‘হামার ঈদ নাই, তিন মিনিটের ঝড়ে সউগ শ্যাষ হয়্যা গেইচে’

মিঠাপুকুরে কালবৈশাখীর ঝড়ে লন্ডভন্ড সহস্রাধিক বাড়িঘর, গাছপালা ও ফসল || বিদ্যুৎবিহীন অন্ধকারে গ্রামাঞ্চল || ক্ষতিগ্রস্থ্য এলাকা পরিদর্শন করেছেন- ইউএনও, উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের নেতাসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ||
কালবৈশাখী ঝড়ে লন্ডভন্ড তরফাবাহাদী মন্ডলপাড়া গ্রামের বাড়ি-ঘর।

মো: শামীম আখতার ||

‘হামার ঈদ নাই। তিন মিনিটের ঝড়ে সউগ শ্যাষ হয়্যা গেইচে। কি খায়া বাঁচমো। ঈদে পনিবারের জন্য কোন কেনাকাটা হয়নি।’ কালবৈশাখী হামার ঈদ কাড়ি নেচে বাবা। কন্নার সুরে কথাগুলো বলছিলেন তরফবাহাদী গ্রামের কৃষি দিনমজুর লুৎফর রহমান। তার ২ ছেলে মেয়ে ও স্ত্রী নুরন্নাহারকে নিয়ে সুখেই সংসার কাটছিল। কিন্তু হঠাৎ তার জীবনে অনামিষা নেমে আসে। মুহুর্তেই সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যায়। কালবৈশাখালীর ঝড়ে একটি আধাপাকা ঘর টিনের চালাসহ উড়ে গেছে।

কালবৈশাখী ঝড়ে লন্ডভন্ড তরফাবাহাদী মন্ডলপাড়া গ্রামের বাড়ি-ঘর।

রংপুরের মিঠাপুকুরে মাত্র তিন মিনিটের কালবৈশাখী ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়েছে ৪ গ্রামের বাড়িঘর, গাছপালা, ধান, ভূট্টাসহ বিভিন্ন ফসল। মঙ্গলবার (২৬ এপ্রিল) কালবৈশাখী ঝড়ে উপজেলার বড়বালা ইউনিয়নের বারোঘরিয়া, তরফবাহাদী গ্রামের দক্ষিণপাড়া, মন্ডলপাড়া, নয়াপাড়া, কেশবপুর, তরফ গঙ্গারামপুরসহ ৪ গ্রামের ওপর দিয়ে তান্ডব চালিয়েছে কালবৈশাখী।

কালবৈশাখী ঝড়ে লন্ডভন্ড তরফাবাহাদী মন্ডলপাড়া গ্রামের বাড়ি-ঘর।

প্রচন্ড বেগে বয়ে যাওয়া এই ঝড়ে বেশ কিছু এলাকার অনেক কাঁচাপাকা ঘরের টিনের চালা বাতাসে উড়ে গেছে। বিভিন্নস্থানে বিদ্যুতের তার ও খুঁটি উপড়ে গিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। বিদুৎবিহীন গোটা এলাকা অন্ধকারে নিমজ্জিত। গাছপালা ভেঙে রাস্তায় পড়ে থাকায় চলাচলের বিঘ্নসৃষ্টি হয়েছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে নিদারুণ কষ্টে দিন কাটছে হতভাগা মানুষগুলোর। ঘর নেই, থাকার জায়গা নেই। নেই খাবার।

শুক্রবার সকালে ক্ষতিগ্রস্থ্য এলাকা পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমাতুজ জোহরা।

ঘটনার দুইদিন পর শুক্রবার (২৯ এপ্রিল) ক্ষতিগ্রস্থ্য এলাকা পরিদর্শন করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমাতুজ জোহরা। এসময় তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের মাঝে ত্রান বিতরণ করেন।

এরআগে পৃথক পৃথকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ্য এলাকা পরিদর্শন করেছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও স্থানীয় এমপিপুত্র রাশেক রহমান, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জাকির হোসেন সরকার, রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মোতাহার হোসেন মন্ডল মওলাসহ স্থানীয় নেতারা। পরিদর্শনের সময় নগদ অর্থ ও খাদ্য সহায়তাও দিয়েছেন। এবং পরবর্তীতে আরও সহায়তার আম্বাস দেন তারা।

সরেজমিনে তরফবাহাদী নয়াপাড়া সহ কয়েকটি গ্রামে কালবৈশাখী ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে দুর্দশার চিত্র দেখা গেছে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের। সব হারিয়ে ঈদের আনন্দই মাটি হয়েছে ৪ গ্রামের সহস্রাধিক পরিবারের।

কালবৈশাখী ঝড়ে বাতাসের তোড়ে উড়ে যায় একটি পাকা ঘরের টিনের চালা

তরফবাহাদী দক্ষিনপাড়া গ্রামের রহিমা বেগম বলেন, মঙ্গলবার রাত নয়টার দিকে হঠাৎ ঝড় এসে আমার ঘরের টিনের চালা উড়ে যায়। পরে চালাটি আর খুজে পাওয়া যায়নি। একই কথা বলেন মন্ডলপাড়া গ্রামের রাজ্জাক ও বাবু মিয়া। প্রচন্ড বাতাসের তোড়ে তাদেরও ঘরের চালা উড়ে যায়।

নয়াপাড়া গ্রামের কৃষকক নুরনবী মিয়া বলেন, কিছুদিন আগে আমার বাড়ি-ঘরের কাজ শেষ হয়েছে। এই ঝড়ে তিনটি নতুন ঘর তছতছ করে দিয়েছে। গাছপালা সব ভেঙ্গে পড়েছে। পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে আছি।

একই গ্রামের গৃহীনী পারুল বেগম বলেন, ঝড়ে ঘরের টিনের চালা উড়ে যায়। সারারাত খাটের নিচে কাটিয়েছি। না খেয়েই রোজা করেছি।

কালবৈশাখী ঝড়ে রাস্তায় বড় বড় গাছ পড়ে চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

তরফবাহাদী গ্রামের নাজির মিয়া বলেন, ১ বিঘা জমিতে ভূট্টা চাষ করেছি। হঠাৎ ঝড়ে ভূট্টা গাছগুলো ভেঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। কি করবো ভেবে পাচ্ছিনা।

মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমাতুজ জোহরা বলেন, ‘কালবৈশাখীর ঝড়ে উপজেলার সীমান্ত এলাকা বড়বালা ইউনিয়নের বেশ ক’টি গ্রামের বাড়িঘর ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। থাকার জায়গা হারিয়েছে অনেক পরিবার। ঘরে খাবার নেই। ক্ষতিগ্রস্থ্য মানুষেরা ঈদের কেনাকাটা করতে পারছেনা। শুক্রবার উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্থ্য পরিবারের মাঝে যথাসাধ্য সহযোগিতা করা হয়েছে।’

কালবৈশাখী ঝড়ে দুমড়েমুচড়ে পড়ে আছে একটি কাঁঠাল গাছ

এম২৪নিউজ/আখতার

Leave a Reply