠো ভাত এবং পরনের মোটা কাপড়ও জুটতো না ভাগ্যে। তবুও উদয়াস্ত অমানুষিক পরিশ্রম করে, প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে আমার বাবা অনেক কষ্ট করে আমাকে লেখাপড়া শিখিয়েছিলেন ডিগ্রি পর্যন্ত। একটা ছোটখাটো চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ফিরেছি চারদিক। ধরনা দিয়ে ফিরেছি দ্বারে দ্বারে। ঠিক এ সময়ে শুরু হয়ে গেলো মুক্তিযুদ্ধ। লেখাপড়া শিখেছি, মনে দেশাত্মবোধের উন্মেষ ঘটেছে। স্বাধিকার আর গোলামীর প্রভেদটা বুঝতে কষ্ট হয় না। কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসেবে নয়, কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ক্যাডার হিসেবে নয়, সম্পূর্ণ বিবেকের তাগিদে, দেশপ্রেমের মহৎ প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়েই যোগ দিয়েছিলাম মুক্তিযুদ্ধে। যুদ্ধ চলাকালীন দুর্জয় সাহস, দক্ষতা আর যোগ্যতার গুণে একটা গেরিলা গ্রুপের কমান্ডার হিসেবে বিবেচিত হই।

“নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর স্বাধীন হলো দেশ। মানুষের মনে কত আশা, কত আকাংক্ষা। নতুন দেশ, নতুন জাতি, নতুন সরকার। প্রথম প্রথম একটু হতাশা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কেটেছিলো। পালে হাওয়া লাগার প্রতিকূল- অনুকূল ব্যাপারটা তেমন বুঝতে পারিনি। পরে অবশ্য যখন বুঝতে পারলাম তখন আর সুযোগ হাতছাড়া করিনি। কিছুদিনের মধ্যে রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুললাম। ফলে সমাজে কিছু কিছু সম্মানিত পদ-পদবি, লাইসেন্স, পারমিট ইত্যাদির সুবাদে কিছুটা আর্থিক সচ্ছলতা এসে গেলো আমার। বছর দুয়েকের মধ্যেই অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে গেলো। একজন সফল মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে দহরম-মহরম, তদুপরি আর্থিক উন্নতি। এসব কারণে আমি আমার এলাকায় অল্পদিনের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় এবং প্রতাপশালী হয়ে উঠতে সক্ষম হই।

“দেশে সাধারণ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে আমার ভেতরে একটা অভিলাষ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে। এর প্রেক্ষিতে আমি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যোগদানের মনস্থ করি। রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা,  বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন, এলাকার মানুষজনের সঙ্গে মেলামেশার সুবাদে জনপ্রিয়তা লাভে সক্ষম হয়ে ওঠার ফলে বড় দল থেকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন লাভে বেগ পেতে হয়নি। বলাবাহুল্য নির্বাচনে জয়লাভ করে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হলাম প্রথমবারই। আর আমার ওপরে ওঠার সিঁড়ি প্রশস্ত হয়ে যায় তখন থেকেই। আমি, এক সময়ের এক দিনমজুরের সন্তান, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত আনোয়ার আবিদ চৌধুরী, একজন নব্য রাজনীতিক হিসেবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তিবর্গের সারিতে নিজের আসন পাকাপোক্ত করার মোক্ষম সুযোগ লাভ করি।

“সেই শুরু। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি আমাকে। তর তর করে একটার পর একটা ধাপ অতিক্রম করতে থাকি আমি। এভাবে নিজ এলাকার সীমিত গন্ডি পেরিয়ে আমার অভিযাত্রার মুখ্য কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে কেন্দ্র অর্থাৎ রাজধানী ঢাকা। ক্রমান্বয়ে আমার রাজনৈতিক পদোন্নতি ঘটতে থাকলে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং প্রভাবশালী নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছে যাই।

“প্রথমদিকে রাজনৈতিক ক্যারিয়ার পাকাপোক্ত এবং একজন আদর্শবান মুক্তিযোদ্ধার ভাবমূর্তিকে সমুন্নত রাখার প্রয়াস ছিলো আমার মধ্যে যথেষ্ট। কিন্তু ওপরের স্তরে পৌঁছার পর যখন দেখলাম কী সরকারের আর কী সমাজের –প্রত্যেকেই নিজ নিজ আখের গোছাতে ব্যস্ত। চারদিকে সবাই যখন বিত্ত-বৈভব লাভের প্রতিযোগিতায় মত্ত তখন একা আমি সৎ, আদর্শবান থেকে ঠকবো কেন? আমিও দ্বিগুণ উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে লেগে গেলাম সিনিয়র ভাইদের সঙ্গে লবিংয়ে। তোষামুদি আর চাটুকারিতায় প্রথমসারির বিশ্বস্তদের মধ্যে আমার নাম লিখিত হয়ে গেলো। ফলশ্রুতিতে আমার ভাগ্যে জুটে গেলো মন্ত্রীর পদবি। হয়ে গেলাম ক্ষমতাসীন দলের সরকারের জনশক্তি মন্ত্রী। সেটা ছিলো অপ্রত্যাশিত পাওয়া। অর্থ-বিত্ত আহরণের মোক্ষম মওকা। দেখতে না দেখতে বছরখানেকের মধ্যেই রাজধানী ঢাকা শহরের ভেতর আমার পাঁচখানা বাড়ি, তিনটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, অঢেল ব্যাংক ব্যালান্স, নামে-বেনামে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির পাহাড় গড়ে উঠতে লাগলো। একেবারে অচিন্ত্যনীয় ব্যাপার। অবশ্য ফুলপ্লেজেড মন্ত্রী হওয়ার আগে, যখন প্রতিমন্ত্রী ছিলাম –অর্থাগমের শুরুটা তখন থেকেই। প্রাপ্ত সুযোগের সদ্ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক বনেছি সত্য বটে, কিন্তু এর পেছনে

আমার মেধা, শ্রম, আনুগত্য ইত্যাদিও কাজ করেছে প্রচুর। আমার এলাকায় আমি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলাম যে, দুই দুইবার নির্বাচনী যুদ্ধে আমার প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করেছি। এমনকি তাকে হারাতে হয়েছে জামানত পর্যন্ত। মানুষের খারাপের একটা দিক যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে ভালোর দিকও। অঢেল অর্থকড়ির মালিক কিংবা মন্ত্রী হওয়ার সুবাদে আমি ভুলে যাইনি ছেলেবেলাকার দুঃখ-কষ্টের কথা। নিজের এলাকার উন্নতি-অগ্রগতির কথা। যেহেতু আমার রাজনৈতিক উত্থান আমার এলাকার জনগণের ভোটদানের মাধ্যমে সেহেতু আমি তাদের স্থানীয় রাস্তা-ঘাটের উন্নয়ন, শিল্পব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লোক নিয়োগ, বেকার যুবকদের দেশে-বিদেশে চাকরির সংস্থান করে দেয়া ইত্যাদি সমাজসেবামূলক কর্মকান্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা আমার জন্য হয়ে উঠেছিলো রাজনৈতিক চাতুর্যের ক্ষেত্রবিশেষ। তাইতো বার বার নির্বাচনে জিতে আমার আসন হয়েছে মজবুত এবং পাকাপোক্ত।

“ভাবতে অবাক লাগে এতো অল্প সময়ের মধ্যে আমার এমন বিশাল রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব হলো কী করে! আমার হাতে কী আলাদীনের জাদুর চেরাগ ছিলো? নাকি চিচিং ফাঁক হয়ে যাবার মন্ত্রবৎ কোনো চাবিকাঠি ছিলো? না । ওসব কিছুই ছিলো না আমার। যা ছিলো তাহলো রাজনৈতিক চাতুর্যতা, ঝোপ বুঝে কোপ মারার কলা-কৌশল , হাওয়ার গতি বুঝে গা ভাসার সক্ষমতা আর স্রোতের অনুকূলে নৌকা বাওয়ার পারঙ্গমতা। ফলে দল-বদলের রাজনীতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি আপনা-আপনি। যখনই দলের ভরাডুবি লক্ষ্য করেছি তখনই যোগ দিয়েছি অন্য একটি দলে–যে দল পরবর্তীতে উঠে এসেছে ক্ষমতার আসনে। এভাবে যখনই যে দল ক্ষমতায় এসেছে, তখনই সে দলের হয়ে মন্ত্রিত্বলাভে সক্ষম হয়েছি। স্রোতের অনুকূলে তরী ভাসাবার অভ্যাসটা রপ্ত হবার ফলে আমার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার কিছুটা নষ্ট হয়েছে বটে, আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়নি। এই পোড়া দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন তুখোড় খেলোয়াড় তো আর আমি একা  নই। রয়েছে ডজন ডজন। কজনকে  চিহ্নিত করতে পারে দেশের সাধারণ মানুষ? বেশিরভাগ মানুষের মাঝে সুশিক্ষা নেই। দেশপ্রেম নেই। আত্মসম্মান বোধ নেই। টাকা দিয়ে ভোট কেনা যায়। টাকার বিনিময়ে রাজনৈতিক দলের অস্ত্রধারী ক্যাডার হওয়া যায়। ঘুষ দিলে থানা থেকে খুনের আসামীকে ছাড় করানো যায়। অপরাধী গ্রেপ্তার হয়েও কোর্টে সাজা পায় না। ক্ষমতাসীন আর ক্ষমতাহীন দলের গডফাদারদের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে লালিত হয় ছাত্র-যুবকরা—এমন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন-প্রাঙ্গণে বিচরণ করেন ক’জন আদর্শবাদী নিষ্কলুষ চরিত্রের মানুষ ?

“বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে ছিলাম প্রতিমন্ত্রী। দল-বদলের বদৌলতে জেনারেল জিয়ার আমলে হয়েছি পূর্ণ মন্ত্রী (মাঝে মোস্তাক সরকারের সময় আড়ালে থেকেছি। কেন যেন মনে হয়েছিলো এ সরকার বেশিদিন টিকবে না)। জিয়া সরকারের পতনের পর এরশাদ সরকারে পেয়ে গেলাম জনশক্তি মন্ত্রীর পদ। যাকে বলে সোনায় সোহাগা।

“বিজ্ঞ বিচারক, উপস্থিত সুধিমন্ডলী। প্রশ্ন করতে পারেন–যে লোকের কোনো রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, রাজনীতিতে যার হাতেখড়ি মুক্তিযুদ্ধের অনেক পরে, সে লোক কী করে একজন পূর্ণ মন্ত্রী হতে পারে? শুধুই কী মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার সুবাদে?

“বলতে আজ দ্বিধা নেই নবগঠিত জাতীয় পার্টির সরকারে মন্ত্রিত্বলাভে বিশেষ কোনো যোগ্যতার প্রয়োজন পড়েনি। যে জিনিসটার বড় বেশি প্রয়োজন ছিলো তা হলো সুপ্রিমবসের তাঁবেদারি, মোসাহেবি, চাটুকারিতা আর মাল-পানি। প্রায় একদশকের অভিজ্ঞতায় এসব অর্জন ছিলো আমার ঝুলিতে। তাছাড়া উর্দিপরা রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে বাইবর্ন রাজনীতিকের কোনো মূল্য ছিলো না। রাজনীতিতে অপেক্ষাকৃত নবিস এমন লোকদেরই বেশি পছন্দ করতেন তিনি। ঝানু রাজনীতিকরা রাষ্ট্র পরিচালনায় বড় বেশি মাথা ঘামায় – এ বোধটুকু এরশাদ সাহেবের ঘটে যথেষ্টই ছিলো। আর তাই হালে পানি না-পাওয়া প্রবীণ এবং দলছুট উঠতি রাজনীতিকদের নিয়ে দল গঠন করে গণতন্ত্রের প্রবক্তা হিসেবে আবির্ভূত হলেন তিনি। প্রহসনের নির্বাচন তিনিও দিলেন জেনারেল জিয়ার উত্তরসূরি হিসেবে। যথাবিহিত গণতান্ত্রিক লেবাসের অন্তরালে ওড়াতে থাকলেন সামরিকায়নের ঝান্ডা। আমরা সবকিছু জেনে-শুনেও অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতাম রাষ্ট্রীয় প্রশাসনযন্ত্রের। কারণ একটাই,- পদরক্ষা। স্বার্থসিদ্ধি। আরো প্রাপ্তির আশা। সেই আমল থেকে এ দেশের রাষ্ট্রযন্ত্রে যে ট্রাডিশন চলে আসছে আমরা তার ব্যতিক্রম ছিলাম না বটে, তবে সত্যি বলতে কী ব্যক্তিগতভাবে কিছু কিছু অনৈতিক কার্যকলাপের আমি ছিলাম ঘোর বিরোধী। যেমন বঙ্গবন্ধু হত্যা, জেল হত্যা , জিয়া হত্যা ইত্যাদি।

“আপনারা জানেন এসব হত্যা-ক্যু-ষড়যন্ত্রের মূল হোতা ছিলো সেনাছাউনির উর্দিপরা কিছু লোকজন। যেহেতু দেশ শাসন এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন বেসামরিকীকরণ সে কারণে তারা দোসর হিসেবে বেছে নিয়েছিলো কিছু মির্জাফর চরিত্রের রাজনীতিককে। তবে এদের সংখ্যা ছিলো খুবই নগণ্য।

“যাই হোক, আমার জবানবন্দি আর দীর্ঘায়িত করতে চাই না। দেশে আজ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জবাবদিহিমূলক সরকার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। আইনের শাসন, মৌলিক অধিকারের কথা বলা হচ্ছে স্বৈরাচার পতনের পর থেকে। আমার প্রশ্ন হলো—দেশের মানুষ কী ভালো আছে এরশাদ আমলের চাইতে? আট/নয় বছরের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় দেশের সাধারণ মানুষ কী নিরাপদে, সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারছে? বন্ধ হয়েছে কী লুটপাট, অরাজকতা আর স্বার্থপরতার রাজনীতি? বন্ধ হয়েছে কী ব্যক্তি, দল, গোষ্ঠীর ক্ষমতায় যাবার পাঁয়তারা? পতিত সরকারের মন্ত্রী হিসেবে আজ আমি দুর্নীতির দায়ে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে। কিন্তু অন্যরা কোথায়? প্রত্যেক সরকারের আমলে শত শত হাজার হাজার নেতা-পাতিনেতা, মন্ত্রী-আমলা যারা দুর্নীতিতে  আকণ্ঠ   নিমজ্জিত  ছিলো,    অবৈধ  উপায়ে  অঢেল  অর্থ-বিত্তের  পাহাড় গড়েছিলো,  সাদা  টাকা  কালো করেছিলো  তারা  আজ কোথায়?   তাদের  বিচার করবে কে ?”— —————————————-

(সুধী পাঠকমন্ডলী, বিচারে আনোয়ার আবিদ চৌধুরীর কী শাস্তি হবে, বিজ্ঞ বিচারক তাকে লঘুদণ্ড দেবেন নাকি গুরুদণ্ড দেবেন, তা নাইবা জানা হলো আপনাদের। কারণ, যা জানবার তা জানা হয়ে গেছে আসামীর জবানবন্দিতেই। অতএব, নিজেদের বিবেককেই বিচারক সাব্যস্ত করতে দোষ কোথায় ?)

নূরুল ইসলাম বরিন্দী, email:nibarindi@gmail.com