
স্টাফ রিপোর্টার:
মিঠাপুকুরের বলদীপুকুর আদিবাসী পাড়ার বাসিন্দা কার্মিলা মিনজি (৫০)। প্রতিবন্ধি স্বামী ও ৩ সন্তানকে নিয়ে তাঁর সংসার। বড় মেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় শেষ করেছে। মঝো মেয়ে স্থানীয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণী ও ছোট ছেলে তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র। গোটা পরিবারের ভরন-পোষণ সবকিছু কার্মিলা মিনজির শ্রমের উপর নির্ভরশীল। প্রতিদিন সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত কৃষিশ্রম দিয়েও অভাব অনটন পিছু ছাড়ছেনা তাঁর। বছরের বেশিভাগ সময় কাজ পাননা কার্মিলা মিনজি। তখন স্বল্প মূল্যে শ্রম দিতে হয় স্থানীয় কষিকাজে। এছাড়াও, রয়েছে পুরুষের তুলনায় নারীদের শ্রমের মূল্যের ফারাক। এমন পরিস্থিতি শুধু কার্মিলা মিনজি’র নয়। ওই এলাকায় সকল আদিবাসী নারী শ্রমিকদের দশা প্রায় একই। তারপরও বাধ্য হয়ে বৈষম্যমূলক আচরণ মেনে শ্রম দিচ্ছেন আদিবাসী নারীরা।

উপজেলার রাণীপুকুর ইউনিয়নের বলদীপুকুর এলাকায় প্রায় হাজার দু’য়েক ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীর বসবাস। কৃষি কাজ ও শ্রম দিয়ে চলে তাদের সংসার। সরেজমিনে বলদীপুকুর মাজার এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, একটি সবজি ক্ষেতে কাজ করছিলেন ১২ জন আদিবাসী নারী শ্রমিক। এসময় কথা হয় বলদীপুকুর মিস্ত্রিপাড়ার ভারতী কুজুরের সাথে। তিনি বলন, ‘হামার জমি নাই। মানুষের জমিত কাজ করি খাই। এখন মজুরির দাম নাই। বিকালে এই ক্ষ্যাতোত আসছি, ঘন্টায় ২০ ট্যাকা (টাকা) ধরি ৩ ঘন্টায় ৬০ ট্যাকা পাম।’ আরেকজন আদিবাসী নারী শ্রমিক সূচিত্রা খালকো বলেন, ‘হামার মজুরির দাম নাই। পুরুষ ৪০০-৫০০ ট্যাকা হইলে, হামার ২০০-২৫০ ট্যাকা। হামরা নারী হওয়ার কারণে দাম কম।’
মহামারী করোনার কারণে কমেছে কাজের ক্ষেত্র। সেই সাথে কমে গেছে শ্রমের মূল্য। আদিবাসী নারীরা এখন বেশিরভাগ সময় স্বল্প মূল্যে খন্ডকালীন কাজ করছেন। বিকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত (৩ ঘটা) কাজ করে পান ৬০ টাকা। ঝর্ণা লাকড়া তাদর মধ্যে একজন। তাঁর বড় মেয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থী অলি পাহান বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় ঢাকায় পোষাক তৈরীর কারখানায় কাজ করছে। ঝর্ণা লাকড়া বলেন, ‘পুরুষের তুলনায় নারীদের মজুরি কম। করোনার সময় এলাকায় কাজ পাওয়া যাচ্ছেনা। স্কুল বন্ধ থাকায় গার্মেন্টে কাজে গেছে আমার মেয়ে’।
উপজেলা নির্বাহি অফিসারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী মিঠাপুকুরের ১৭ ইউনিয়নে ১৭ হাজার ৮শ ৯৭ জন ক্ষুদ্র নতাত্ত্বিক গোষ্ঠির লাকজন বাস করছে। এরমধ্যে রাণীপুকুর, দূর্গাপুর ও বড় হযরতপুর ইউনিয়নে তাদের সংখ্যা বেশি।
মিঠাপুকুর উপজেলা আদিবাসী উন্নয়ন সংগঠনের সভাপতি মোহন লাল কুজুর বলন, কৃষি উন্নয়নে অবদান বাড়ছে আদিবাসী নারীদের। কৃষি বিষয়ক বিভিন্ন কর্মশালায় আদিবাসী নারীদের কৃষি শ্রমিক হিসেবে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদানসহ ন্যয্য মজুরী নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।
প্রচার সম্পাদক বাবুলাল মার্ডি বলন, ‘আদিবাসীরা নানা সমস্যায় জর্জরিত। আদিবাসী নারীরা শ্রমের মুল্য কম পাচ্ছে। এছাড়াও স্বাস্থ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানসহ মৌলিক অধিকার হতে বঞ্চিত হচ্ছে তারা।’ এসআইএল ইটারন্যাশনাল বাংলাদেশের এরিয়া ম্যানেজার রনজিত কেরকাটা বলেন, বংশ পরম্পরায় কৃষিকাজ করেন আদিবাসী নারীরা। প্রধান পেশা হিসেবে কৃষি কাজকে বেছে নিয়েছেন তারা।

উপজেলা কৃষি অফিসার আনোয়ার হোসেন বলেন, নারী শ্রমিকরা মজুরীর মূল্য কম পায় শুনেছি। মূলত. নারী শ্রমিকরা অল্প টাকায় কাজ করতে রাজি হয়ে যায়। এ সুযোগটাই কাজে লাগান গ্রোয়ার্সরা। সরকারী-বেসরকারী বিভিন্ন প্রশিক্ষণে আদিবাসী নারী শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়। প্রশিক্ষণসহ কৃষি বিষয়ক বিভিন্ন কর্মশালায় অংশ নেন তারা।
উপজেলা নির্বাহি অফিসার ফাতেমাতুজ জোহরা বলেন, ‘তাদের (আদিবাসী) প্রধানমন্ত্রী উপহারের ৫০ টি ঘর দেওয়া হয়েছে। মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপ-বৃত্তি প্রদান করছে সরকার। এছাড়াও, নানাবিধ সাহায্য-সহযোগীতা অব্যাহত রয়েছে।’ পুরুষের তুলনায় আদিবাসী নারী শ্রমিকরা কম মূল্য পাওয়ার বিষয় তিনি বলেন, ‘নারী-পুরুষ সমান মুল্য পাওয়ার কথা। নারীদের শ্রমের মূল্য কম, বিষয়টি আমার জানা নেই।’
এম২৪নিউজ/আখতার/সবুজ