মিঠাপুকুরে লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত হয়ে দুই শতাধিক গরুর মৃত্যু

মো: শামীম আখতার :

মিঠাপুকুর উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের প্রায় সব জায়গায় ল্যাম্পি স্কিন রোগের (এলএসডি) প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। দিন যাচ্ছে বেড়েই চলেছে এই রোগের সংক্রমন। এই ভয়ঙ্কর রোগে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত দুই শতাধিক গরুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত হয়ে সংসারের একমাত্র অবলম্বন গরুর মৃত্যুতে অঝরে কাঁদছেন অনেকে। এ সংক্রমণ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়ছে খামারী ও কৃষকরা। পশু চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে স্থানীয় হোমিওপেথিক চিকিৎসকের কাছে ভিড় জমাচ্ছেন ভূক্তভোগীরা। এ রোগের প্রতিষেধক না থাকায় এর প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে সচেতনতামূলক উঠান বৈঠক করতে দেখা গেছে।

মিঠাপুকুর (রংপুর):- লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত গরু। ছবি- M24News

মিঠাপুকুর প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সামনে গিয়ে দেখা যায়, অটোরিকশা ও ভ্যানে করে আক্রান্ত গরু নিয়ে চিকিৎসার জন্য এসেছেন লোকজন। পায়রাবন্দ ইউনিয়নের শালাইপুর গ্রামের নুর আলম ভ্যানে করে একটি গরু নিয়ে এসেছেন।

তিনি জানান, তার বাড়ির দুইটি গরু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। এরমধ্যে একটি গরু ধিরে ধিরে নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। কোন উন্নতি হচ্ছেনা। দুর্গাপুর ইউনিয়নের শঠিবাড়ী এলাকার মানিক মিয়া বলেন, খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে লাম্পি স্কিন রোগ। চিকিৎসা দিয়েও কাজ হচ্ছে না।

মিঠাপুকুর (রংপুর):- লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃতুবরণ করে গরুটি। ছবি- M24News

এদিকে, উপজেলার রাণীপুকুর বাজারে গিয়ে দেখা যায় একটি হোমিও দোকানের সামনে গরু ব্যবসায়ী ও খামারিদের লম্বা লাইন। হারুনুর রশিদ নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, “আমি গরুর ব্যবসা করি। বাড়িতে তিনটি গরু লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত হয়েছে। স্থানীয় পশুর ডাক্টারকে দেখিয়েছি। কোন লাভ হয়নি।”

স্থানীয় পান ব্যবসায়ী সোনা মিয়া কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, “৬-৭ হাজার টাকা খরচ করেও গরুটাকে বাঁচানো গেলোনা। সোমবার (২৪ জুলাই) রাতে হঠাৎ প্রচন্ড জ্বর এসে কাঁপতে কাঁপতে চোখের সামনে গরুটি মারা গেলো। প্রায় ১০ দিন আগে এক ব্যাপারী গরুটির দাম ৭০ হাজার টাকা করেছিল। সব শেষ হয়ে গেলো।”

মিঠাপুকুর (রংপুর):- লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত গরু নিয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে চিকিৎসার জন্য এসেছেন ভূক্তভোগীরা। ছবি- M24News

লালচন্দ্রপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেন জানান, তার বাড়িতে পোষা একটি গরু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। তিনি বলেন, “গো-খাদ্যের অনেক দাম। অনেক কষ্ট করে গরুটাকে পুষে বড় করলাম। হঠাৎ আজ (মঙ্গলবার) সকালে মারা গেলো। বাজারে গরুটির মূল্য প্রায় ৫৫-৬০ হাজার টাকা হতো।”

রাণীপুকুর স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল্লাহেল কাফি, আরিফুজ্জামান ফুয়াদ (মাষ্টার), নুর আলম ও জুয়েলসহ অনেকে বলেন, খামারি ও সাধারন কৃষকরা আক্রান্ত গরু নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। পল্লী চিকিৎসকদের মাধ্যমে পশুর চিকিৎসা করানো হচ্ছে। কেউ কেউ কবিরাজ ও ওঝাদের কাছ থেকে তেল ও লবণ পড়া ব্যবহার করছেন।

মিঠাপুকুর (রংপুর):- লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত গরু নিয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে চিকিৎসার জন্য এসেছেন পায়রাবন্দ ইউনিয়নের শালাইপুর গ্রামের নুর আলম। ছবি- M24News

প্রাণী চিকিৎসকরা বলেছেন, এটি একটি ভাইরাস জনিত রোগ। এটি গরুর দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দ্রæত সময়ের মধ্যে আক্রান্ত গরুকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। প্রথমে আক্রান্ত প্রাণির দেহে গুঁটি বের হয়, এরপর ছিদ্র ছিদ্র গর্ত হয়ে দূর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের ভেটেরিনারি চিকিৎসক ফারুক হোসেন বলেন, “প্রথমে রাণীপুকুর ও পায়রাবন্দ ইউনিয়নে লাম্পি স্কীন রোগের আক্রমন দেখা দেয়। আস্তে আস্তে পুরো উপজেলার ছড়িয়ে পড়েছে। এই ভয়ঙ্কর রোগে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত দুই শতাধিক গরুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।”

মিঠাপুকুর (রংপুর):- রোগ প্রতিরোধ ও মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আয়োজনে উঠান বৈঠক। ছবি- M24News

মিঠাপুকুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা একরামুল হক বলেন, “অপরিস্কার, স্যাঁতস্যাঁতে জায়গা ও মশা-মাছির কারণে এ রোগটি ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগের প্রতিষেধক তৈরি হয়নি। তাই, অনেক চেষ্টা করেও এ রোগের বিস্তার ঠেকানো যাচ্ছে না। তাই উঠান বৈঠকের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ সম্পর্কে আলোচনা করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে এই রোগের সংক্রমন কমতেছে।”

আক্রান্ত গরুর মাংস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত গরুর মাংস খাওয়া ঠিক নয়। কারণ রোগটি মাংসের মাধ্যমে মানুষের শরিরে প্রবেশ করতে পারে।”

এম২৪নিউজ/আখতার

Leave a Reply