
স্টাফ রিপোর্টার (রংপুর):
রংপুর জেলা পরিষদের অহংকার ক্যাম্পাসের দেবদারুসহ অর্ধশতাধিক প্রাচীন গাছ ঝুঁকিপূর্ণ ও পোকায় খাওয়ার নাম করে জীবন্ত গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এসব গাছে নিরাপদে বাসা বাঁধা হাজার হাজার পাখ-পাখালি। পাখিদের অভয়ারণ্য এমন একটা সাইনবোর্ডও লাগানো ছিল।
জেলার মানুষসহ দূর-দুরান্তর থেকে এমনকি বিদেশিরাও এখানে শেষ বিকালে বা সন্ধ্যায় পাখি দেখতে ও পাখির ডাক শুনতে আসতেন। সাইনবোর্ডটি এখন নেই। কবে সরানো হয়েছে কেউ জানে না।
অভিযোগ উঠেছে,গাছগুলো কেটে অভয়ারণ্য নিমিষেই বিনষ্ট করে ফেলেছেন জেলা পরিষদের কর্মকর্তারা। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে জেলা পরিষদের প্রবেশ মুখ থেকে ভবন যাওয়ার পথ প্রশস্তের নামে কেটে ফেলেছেন অর্ধশতাধিক প্রাচীন বৃক্ষ।
মহানগরবাসীর দাবি, এসব গাছের বয়স প্রায় শত বছর। এদিকে গাছ কাটার উৎসবে উড়াল দিয়েছে পাখিদের দল।
রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রভাষক পরিবেশপ্রেমী ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেছেন, মুজিববর্ষ উপলক্ষে সরকারের রয়েছে সারা দেশে এক কোটি গাছ লাগানোর মহাপরিকল্পনা। প্রতিটি জেলায় এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে। সেখানে রংপুর জেলা পরিষদের মতো স্থানীয় সরকারের নিজস্ব ক্যাম্পাসে প্রাচীন গাছ আর পাখ-পাখালির আবাস। সেখানে স্থানীয় সরকারের একটি সংস্থার এভাবে শতবর্ষী গাছ কেটে সাবাড় করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের প্রতি আবেদন জানান তিনি। গাড়ির ঢোকার রাস্তা বড় করার জন্য কেটে নষ্ট করা কতটা যুক্তিযুক্ত হয়েছে তা বিবেচনার দাবি রাখে।
রংপুরের মানবাধিকার ও পরিবেশ উন্নয়নকর্মী মুনীর চৌধুরী বলেন, পাখিদের অভয়াশ্রম হিসেবে খ্যাত জেলা পরিষদের গাছ কেটে সাবাড় করে দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। কার নির্দেশে গাছ কেটে ফেলা হলো তা বের করা দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নগরবাসীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান ও সরেজমিন দেখা গেছে, জেলা পরিষদ কার্যালয়ের প্রধান ফটকের লাগোয়া দু’ধারে লাগানো প্রাচীন গাছগুলো ছিল সুউচ্চ এবং শাখা প্রশাখায় পরিপূর্ণ। এসব গাছে থাকতো হাজার হাজার পাখি। কিন্তু জেলা পরিষদের প্রবেশ পথ প্রশস্ত করার নামে মূল পথটির দু’ধারে এবং প্রাচীরের পাশে থাকা এমন অর্ধশতাধিক শতবর্ষী বা প্রাচীন গাছ গোপনে নিলাম করে বিক্রি করে দিয়েছে জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ। এখন গাছগুলো কেটে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। পুরো বিষয়টিতে ছিল কঠোর গোপনীয়তা। প্রাচীন এসব গাছ কাটার বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাওয়ায় পরিবেশবিদসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
বাগানে গিয়ে দেখা গেছে, বাগানের গাছে গাছে ডালে যে পাখির কলরব দেখা যেত তা এখন থেমে গেছে। এখানে অনেক বিরল প্রজাতির পাখি এই অভয়াশ্রম ত্যাগ করে চলে গেছে। গাছে বানানো পাখির বাসাগুলো ভেঙে গেছে। সেখান থেকে পাখির ছানা পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো ধরে নিয়ে যাচ্ছে স্থানীয়রা।
রংপুর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হুদা সাংবাদিকদের কাছে তিনি গাছ কাটার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, সঠিক সিদ্ধান্ত ও আইন অনুযায়ী গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ও পোকা খাওয়া কিছু দেবদারু গাছ কাটা হয়েছে। এটা পরিষদের সিদ্ধান্ত তারাই গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। টেন্ডার আহ্বান করে সর্বোচ্চ দরদাতাকে কাজটি দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এই গাছগুলোকে ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জেলা পরিষদের প্রবেশ পথ সম্প্রসারণের প্রয়োজনে গাছগুলো কাটতে হয়েছে।
উল্লেখ্য,রংপুর জেলা পরিষদ দেশের সবচেয়ে প্রাচীন স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর একটি। ব্রিটিশ আমলে ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে রংপুর জেলা বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানটির অফিস ও চত্বর নির্ধারণ হয় এর পরেই। পরবর্তীতে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের শাসনামলে প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের কারণে জেলা পরিষদ হিসেবে এর নামকরণ হয় বলে জানা গেছে।
এম২৪নিউজ/আখতার