করোনার ভেক্সিন আরও কতদূর?

নূরুল ইসলাম বরিন্দী: 08/16/2020 – 12:48:07 AM

এখন বিশ্বব্যাপী দেশে দেশে চলছে করোনার ভেক্সিন বা টিকা আবিষ্কারের তুমুল প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন সংবাদসূত্রে জানা যায়, কয়েকটি দেশ এবং প্রতিষ্ঠান তাদের ভেক্সিন আবিষ্কারের কার্যক্রম প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তো তার দেশের প্রথম টিকা ‘স্পুটনিক ডি’ আবিষ্কারের ঘোষণাই দিয়ে বসেছেন নিজের মেয়ের দেহে তা প্রয়োগ করার মাধ্যমে। অবশ্য এত স্বল্প সময়ের মধ্যে (মাত্র ২/৩ মাস) আবিষ্কৃত এই ভ্যাক্সিন স্থায়ী বা টেকসই প্রতিরোধী সক্ষমতা দেখাতে পারবে কি-না এ নিয়ে সন্দেহ এবং উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও গবেষণা সংস্থা। অবশ্য এসব উদ্বেগের কারণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করছে রাশিয়া।

তারও আগে চীনের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের ভেক্সিন বাজারজাত করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। তারা তাদের উদ্ভাবিত টিকা বাজারজাত করার জন্য কয়েকটি দেশকে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। গত মঙ্গলবার সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বিশ্বের সম্ভাব্য ছয়টি টিকা মানব-পরীক্ষার জন্য তৃতীয় বা চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে। তন্মধ্যে দুটি রাশিয়ার। সেপ্টেম্বরেই তারা তাদের আবিষ্কৃত ভ্যাক্সিনের ব্যাপকভাবে উৎপাদনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ভ্যাক্সিন নিয়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগেই তাদের গবেষকদের আবিষ্কৃত ভ্যাক্সিনের অনুমোদন দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ভ্যাক্সিন নিয়ে রাজনীতিকরণের এই অশুভ তৎপরতায় উদ্বিগ্ন সেখানকার গবেষক-বিজ্ঞানীরা। আগামী বছরের শুরুরদিকে সম্ভাব্য ভ্যাক্সিন পরীক্ষা শেষ ধাপ পার হয়ে এফডিএফ-এর অনুমোদন পাওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্ট রোগতত্ত্ববিদরা। সেইসঙ্গে তারা আশংকা প্রকাশ করছেন তাড়াহুড়া করতে গিয়ে ভ্যাক্সিনে খুঁত থাকারও।

ওদিকে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে ভ্যাক্সিন তৈরি করেছে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি। পরীক্ষামূলক চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছে গেছে তারা। অধিকাংশ গবেষকের ধারণা অক্সফোর্ডের ভ্যাক্সিনটি হতে পারে নিরাপদ ও কার্যকর। তবে সাধারণভাবে প্রয়োগের আগে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, যুগে যুগে সংঘটিত এইসব মরণঘাতী মহামারি নির্মূলে যেসব প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়েছিল সেগুলো গবেষকদের চূড়ান্তভাবে কার্যকর করতে সময় লেগেছিল কমপক্ষে দেড় বছর থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ৫৪১ সালে “জাস্টিনিয়ান প্লেগ”-এর কথা। এর আটশ বছর পর ১৩৪৭ সালে ইউরোপে “ব্লাক ডেথ”, যার স্থায়িত্ব ছিল চার বছরব্যাপী। এরপর ১৬৬৫ সালে ইংল্যান্ডে “দি গ্রেট প্লেগ অব লন্ডন” নামের মহামারি। আবার ইউরোপ, এশিয়া, আরব অঞ্চল, মেক্সিকো, আমেরিকাতে “গুটি বসন্ত” আবির্ভূত হয় মহামারিরূপে! বিশ্ব গুটি বসন্ত মুক্ত হয় ১৯৮০ সালে একটি কার্যকর ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের মধ্যদিয়ে। ১৮১৭ সালে রাশিয়া থেকে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল “কলেরা”। জন স্নো নামের এক রোগতত্ত্ববিদের আবিষ্কৃত প্রতিষেধক প্রয়োগের মাধ্যমে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে পৃথিবীর মানুষ।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই অগ্রগতির যুগে এসে ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের দীর্ঘসূত্রিতা হয়তোবা ত্বরান্বিত হতেও পারে গবেষক-বিজ্ঞানীদের কর্মকুশলতার ফলে–এমন বিশ্বাস মনে পোষণ করা অমূলক নয়। অতি সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান বলেছেন, কোভিড-১৯-এর টিকা বা ভ্যাক্সিন পাওয়ার আশা থাকলেও এ নিয়ে এখনো সংশয় রয়েছে। এ মুহূর্তে তারা কোনো আলোকরশ্মির দেখা পাচ্ছেন না। তবে আশা করছেন একাধিক কার্যকর টিকা করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সাহায্য করবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এমনও আশংকা করছে যে, করোনা বাতাসেও ছড়াতে পারে। অনেক দেশ এখনো ভুল পথে হাঁটছে বলে হু-র প্রধান মন্তব্য করেন, সংক্রমণ রোধে মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি মানা না হলে আরও ভয়ংকর রূপ নিতে পারে এই মহামারি!    

ওদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের গবেষকরা তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছেন বলে জানা যায়। সব মিলিয়ে একটা আশার আলো দেখতে পাচ্ছে করোনা আক্রান্ত বিশ্ববাসী। তবে ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেখাবার বা রাজনীতি করবার অথবা বাণিজ্যিক কায়-কারবার ফাঁদবার যে ফন্দি-ফিকির বিশ্বব্যাপী লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাতে করোনাক্রান্ত সাধারণ মানুষ সন্তুষ্ট হতে পারছে না। পারছে না স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে! আল্লাহ আমাদের সহায় হোন !

নূরুল ইসলাম বরিন্দী, Email: nibarindi@gmail.com