পবিত্র কুরআনে মান্না ও সালওয়ার ঘটনা

শেয়ার করুন

 নূরুল ইসলাম বরিন্দী :

মিশরের বাদশাহ ফেরাউনের সেনাবাহিনীর ধাওয়া খেয়ে হজরত মুসা (আঃ) তাঁর সম্প্রদায় বনি ইসরাইলকে সঙ্গে নিয়ে  নীলনদের তীরে পৌঁছান। সামনে অথৈ জলরাশি, পেছনে ফেরাউন বাহিনী। এমন অবস্থায় আল্লাহর নির্দেশে মুসা (আঃ) তাঁর কুদরতি লাঠির আঘাতে দুদিকে পানি সরিয়ে দিয়ে নির্বিঘ্নে নীলনদ পার হয়ে মাদায়েন নামক স্থানে উপস্থিত হন। এরপর   আল্লাহতায়ালার প্রত্যাদেশ পেয়ে হজরত মুসা (আঃ) সিরিয়ায় ধর্ম প্রচারের জন্য প্রথমে ১২ জন শিষ্যকে সেখানে পাঠান। তারা  উজ বিন ওনোক নামের এক দৈত্যাকার পাহলোয়ানকে দেখে ভীত হয়ে সেখান থেকে ফিরে আসেন আর সাধারণ মানুষের কাছে এ সংবাদ চাউর হয়ে গেলে  তারা মুসার (আঃ) সিদ্ধান্তের বিপক্ষে চলে যায়। কিন্তু ওই ১২জন শিষ্যের মধ্যে ইউশা এবং কাবুত নামের ২ শিষ্য হজরত মুসার (আঃ) স্বপক্ষে রয়ে যান। মুসা (আঃ) তাঁর সম্প্রদায় বনি ইসরাইলকে সিরিয়া অভিযানের কথা ব্যক্ত করলে তারা তা অমান্য করে দলে দলে মিশরের দিকে রওনা দেয়ার প্রস্তুতি নেয়। অগত্যা মুসা (আঃ) তাঁর মাত্র দুজন সঙ্গীকে নিয়ে সিরিয়ায় চলে যান এবং পাহলোয়ান উজকে পরাজিত করে সেখানে নিজের আধিপত্য কায়েম করেন।

ওদিকে বনি ইসরাইল মিশর অভিমুখে যাত্রা করলে দিনভর চলার পর সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে তারা দেখে যে স্থান থেকে তারা সকালে যাত্রা করেছিলো আবার সেই স্থানেই ফিরে এসেছে। এভাবে একই অবস্থায় বহুদিন গত হয়ে যায়। ফলে অনাহার-অর্ধাহারে বহু লোক মৃত্যুবরণ করে। এই জায়গাটির নাম ছিলো ‘তীহ’ প্রান্তর। পরে তারা বুঝতে পারে হজরত মুসার (আঃ) অবমাননা ও তাঁর বদ-দোয়ার কারণেই তাদের এই করুণ পরিণতি!।

ইতিমধ্যে হজরত মুসা (আঃ) সিরিয়া থেকে ‘তীহ’ প্রান্তরে প্রত্যাবর্তন করে তাঁর সম্প্রদায়ের দুর্দশা দেখে তাদের উদ্দেশে বললেন,– তোমরা এখন নির্ভয়ে সিরিয়ায় গিয়ে বসবাস করতে পারো। বনি ইসরাইল জানালো তারা বহু চেষ্টা করেও ‘তীহ’ প্রান্তর ছেড়ে যেতে পারেনি। অন্যত্র যাবার জন্য রওনা দিয়েছে কিন্তু বারবার ওই একই জায়গায় ফিরে এসেছে। এরপর হজরত মুসা (আঃ) তাদেরকে নিয়ে পথ চলা শুরু করলেন। কিন্তু আবারো দেখা গেলো ঘুরে ফিরে ওই একই জায়গায় ফিরে আসছেন। এর মোজেজা কী জানার জন্য মুসা (আঃ) আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করলেন। আল্লাহ সুবহানা ওয়াতায়ালা বললেনঃ হে মুসা, ভবিষ্যতে তোমার ওই সম্প্রদায়ের জন্য আমার কাছে কোনো সুপারিশ করবে না। আমার অবাধ্যতার শাস্তি আমি ওদের এই ‘তীহ’ প্রান্তরেই ভোগ করাতে থাকবো।

এরপর সেই বিয়াবান ময়দানে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় বহু লোক মৃত্যুবরণ করতে লাগলো। নিজ সম্প্রদায় বনি ইসরাইলের এমন দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে না পেরে হজরত মুসা (আঃ) আল্লাহর কাছে করুণভাবে মোনাজাত করতে লাগলেন। অনেক তাফসিরকারের ভাষ্যমতেঃ মুসার (আঃ) দোয়ায় সাড়া দিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ‘তীহ’ প্রান্তরে বনি ইসরাইলের জন্য দুই প্রকার খাদ্যের ব্যবস্থা করে দিলেন–‘মান্না’ এবং ‘সালওয়া’। মান্না হলো—বরফের মতো ঠাণ্ডা মিষ্টি খাবার। আর সালওয়া হলো—একপ্রকার ছোটো ছোটো পাখি। এসব খাবার আসমান থেকে পতিত হতো। এগুলোর বিশেষত্ব হলো, রান্না করে খাবার প্রয়োজন হতো না। আর পানির সমস্যার সমাধান হয়ে যায় মুসার (আঃ) লাঠির আঘাতে পাহাড়ের গায়ে ঝরনা সৃষ্টি হওয়ার মধ্য দিয়ে। এভাবে ১২টি ঝরনা থেকে প্রবাহিত পানি দিয়ে ১২টি বনি ইসরাইল গোত্রের পানির অভাব পূরণ হয়ে যায়।

এরপর মুসা (আঃ) তাঁর সম্প্রদায়কে বললেনঃ তোমরা প্রত্যেকে মান্না-সালওয়া সংগ্রহ করে যেদিনেরটা সেদিনই খাবে, আগামীকালের জন্য জমা করে রাখবে না। এভাবে কিছুদিন অতিবাহিত হবার পর তারা লোভের বশবর্তী হয়ে নিত্যদিনের প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার জমানো শুরু করলো। ফলে আল্লাহতায়ালা আসমান থেকে এসব খাদ্যবস্তু পাঠানো বন্ধ করে দিলেন। এতে করে বনি ইসরাইলের পূর্বের মতো খাদ্য-সংকট দেখা দিলো। হজরত মুসা (আঃ) তাঁর নির্দেশ অমান্য করায় তাদের তিরস্কার করতে লাগলেন। তারা তখন বলতে লাগলো, হে মুসা (আঃ), তুমি আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য মরিচ, পেঁয়াজসহ মসলাযুক্ত খাবারের ব্যবস্থা করে দাও। কারণ প্রতিদিন একইরকম খাবার গ্রহণের ফলে ওতে আমাদের অরুচি এসে গেছে।

অতঃপর মুসা (আঃ) পুনরায় তাদের অনুরূপ খাদ্যের জন্য আল্লাহতায়ালার কাছে ফরিয়াদ করলেন। আল্লাহর কাছ থেকে জবাব আসেঃ হে মুসা, তোমার সম্প্রদায় যদি তাদের মনমতো খাবার চায় তবে যেন তাদের নিকটবর্তী অন্য কোনো শহরে চলে যায়। এরপর বনি ইসরাইল তীহ প্রান্তর ছেড়ে অন্যত্র রওনা দিতে উদ্যত হয়। কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ইচ্ছা ছিলো না তারা সে স্থান ত্যাগ করুক। তাই অনেক চেষ্টার পরও তারা তীহ প্রান্তর ত্যাগ করতে পারলো না।

এভাবে ক্রমাগত ৪০  বছর ধরে বনি ইসরাইল সেখানে থেকে অনাহার, অর্ধাহারে তিলে তিলে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। এদের মধ্যে যেসব শিশু সেখানে জন্মেছিলো একমাত্র তারাই জীবিত ছিলো। এই অবস্থায় হজরত মুসা (আঃ) ইন্তেকাল করেন। পরবর্তীতে তাঁর শিষ্য হজরত ইউশা (আঃ) সত্যধর্ম প্রচার করেন। বনি ইসরাইলের জীবিতদের মধ্যে কিছু সিরিয়া এবং কিছুসংখ্যক মিশরে গমন করেন। পরবর্তীতে সেখানে তারা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

নূরুল ইসলাম বরিন্দী, Email: nibarindi@gmail.com