
অনলাইন ডেস্ক:
নোয়াখালী জেলার সুবর্ণচর উপজেলার চরজব্বার ইউনিয়নের জাহাজমারা গ্রামে গত ৭ অক্টোবর নুরজাহান নামে এক বিধবা নারীকে (৫৮) হত্যা করার পর তার দেহকে পাঁচ টুকরো করে বাড়ির পাশে ধান ক্ষেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখে তার ছেলে। এ জঘন্য অপরাধে তাকে সহযোগিতা করে মামাতো ভাই, মামাতো ভগ্নিপতি ও বন্ধুসহ সাতজন।
এ ঘটনার রহস্য উদঘাটন এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত নিহতের ছেলে হুমায়ুন কবির, বন্ধু নিরব, মামাতে ভাই কালাম ওরপে মামুন,মামাতো ভগ্নিপতি মিলাদ হোসেন সুমন ও নুরুল ইসলাম কসাইসহ পাঁচ জনকে গ্রেফতার করে করেছে পুলিশ।
অন্য আসামি ইসমাইল ও হামিদ পলাতক রয়েছে। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার বিকালে হুমায়ুন কবির ও মিলাদ হোসেন সুমন জেলার সিনিয়র জুডিশিয়ার ম্যজিট্রেট এএসএম মোসলেহ উদ্দিন মিজানের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদন করে। পরে আদালত তাদেরকে কারাগারে প্রেরণ করেন। কালাম স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করতে অস্বীকার করায় আদালতে ৫ দিনে রিমান্ডের আবেদন করে জেলা ডিবি পুলিশ। আদালত আগামী রবিবার রিমান্ড শুনানির দিন ধার্য করে। এর আগে মঙ্গলবার ও বুধবার নিরব ও কসাই নুরুল ইসলামকে গ্রেফতার করার পর বুধবার বিকালে তারাও আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। আদালত সংক্রান্ত এ তথ্য জানিয়েছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা ডিবির পরিদর্শক মো. জাকির হোসেন।
এদিকে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১টায় জেলার পুলিশ সুপারের সভাকক্ষে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন এ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নৃশংস এ হত্যার পরদিন তার ছেলে হুমায়ুন কবির (২৮) বাদী হয়ে চরজব্বার থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার সূত্র ধরে পুলিশ তদন্তে নামলে হত্যার সাথে সরাসরি ছেলের জড়িত থাকার বিষয়টি উঠে আসে। একইসাথে তার সাথে তার ৬ সহযোগী মিলে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এমনটাই নিশ্চিত হয় পুলিশ। ইতিমধ্যে ৭ আসামির মধ্যে হুমায়ুনসহ ৫ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এর মধ্যে দুইজন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। একই সাথে গ্রেফতারকৃত হুমায়ুনের ছেলের বন্ধু নিরব(২৬) ও কসাই নুর ইসলামের (৩৮) স্বীকারোক্তি অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ধারালো চাপাতি, বালিশ, কোদাল, ভিকটিমের ব্যবহৃত কাপড় উদ্ধার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতদের স্বীকারোক্তির তথ্য দিয়ে পুলিশের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, নূর জাহানের আগের ঘরের সন্তান বেলাল ৪ লাখ টাকা ঋণ করে মারা যান। ওই ঋণের টাকা পরিশোধ নিয়ে নূর জাহানের সঙ্গে তার বর্তমান স্বামীর ঘরের সন্তান হুমায়ুন কবিরের প্রায়শই ঝগড়া হয়। তারই জের ধরে হুমায়ুন তার ছয় সহযোগীকে সাথে নিয়ে গত ৬ অক্টোবর রাতে তার মাকে প্রথমে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করে। পরে তার মরদেহকে টুকরো করে পাওনাদারের ধান ক্ষেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখে।
পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন সাংবাদিকদের জানান, নিহত নারীর ছেলে তার সহযোগীদের নিয়ে পূর্ব পরিকল্পনা করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। আগের সংসারের ছেলে বেলাল তার মা নুরজাহানকে জিম্মায় রেখে এলাকার বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে ৪ লাখ টাকা সুদের ওপর ঋণ নেয়। ঋণ রেখে দেড় বছর আগে বেলাল মারা যায়। এরপর বেলালের ঋণের টাকা পরিশোধ করার জন্য তার পরের সংসারের ভাই হুমায়ুনকে পাওনাদাররা চাপ দিতে থাকে। হুমায়ুন তার মাকে এ বিষয়ে অবহিত করে। নুরজাহান ছেলে হুমায়ুনকে তার ১৩ শতক জমি বিক্রি করে এ ঋণ পরিশোধ করার জন্য বলে। অন্যদিকে মায়ের মালিকানাধীন ১৪ শতক ও বেলালের স্ত্রীর মালিকানাধীন ১০ শতক জমি বিক্রি করে বেলালের ঋণ পরিশোধের জন্য চাপ দেয় হুমায়ুন। এতে করে তার মা অসম্মতি জানায়। অপরদিকে হুমায়ুন তার মায়ের আরেক ভাই দুলালের কাছে ৬২ হাজার ৫০০ টাকা পাওনা ছিল। পাওনা টাকা পরিশোধ করার জন্য মা তার ভাইকে প্রায় চাপ প্রয়োগ করত। এ কারণে হুমায়ুনের মামাতো ভাই কালাম(২৬) ও মামাতো বোনের স্বামী সুমন (২৬) ওই নারীর ওপর বেজায় রুষ্ট ছিল। এ ছাড়াও বেলালের জমির প্রতি নিহত নারীর বাড়ির পাশের প্রতিবেশী ইসমাইল ও হামিদের লোভ ছিল। তাই তারাও হুমায়ুনকে এই হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করে।
তিনি আরও জানান, হুমায়ুন জবানবন্দিতে জানান, বেলালের স্ত্রীর জমি থেকে ২ শতাংশ হামিদকে এবং বাকী ৮শতাংশ ইসমাইলকে দেওয়া হবে বলে মৌখিকভাবে হুমায়ুন সিদ্ধান্ত করে। এরপর মায়ের জমি সমান ৫ভাগে ভাগ করে হুমায়ুন, নোমান, সুমন, কালাম ও কসাই নুর ইসলামকে দেওয়া হবে। এ প্রতিশ্রুতিতে এক হয়ে আসামিরা ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় বাড়ির পাশে একটি ব্রিজের ওপর বসে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করে। পরে হুমায়ুন, কালাম, সুমন ও অন্যান্য আসামিদের সহযোগিতায় ওই রাতের কোন এক সময়ে ঘরের মধ্যে বালিশ চাপা দিয়ে নুরজাহানকে হত্যা করে। পরে তারা বটি, চাপাতি, কোদাল দিয়ে পাঁচখণ্ড করে পাওনাদারদের ধান ক্ষেতে শরীরের ৫ টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখে। নিহত নুরজাহান বেগম মৃত আবদুল বারেকের স্ত্রী।
প্রসঙ্গত; গত ৭ অক্টোবর বিকেলে ও পরদিন পুলিশ উপজেলার উত্তর জাহাজ মারা গ্রামের একটি ধান ক্ষেত থেকে ওই নারীর পাঁচ টুকরো টুকরো মরদেহের উদ্ধার করে। এর আগে ছেলে হুমায়ুন কবির জানিয়েছিল, ওই দিন ভোর থেকে তার মা নিখোঁজ ছিল। পরে স্থানীয় এক নারী বিকেলে ধানক্ষেতের শামুক খুঁজতে এসে একটি টুকরো টুকরো মরদেহ দেখতে পান। পরে হুমায়ন ঘটনাস্থলে গিয়ে তার মায়ের মরদেহ শনাক্ত করে। এ ঘটনায় সে ওইদিন রাতে চরজব্বার থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যা মামরা দায়ের করে। ইত্তেফাক অনলাইন
এম২৪নিউজ/আখতার