
রংপুর অফিস:
রংপুর সিটি করর্পোরেশন নির্বাচনের তফসিল গতকাল সোমবার ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। ঘোষিত তফসিলে অনুযায়ী ভোট গ্রহণ আগামী ২৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই সরগরম হয়ে উঠেছে নির্বাচনী মাঠ। সম্ভাব্য প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা আরো জোরেশোরে শুরু করেছেন। স্থানীয় লোকজনের সেবার মাধ্যমে নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। হাট-বাজার ও বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময়ে নেমেছেন। খেলাধুলা, পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয়সহ নানান অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। সকাল থেকে গভীর রাত নগরীর পাড়া-মহল্লা ও হাট-বাজার চষে বেড়াচ্ছেন। এর ফলে মহানগরী জুড়ে সর্বত্র আলোচিত বিষয় এখন রংপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন। এর আগে তফসিল ঘোষণার কয়েক মাস আগে থেকেই রংপুর মহানগরী জুড়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের ব্যানার, ফেস্টুন ও বিলবোর্ডে ছেয়ে গেছে।
রংপুর সিটি করর্পোরেশন নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা যাই থাক না কেন অযোগ্যদের প্রার্থী হবার আগ্রহে হতাশ সচেতন নগরবাসী। তারা সার্বিক উন্নয়ন ও পিছিয়ে থাকা রংপুর নগরীকে এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে যোগ্য ব্যক্তিকে মনোনীত করবে যারা চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করতে পারবেন এমনটাই প্রত্যাশা করছেন।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে প্রচারণায় নেমেছেন আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের প্রায় এক ডজন নেতা। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ছয়জন, জাতীয় পার্টির একজন, বিএনপির তিনজন ছাড়াও জাসদ, বাসদ ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একজন করে প্রার্থীর নাম আলোচনায় রয়েছে। এছাড়াও খেলাফত মজলিশ, ন্যাশনাল পিপলস পাটি-এনপিপি, কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ কংগ্রেস, জাকের পার্টিসহ আরও কয়েকটি দল প্রার্থী দিতে পারে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা না করলেও রংপুর সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফাকেই একক প্রার্থী হিসেবে দাবি করছেন জাতীয় পার্টির শীর্ষ নেতারা। অন্যদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন।
এদিকে, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখাসহ পরিকল্পিত নগরায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সচেতন নগরবাসী। তারা বলছেন, যানজট, জলাবদ্ধতা ও দুর্নীর্তি-স্বজন প্রীতি মুক্ত পরিচ্ছন্ন এবং জবাবদিহিতা মুলক তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর রংপুর মহানগরী এখন সময়ের চাওয়া। কৃষি ভিত্তিক কলকারখানা স্থাপন ও কর্মসংস্থানের দাবি করেছেন অনেকেই।রংপুর সিটি কর্পোরেশনের বর্ধিত এলাকাগুলোতে কাঙ্খিত উন্নয়ন না হওয়াতে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
দেখা গেছে, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মাঠে প্রচার-প্রচারণায় এগিয়ে আছেন, রংপুর মহানগর সভাপতি সফিয়ার রহমান সফি, সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মন্ডল, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আতাউর জামান বাবু ও রংপুর জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মজিদ। এসব প্রার্থীরা ইতোমধ্যে জনসমর্থন আদায় সহ সরকার দলীয় মনোনয়ন চেয়ে নগরীতে ব্যানার, পোস্টার, ফেস্টুন ও স্টিকার লাগিয়েছেন। পাড়া-মহল্লাতে সভা-সমাবেশও করছেন।
রংপুর সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইতে পারেন রংপুর চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবুল কাশেম ও আরেক সহ-সভাপতি রেজাউল ইসলাম মিলন। এর বাহিরে রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. রেজাউল করিম রাজু’র নাম শোনা যাচ্ছে।কোতয়ালী থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও রংপুর বিভাগীয় ডেইরী এসোসিয়েশনের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার লতিফুর রহমান মিলন মেয়র পদে নির্বাচনে লড়তে পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন-বিল বোর্ড লাগিয়েছেন। সভা-সমাবেশও করছেন। তবে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাওয়ার কথা কোথাও বলেননি। একারণে অনেকেই তাকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে দেখছেন।
ইতিমধ্যেই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও বিরোধী দলীয় উপনেতা জিএম কাদের রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দলীয়ভাবে বর্তমান মেয়র, মহানগর কমিটির সভাপতি ও পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফাকে জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের মেয়র প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা করেছেন। সদ্য বহিস্কৃত জাতীয় পার্টির ভাইস-চেয়ারম্যান ও রংপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র একে,এম আব্দুর রউফ মানিকও জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন চেয়ে পোস্টার-ফেস্টুন লাগিয়ে ছিলেন।দল থেকে বহিস্কারের পর থেকে তিনি নিরব রয়েছেন।
তার সমর্থকরা জানান, একেএম আব্দুর রউফ মানিক রংপুর পৌরসভার সফল চেয়ারম্যান ও মেয়র ছিলেন। তিনি নির্বাচন করবেন। তবে সেটা দলীয়ভাবে না স্বতন্ত্রভাবে তা পরিস্কার করে করেননি।
জাতীয় পার্টির শীর্ষ ও স্থানীয়রা নেতারা বর্তমান মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফাকে একক প্রার্থী হিসেবে দাবি করছেন। তিনি দলকে সু-সংগঠিত করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করছেন। সম্প্রতি পার্টির মহানগর সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হয়েছে।গত সোমবার তিনি নগরী জুড়ে শোডাউন করেন। এর ফলে জাতীয় পার্টি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। সমর্থকরা মোস্তফাকে পুনরায় মেয়র হিসাবে নির্বাচনে জেতাতে কাজ শুরু করেছেন।
বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ বর্তমান সরকার ও ইসির অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে আসলেও রংপুর সিটি নির্বাচনে অংশ নিতে তাদের দলের দুই-তিনজন নেতা প্রস্তুুতি নিচ্ছেন। বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশ নেয় সে ক্ষেত্রে দলীয় মনোনয়ন চাইতে পারেন রংপুর মহানগর বিএনপির আহবায়ক সামসুজ্জামান সামু, সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক শহিদুল ইসলাম মিজু, মহানগর কমিটির সদস্য শিল্পপতি কাওসার জামান বাবলা, রংপুর জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রইচ আহমেদ, জেলা যুবদলের সভাপতি নাজমুল আলম নাজু ও মহানগর বিএনপির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আশিকুর রহমান তুহিন। তবে প্রকাশ্যে প্রচারণা চালাচ্ছেন কাওসার জামান বাবলা। এর বাহিরে চরমোনাই পীর সমর্থিকত ইসলামী আন্দোলনের এটিএম গোলাম মোস্তফা বাবু, স্বতন্ত্রভাবে জামায়াত সমর্থিত নেতা অধ্যাপক মাহবুবার রহমান বেলাল, খেলাফত মজলিশের উপধ্যক্ষ তৌহিদুর রহমান মন্ডল রাজু ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যবসায়ী মেহেদী হাসান বনি মেয়র পদে লড়বেন। তারা ইতিমধ্যেই পোস্টার-ফেস্টুন লাগিয়েছেন। নারী নেত্রী সুইটি আনজুমের নামও শোনা যাচ্ছে।
এদিকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচারণায় মেয়র-কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থী কারা হচ্ছেন, কার অবস্থান কেমন, কে নির্বাচিত হতে পারেন তা নিয়ে সাধারণ মানুষও আলাপ-আলোচনা শুরু করেছেন। তবে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখাসহ পরিকল্পিত নগরায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।
রংপুরের নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলেছেন, এ সিটি নির্বাচনে মূলত লড়াই হবে জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ প্রার্থীর মধ্যে। বিএনপি এবারের নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশ নাও নিতে পারে। তারা বলছেন, বিগত নির্বাচনে জাতীয় পার্টি পেয়েছিল ১ লাখ ৬০ হাজার ৪৮৯, নৌকা প্রতীক পেয়েছিল ৬২ হাজার ৪০০, ধানের শীষ পেয়েছিল ৩৫ হাজার ১৩৬ এবং ইসলামী আন্দোলন পেয়েছিল ২৪ হাজার ৬ ভোট। তাই এবারের নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের ওপর নির্ভর করছে নির্বাচনী মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বীতার বিষয়টি। প্রত্যাশিত উন্নয়ন, রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনসহ নানান বিষয় এবারের নির্বাচনে এ সবই ইস্যু হয়ে উঠবে বলে জানান।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ২৮ জুন রংপুর পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করা হয়। ৩৩টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ওই বছরের ২০ ডিসেম্বর। এতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শরফুদ্দিন আহমেদ ঝণ্টু প্রথম মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হন। বর্তমানে এই সিটির জনসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। আর ভোটার আছেন ৪ লাখের বেশি।
এম২৪নিউজ/আখতার