
রংপুর করোনা হাসাপাতালে আইসিইউ করোনা সংক্রোমনের রোগী দিয়ে পূর্ণ।।
রংপুর অফিস:
রংপুর করোনা ডেডিকেটেড আইসোলেশন হাসপাতালটির আইসিইউতে কোনো বেড ফাঁকা নেই।রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় দেড় কোটির বেশি মানুষের জন্য আইসিইউ বেড রয়েছে মাত্র ৪৬টি। এর মধ্যে রংপুর ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতালে ১০টি (সচল ৮টি), রমেক হাসপাতালে ২০টি, দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছে ১৬টি বেড।এসব হাসপাতালে করোনার প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিকেই শয্যা বৃদ্ধির কথা থাকলেও তা আর হয়নি।
বর্তমানে রংপুর ও দিনাজপুর ছাড়া বিভাগে বাকি ছয় জেলা কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, নীলফামারী, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলার কোনো হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা নেই। রংপুরে করোনাভাইরাসে প্রতিদিনই বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার। বিভাগে করোনায় সর্বোচ্চ ১৪ জনের মৃত্যুর দিনে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নতুন করোনা ইউনিট চালু করা হয়েছে।
আজ শনিবার দুপুরে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ৩০ নং ওয়ার্ডে ৩০ শয্যাবিশিষ্ট এ নতুন করোনা ইউনিট চালু করা হয়। এতথ্য নিশ্চিত করেছেন জেলা সিভিল সার্জন ডা.হিরম্ব কুমার রায়।
তিনি জানান,করোনা রোগীদের জন্য বিশেষায়িত রংপুর ডেডিকেটেড করোনা আইসোলেশন হাসপাতালে শয্যা ফাঁকা না থাকায় নতুন এই করোনা ইউনিটটি চালু করা হয়।এ ইউনিটে আইসিইউ সুবিধা না থাকলেও সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা থাকবে।আর রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসকরা এ ইউনিটে দায়িত্ব পালন করবে।
রংপুর ডেডিকেটেড করোনা আইসোলেশন হাসপাতালের ইনচার্জ এস এম নুরুন্নবী জানান,শনিবার দুপুর পর্যন্ত এ হাসপাতালে ৯৩ জন রোগী ভর্তি আছেন। কিন্ত আইসিইউতে বেড ফাঁকা নেই বলেও জানান তিনি।
রংপুর বিভাগে প্রতি দিনই বাড়ছে করোনা রোগীর সংখ্যা। গতকাল শুক্রবার সন্ধায় রংপুর করোনা ডেডিকেটেড আইসোলেশন হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডাঃ নুরুননবী তার ফেসবুক পোস্টে বেড সম্পর্কিত তথ্য দিয়ে বিকল্প রোগী ভর্তির ব্যবস্থা করার দাবি জানান। এদিকে রংপুর করোনা হাসপাতালের একটি সূত্র জানিয়েছে, ওই হাসপাতালটি মূলত ছিল শিশু হাসপাতাল। সেখানে সব বেডেই অক্সিজেন পোর্ট নেই। ফলে নতুন করে বেড বাড়ানো সম্ভব নয়।
ডাঃ নুরুননবী তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ১০০ শয্যা (আটটি আইসিইউ শয্যাসহ) রংপুর ডেডিকেটেড করোনা আইসোলেশন হাসপাতালে আজ ৮৫ জন রোগী ভর্তি আছে। দৈনিক গড়ে ১২ জন রোগী ভর্তি হচ্ছে। ভর্তি না কমলে আগামী দু’একদিনের মধ্যে রোগী ভর্তি করানোর মতো কোনো শয্যা খালী থাকবে না। সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি অনুরোধ করছি খুব দ্রæত রোগী ভর্তির বিকল্প ব্যবস্থ্যা করার জন্য। লকডাউন সফল করুন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন, করোনা প্রতিরোধে অবদান রাখুন, প্রিয়জনদের অকাল মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করুন।
করোনা হাসপাতালের চিকিৎসক ডা: নুর-ই-সাবা আশা একটি পোস্ট করেন তার আইডিতে পোস্ট এ তিনি লেখেন ‘জুলাই তো সবে শুরু। আজ এমন অবস্থা রোগী ভর্তি নেবার মতো আর সামর্থ্য নেই। সিটি করর্পোরেশনের আওতায় কোভিড পজিটিভ রোগীদের টেলিমেডিসিনে এমন রোগীদের বাসায় চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে যাদের আগে আমরা হাসপাতালে ভর্তি করাতাম। বিশেষ করে যাদের কো-মরবিডিটি আছে তাদের। এবার বাসাতেই চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে, পরীক্ষা করিয়ে হোয়াটসআপ, মেসেঞ্জারে রিপোর্ট দেখছি।তিনি লেখেন, ‘এই মুহূর্তে আমার টেলিমেডিসিন রোগীর সংখ্যা প্রায় ৪০। তার মধ্যে আট থেকে ১০ জনের হাসপাতালে ভর্তির ইঙ্গিত আছে। অনেকেই বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন, কারো পরিবারে ডাক্তার আছে বা বাসাতেই বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ স্যারের পরামর্শ নিচ্ছেন। আমার মতো ডেডিকেটেড করোনা আইসোলেশন হাসপাতালের ৩৫ থেকে ৪০ জন চিকিৎসক টেলিমেডিসিন সেবা দিচ্ছেন। যারা হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন ডিউটি শেষে। হাসপাতাল ১০০ শয্যা হলেও আমাদের অক্সিজেন পোর্ট কিন্তু ১০০ নয়। আরো প্রয়োজন। তারপরেও আমাদের হাসপাতালের এই অবস্থা। চিকিৎসক, নার্স ও ডেডিকেটেড ওয়ার্ডবয়, ক্লিনারের অপ্রতুলতা রয়েছে। গত কয়েক দিন থেকে এখানকার প্রত্যেক চিকিৎসকের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
গত বছরের ১৯ এপ্রিল থেকে তিন তলাবিশিষ্ট ১০০ শয্যার নবনির্মিত রংপুর শিশু হাসপাতালটিকে দুর্যোগময় এ সময়ে ডেডিকেটেড করোনা আইসোলেশন হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। রংপুর শিশু হাসপাতালটি নির্মাণের পর দীর্ঘদিন ধরে উদ্বোধনের অপেক্ষায় ছিল।মহামারি করোনাক্রান্তিতে এখন এটি ডেডিকেটেড করোনা আইসোলেশন হাসপাতাল। প্রথম ধাপে এই হাসপাতালে ১০টি আইসিইউ বেড ও ১০টি ভেন্টিলেটর দিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়। উদ্বোধনকালে বলা হয়েছিল, পর্যায়ক্রমে তা ৫০ এ উন্নীত করা হবে। কিন্ত গত এক বছরেও হাসপাতালটিতে আর আইসিইউ বেড বাড়ানো হয়নি। বরং দুটি ভেন্টিলেটর অচল হয়ে পড়ে আছে। সব ধরনের সুযোগসুবিধা সম্বলিত এ আইসোলেশন হাসপাতালে চিকিৎসকদের জন্য দুটি ও নার্সদের জন্য একটি আবাসিক কোয়ার্টার রয়েছে। চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালনে থাকা সকলে আন্তরিক হলেও দুর্ভোগ বেড়েছে রোগী ভর্তির চাপ বাড়ায়। হাসপাতালটি রোগীদের গ্রিন জোন, রেড জোন সহ পৃথক-পৃথক জোন রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
গতকাল শুক্রবার সন্ধায় হাসপাতালটির তত্বাবধায়ক ডাঃ নুরুননবী জানান, বিকল্পভাবে রোগী ভর্তির ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিতে হবে এখনই। সরঞ্জামাদি, চিকিৎসক ও কর্মী বাড়ানো না গেলে পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাবে না।এরই মধ্যে রংপুর করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালের সামনে সাইনবোর্ড ঝুঁলিয়ে দিয়ে লেখা হয়েছে ‘আইসিইউতে কোনো বেড ফাঁকা নাই’।
রংপুর বিভাগে গত কয়েক দিন ধরেই বাড়ছে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) নেয়া প্রয়োজন এমন রোগী।
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) আবু মোহাম্মদ জাকিরুল ইসলাম জানান, রংপুর বিভাগে করোনা সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। সংক্রমণের হার ৪০ শতাংশের বেশি। শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত পর্যন্ত এ বিভাগে ৫৫১ জন। মৃত্যু হয়েছে। এতে ২৭ হাজার ৬৯২ জন শনাক্ত হয়েছেন ।তিনি বলেন, এই অবস্থায় প্রতিদিনই নতুন নতুন রোগীকে আইসিইউতে নেয়ার প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে। অনেক রোগী হাসপাতাল গুলোতে আসছেন। আইসিইউ বেডের সঙ্কটের কারণে কোথাও কোথাও চিকিৎসা দিতে সমস্যা হচ্ছে।তিনি আরো বলেন, আমরা আইসিইউ বেড সংখ্যা বাড়ানোসহ করোনা রোগীদের চিকিৎসার সব সুযোগ সুবিধার জন্য কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।
জানাগেছে,স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে বহুবার আশ্বাস দেওয়া হলে আইসিইউ বেড স্থাপনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দ্বিতীয় দফায় দেশে করোনার বিস্তার অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেলে নড়েচড়ে বসে স্বাস্থ্য বিভাগ। কিন্তু সংকট সমাধানে কোনো কার্যক্রম না করার আগেই করোনার তৃতীয় ঢেউয়ে বেশামাল হয়ে উঠেছে পুরো রংপুর বিভাগ।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, রংপুর করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল গুলোতে কোনো আইসিইউ শয্যা খালি নেই। এখানে যে ভেন্টিলেটর সুবিধা সংবলিত আটটি বেড আছে সবগুলোই পূর্ণ। এই হাসাপাতালে ১০০টি বেডের মধ্যে ৮৫টি বেড পূর্ণ। তাদের মধ্যেই অন্তত ২০ জনকে আইসিইউতে নেয়া প্রয়োজন। এ ছাড়াও রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা রয়েছে মাত্র ২০টি। কিন্তু সেখানে অন্যান্য রোগীদের নেয়া হয়। এছাড়াও এ বিভাগের দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একটি অংশে আটটি আইসিইউ শয্যা নিয়ে করোনা চিকিৎসা চলছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী রংপুর করোনা হাসপাতালে ৫০টি এবং দিনাজপুর মেডিক্যালের করোনা কর্নারে ৩০টি আইসিইউ বেড বাড়ানোর কথা থাকলেও তা গত এক বছরেও হয়নি। এই বিভাগে মাত্র ১৮টি বেড আছে করোনার আইসিইউ এর জন্য।
রংপুর সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা সরকারের নিকট দ্রুত রংপুরে আলাদা করোনা হাসপাতাল তৈরির দাবি জানিয়ে বলেছেন, জরুরি ভিত্তিতে সেটি করতে হবে। আর সময় নেই। অন্তত ২০০ আইসিইউ বেড নিশ্চিত করতে হবে। তা নাহলে করোনার ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না। তিনি আরো বলেন, অন্তত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে বিনা চিকিৎসায় কেউ মারা না যায়।