
স্বাধীনতার সূবর্নজয়িন্ততে রংপুর জেলা প্রশাসন কর্তৃক প্রকাশিত স্মরনিকা “অর্জন” এ মিঠাপুকুর ইউএনও ফাতেমাতুজ জোহরা’র ‘স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তি: এক খন্ড আবাসের নিশ্চয়তা’ লেখাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোষ্ট করেছে তিনি। লেখাটি হুবহু তুলে ধরা হলো:-
গ্রামে গঞ্জে রাতের বেলায় শীতটা বেশ জাকিয়ে বসে। সন্ধ্যার পর পরই হিম শীতল অনুভূতি তার সাথে বয়ে যায় হাড় কাপানো ঠান্ডা বাতাস। শহুরে জীবনে শীতটাকে ঠিক এভাবে দেখা হয়নি বহুদিন। মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়ার জন্মভূমি, নারী শিক্ষার সূতিকাগার নামে খ্যাত সেই উপজেলাতে পোষ্টিং সুত্রেই আসা। সন্ধ্যা নামলেই একটা সাদা পিকআপের পেছনে বস্তা ভর্তি কম্বল, দুজন আনসার সদস্য আর একজন কর্মচারী নিয়েই বেড়িয়ে পড়া। বিষয়টা কেমন রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের ঘরে ঘরে যাওয়া হচ্ছে বেশ কিছুদিন ধরেই। এ এক নেশার মতো হয়ে গেছে।

ঠান্ডায় কাঁপতে থাকা কোন বৃদ্ধার গায়ে সরকারের দেয়া একখন্ড মোটা কাপড় জড়িয়ে দেয়ার মাঝেও যে এতো খানি পরিতৃপ্তি আসতে পারে তা জানা ছিল না। এমনি এক শীতের রাতে বস্তা ভর্তি কম্বল নিয়ে অজানা পথে চলছে ৫ জনের একটা ছোট দল। হঠাৎ চোখ চলে গেলো দূরের নিভু নিভু আলোর দিকে। সেদিকে লোকালয় আছে কিনা জিজ্ঞাসা করতেই গাড়িচালক বলে বসল ওইদিকে রাস্তা নেই, যাওয়া যাবেনা। গাড়ির হেড লাইটে দেখা যাচ্ছে একটা ছোট আধভাংগা ব্রীজ, তারপর একে বেকে চলা মাটির রাস্তা।
রাস্তার শেষ প্রান্ত মিলেছে গিয়ে একটু উচুঁতে থাকা নিভু আলোর এক প্রান্তে। একপ্রকার জোর করেই গাড়ি নামাতে বললে গাড়িচালক অনিচ্ছা সত্বেও নামিয়ে দেয়। আকাবাকা এবড়োথেবড়ো পথের প্রান্তে যখন গাড়ি থামল নিভু আলো তখন কিছুটা স্পষ্ট। একটা ছোট শ্রীহীন দোকান ঘরে মিটমিটিয়ে চলছে একটা বাতি। তার মৃদু আলোয় কয়েকটা পাউরুটি, পটেটো চিপসের কয়টা সবুজ প্যাকেট, পাশেই সুপারি পানের একটা ট্রে ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ল না। জায়গাটা কিছুটা লম্বাটে, কিছুটা উচু।
গাড়ি দেখে কৌতূহলী কয়েকজন এগিয়ে এলো। গাড়ির আলোয় দেখা গেলো সারিবব্ধ মাটি আর বাশ এবং কিছু টিনের ছাউনি দেয়া ঘর। কম্বল বিতরণ হবে এ খবরটা নিমিষেই ছড়িয়ে গেল। দেখতে দেখতে দুতিনশ লোক বেড়িয়ে আসল কুড়ে গুলোর ভেতর থেকে। জানা গেল সেখানে প্রায় দুশত পরিবারের বাস। কারো নিজস্ব জমি নেই, নেই নিজস্ব আবাস। সরকারের জমিতে কোন রকম মাথা গোজার চেষ্টা করছেন তারা। কম্বল বিতরণের মাঝেই তাদের জীবন যাপনের কিছু করুন ধারনাও পাওয়া গেল।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় মুজিববর্ষ উপলক্ষে সারা দেশে চলছে গৃহহীনদের পূনর্বাসনের মহান কাজ। সে বিষয়টা মাথায় চলে আসল। খোজ খবর নিয়ে জানা গেল জমিটি সরকারের জমি।স্বপ্ন দেখা শুরু করে দিল এক জোড়া চোখ, স্বপ দেখানো শুরু করল কয়েক শতজোড়া চোখের জন্য। শুরু হল ভূমিহীনদের তালিকা প্রনয়ণ। কাগজ পত্র ঘাটতে গিয়ে কিছুটা নিরুৎসাহিত হতে হলো। প্রায় ৫ একর জমি পাওয়া গেলেও তা কোন কারনে তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার রাজশাহীর নামে রেকর্ডকৃত। ১ নং খতিয়ানের জেলা প্রশাসকের নামে রেকর্ডকৃত জমি না হলে কিভাবে হবে ঘর, কিভাবে হবে স্বপ্ন পূরন।
ঠিক এ পর্যায়ে এসে যখন অফিসারটি হাল প্রায় ছেড়েই দিচ্ছিলেন, নতুন করে স্বপ্ন দেখালেন শ্রদ্ধেয় জেলা প্রশাসক। বললেন তুমি রেকর্ড কারেকশনের জন্য ফাইল পাঠাও। নিজ দায়িত্বে স্বল্পসময়ে রেকর্ড কারেকশন করে দিলেন তিনি। অনুমোদিত হল দেড়শত ঘর নির্মানের আদেশ। স্বপ্ন দেখা শুরু করলেন নতুন অফিসারটি তার সাথে অবহেলিত আর সুবিধা বঞ্চিত সেই এলাকার দেড়শত পরিবারের সবকটি মানুষ।
প্রায় প্রতিদিন শুরু হলো সেখানে যাওয়া, মানুষের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসা ঘর গুলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দেয়া বিনামূল্যে এক উপহার। গ্রামের সহজ সরল মানুষগুলো বুঝতেই পারছিল না আসলেই কি তাদের পাকা ঘর হবে! নাকি শুধু তাদের আশ্বাস দেয়া।কেউ বোঝে তো কেউ বেঁকে বসে। কেউ ঘর চায়, তো কেউ অনিশ্চয়তায় কিছুটা চিন্তিত। প্রায় প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে একই প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসা,তারপরও তারা ঠিক বিশ্বাস করতে পারে না।
প্রায় সেখানে যেতে যেতে একটা সময় সবাই চিনেই ফেলল, সহযোগিতার হাত প্রসারিত হতে থাকল ক্রমান্বয়ে। কোন ঘরের রান্না কি হলো সেটাও জানার বাকি থাকলো না একসময়। মানুষকে বোঝানো গেল যে এ আশ্বাস সত্যিকারের। শুরু হলো পুরানো বাড়িঘর সরিয়ে নতুন ঘরের লে আউট দেয়ার কাজ।
পরদিন সকালে ফোন আসে মানুষ বাড়ি সরিয়ে নিবে না। গুজব এসেছে তাদের সরিয়ে দেয়া হচ্ছে তাদের বসবাসকৃত জায়গা থেকে।জনরোষের সম্ভবনা। ভরা মিটিং থেকে ছুটে যাওয়া।মানুষের কাছে আবার একই কথা বলা। একটা সময় শান্ত হয় মানুষেরা। ছোটখাট আত্মপ্রত্যয়ী সেই কর্মকর্তার কথায় আবার তারা আশ্বস্ত হয়। সরিয়ে নিতে শুরু করে পুরানো চালা।
শুরু হয় নতুন ঘরের কাজ, গাড়ি গাড়ি লাল টকটকে ইট আসে। বস্তা ভর্তি সিমেন্ট, বালি, রড আর কতো কি। একটা একটা করে ইট যোগ হয়। আস্তে আস্তে দৃশ্যমান হয় পাকাঘরের দেয়াল। করিমন বেওয়া আর রাশেদুলের মা আজ আর বসে থাকে না। নিজের ঘরের ইট পাহাড়া দেয়। রাজমিস্ত্রি ছেলেটা ঠিক মতো কুর্নি দিয়ে টানছে তো ইটের কোনাগুলো এই চিন্তায় জলিল মিয়া বার বার দেখে যায়। আব্বাস আলী নিজেই পানির পাইপ হাতে নিয়ে দেয়াল ভেজাচ্ছে। কি যে হৃদয়ছোয়া দৃশ্য। মাঝে মাঝে চোখে পানি চলে আসে অফিসারটির। কখনও কখনও করিমনের রান্না ঘরে উকি দিয়ে দেখেন কি রান্না হচ্ছে। করিমন বলেন নতুন ঘরের সাথে তো পাকা রান্না ঘরও থাকবে।তখন গ্যাসের একটা চুলা কিনবে। দুচোখ আবার ঝাপসা হয়।
দেখতে দেখতে দেয়াল গুলো উচু হয়। তাতে লাল টিনের ছাদ লাগে, সামনে দৃশ্যমান হয় একটুকরা বারান্দা। করিমনের সে কি আনন্দ হয়। একদিন ডাক পরে রেজিস্ট্রি অফিসে। তুলে রাখা লাল পানপাতা শাড়িটা জড়িয়ে দকাগজ পত্র নিয়ে হাজির হয়। একদুপুরের মাঝেই একটা টিপসই দিলেই কাজ শেষ। সে নাকি জমির মালিক হয়ে গেল।দুদিন পরেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সারা দেশে উদ্বোধন করলেন মুজিববর্ষে গৃহহীন ভূমিহীন মানুষের জন্য ঘর। করিমন, আব্বাস আলী সহ দেড় শত পরিবার হাতে পেল ঘরের চাবি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আবেগ আপ্লুত হলেন করিমন, আব্বাস আলীদের অনুভূতি শুনে, চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল আনন্দঅশ্রু। সাথে ঠিক একই অনুভূতি নিয়ে চোখ মুছল সারাদেশ। জাতির পিতা স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশে ভূমিহীন গৃহহীন থাকবেনা একজন মানুষও। সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন এগিয়ে চলছে অদম্যগতিতে।
আজ আব্বাস আলীর বড় আনন্দ,করিমনের আজ দুচোখ ভরে পানি আসছে। দেশ স্বাধীনের পঞ্চাশ বছরে আজ তাদের নিজের নামে আছে পাকা বাড়ি, আছে দুই শতক জমি। কেউ তাদের আর এই বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারবে না।
আজ বড় আনন্দের দিন…..
ফাতেমাতুজ জোহরা, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, মিঠাপুকুর, রংপুর।
এম২৪নিউজ/আখতার