
স্টাফ রিপোর্টার:
বেগম রোকেয়ার মৃত্যুর প্রায় শত বছর হলেও তার মরদেহ ভারত থেকে দেশে আনা সম্ভব হয়নি। মরদেহ আনার দাবি দীর্ঘ দিন ধরে জানিয়ে আসছেন রংপুর বাসী। স্থানীয়রা সহ রোকেয়া প্রেমীদের প্রত্যাশা রোকেয়ার মরদেহ পায়রাবন্দের মাটিতে যেন আবারো সমাহিত করা হয়। কিন্তু কলকাতা থেকে পায়রাবন্দে রোকেয়ার দেহাবশেষ আনার উদ্যোগটিও দীর্ঘদিন ধরে ফাইলবন্দী।
আজ ৯ ডিসেম্বর নারী জাগরণের অগ্রদূত মহিয়সী রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ১৪৩তম জন্মবার্ষিকী ও ৯২তম প্রয়াণ দিবস। দিবসটি ঘিরে মিঠাপুকুরের পায়রা বন্দে রংপুর জেলা প্রশাসন তিনদিন ব্যাপী কর্মসূচি গ্রহন করেছে রংপুরের জেলা প্রশাসন। মিলাদ মাহফিল, পুস্পমাল্য অর্পন, জাতীয় পতাকা উত্তোলন, মেলা সহ নানান কর্মসূচী।
নারীর পরাধীনতার বিরুদ্ধে তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম নারীর যে অগ্রগতি হয়েছিল তার পেছনে রোকেয়ার দর্শন ও কর্মময় জীবন অন্তহীন প্রেরণার উৎস কাজ করছে। তার দেখানো পথে হেঁটে নারীরা আজ বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও পথপ্রদর্শকের জন্মস্থান রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দে নির্মিত স্মৃতিকেন্দ্রটি এখন ভবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
পায়রাবন্দে গিয়ে দেখাগেছে, দর্শনার্থীরা রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র ঘুরতে এসে দেখে রোকেয়া সম্পর্কিত তেমন কিছুই নেই।সংরক্ষণের অভাবে রোকেয়ার জন্মস্থানের ধ্বংসাবশেষ ক্রমেই মাটির সাথে বিলিন হতে চলছে। একটি জানালা ও কয়েকটি পিলার এখন পর্যন্ত মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। রোকেয়া কেন্দ্রের জমি নিয়ে চলছে বিরোধ। স্মৃতিকেন্দ্রের প্রায় রুমের জানালার কাঁচ ভাঙ। সংগ্রহ শালার ধূলিমলিন কাচের আলমারিগুলোতে কখনোই কোনো স্মারক রাখা হয়নি।রুমের দেয়ালে পড়ে আছে শ্যাওলা। ভেতরের জিনিসপত্র এবং আসবাব পত্র সহ বিভিন্ন উপকরণ নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। পাঠাগারে প্রায় ছিঁড়ে যাওয়া একটি রোকেয়া রচনাবলীর দেখা মিলেছে। গবেষণাকক্ষের বেহাল দশা প্রায় দুই যুগে কোনো গবেষণা আলোর মুখ দেখেনি।
দর্শনার্থী আরোজা বেগম বলেন, নারী জাগরণের অগ্রদূত রোকেয়ার স্মৃতিকেন্দ্রে রোকেয়ার একটি ভাস্কর্য ছাড়া দেখার কিছুই নেই। এখানকার লাইব্রেরিতে রোকেয়া সম্পর্কিত পর্যাপ্ত গ্রন্থ নেই। নতুন প্রজন্মকে রোকেয়াকে নিয়ে জানানোর কিছুই নাই।রোকেয়াকে জানার যে আগ্রহে পায়রাবন্দে যে প্রত্যাশা নিয়ে মানুষ ছুটে যায় তা পূরণ করতে হলে রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র আরো সৃজনশীলভাবে গড়ে তোলা দরকার। তিনি দাবি করেছেন, রোকেয়ার দেহবশেষ ভারত থেকে জন্মভূমিতে নিয়ে আসার।
জানাগেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে ১৯৯৭ সালের ২৮ জুন ৩ একর ১৫ শতক জমির উপর রোকেয়ার বসতভিটা রংপুরের পায়রাবন্দে বেগম রোকেয়া গবেষণা ও স্মৃতিকেন্দ্রের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। ২০০১ সালে ১ জুলাই তিনি স্মৃতিকেন্দ্র উদ্বোধন করেন। স্মৃতিকেন্দ্রটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকলেও ২০০৪ সালের ৪ অক্টোবর দায়িত্ব নেয় বাংলা একাডেমি।কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিলো বেগম রোকেয়ার জীবন ও কর্ম সম্পর্কে গবেষণা, তার গ্রন্থাবলির অনুবাদ, প্রচার ও প্রকাশনা, সংস্কৃতি চর্চা এবং স্থানীয় যুবক-যুবতীদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া।
দীর্ঘ ৫ বছর বন্ধ থাকার পর অবশেষে ২০১৮ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে চালু করা হয় রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রটি।একজন কর্মকর্তা একজন সহকারী লাইব্রেরিয়ান নিয়োগ দেওয়া ছাড়া আর কিছুই হয়নি এ সময়টাতে। লাইব্রেরি আছে একটা বই নেই। বেগম রোকেয়াকে নিয়ে গবেষণা করার কোন উদ্যোগ ও ব্যবস্থা নেই। সহায়-সম্বলহীন নারীদের সেলাই প্রশিক্ষণের জন্য যে মেশিনগুলো ছিল সবগুলোই বিকল হয়ে পড়েছে। গত ৫ বছর ধরে দুই কর্মকর্তা-কর্মচারী ও একজন গার্ড কোনও কাজকর্ম ছাড়াই অলস দিন কাটাচ্ছেন।
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেছেন, রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে একীভূত করে নারীদের অতীত-বর্তমান, সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কেন্দ্র হতে পারে। সে সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে রোকেয়া স্ট্যাডিজ বাধ্যতামুলক করা দরকার।
এ ব্যাপারে রোকেয়া গবেষক ড. শাশ্বত ভট্টাচার্য বলেন, ‘নারী জাগরণের অগ্রদূত মহীয়সী বেগম রোকেয়া জন্ম গ্রহণ করেছিলেন রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে। ক্ষণজন্মা রোকেয়া নারী জাতির জন্য যে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন তার কারণেই নারীরা এখন শিক্ষাদীক্ষা, রাজনীতি, ব্যবসাসহ বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়েছে। পুরুষদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিযোগিতা করে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করছে।
বেগম রোকেয়ার স্মৃতিকে জাগরূক করার কোনও উদ্যোগ না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শুধু ৯ ডিসেম্বর আসলেই মাতামাতি করলে চলবে না। তার স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য চাই বাস্তব উদ্যোগ। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর হস্থক্ষেপ পারে সকল সমস্যার সমাধান দিতে। এটাই মনে করেন বিশিষ্টজনরা।
পায়রাবন্দ রোকেয়া স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল বলেন, ৯ ডিসেম্বর এলেই এখানে ঘষামাজার কাজ শুরু হয়। নানা আয়োজন হয় রোকেয়াকে নিয়ে। আবারো রোকেয়া ১ বছরের জন্য হারিয়ে যায়। রোকেয়া যেন হারিয়ে না যায়, এজন্য বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রটি পুরোপুরি চালু রাখা প্রয়োজন।
মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ শাহরিয়ার রহমান বলেন, রোকেয়ার মরদেহ ভারত থেকে আনার ব্যাপারে কার্যক্রম চালু রয়েছে। এছাড়া পায়রা বন্দে তিনদিন ব্যাপী নানান কর্মসূচী পালন করা হবে।
বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের ইনচার্জ হাবিব করিম মুন্না বলেন, প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়েছে। স্মৃতিকেন্দ্র সমৃদ্ধ করতে আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। কয়েকটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
রংপুরের জেলা প্রশাসক মোবাশ্ববের হাসান বলেছেন, রক্ষনাবেক্ষণ কিংবা বিভিন্ন দিকগুলো বাস্তবতার আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এম২৪নিউজ/আখতার