
অনলাইন ডেস্ক:
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় মুজিববর্ষ উপলক্ষে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের বাড়ি নির্মাণ কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ইউএনওর হুমকির শিকার হয়েছেন দৈনিক ইত্তেফাকের কিশোরগঞ্জ (নীলফামারী) সংবাদদাতা মো. শামীম হোসেন বাবু।
জানা গেছে, উপজেলা প্রশাসনের তদারকিতে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের বাড়ি নির্মাণ কাজে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে। এর সত্যতা নিশ্চিতে গত ২৯ ডিসেম্বর সরেজমিনে বাহাগিলি ইউনিয়নের কারবলার ডাঙ্গা এলাকায় যান ইত্তেফাকের প্রতিবেদক। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে গৃহহীন ও ভূমিহীনদের গৃহনির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। গৃহনির্মাণ কাজের আরসিসি ঢালাইয়ে নিম্নমানের সালটু ইটের খোয়া দিয়ে ঢালাই কাজ চলমান রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী ফাউন্ডেশন, বিম, এবং আরসিসি ঢালাই কাজে একজন উপ সহকারী প্রকৌশলী থাকার কথা কিন্তু ঢালাই কাজে কোন উপ সহকারী প্রকৌশলী না থাকায় নির্মাণ শ্রমিকেরা তাদের ইচ্ছেমতো ঢালাই কাজ সম্পন্ন করছেন। এসময় প্রকল্প এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজমিস্ত্রি মনোয়ারুল ইসলামের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, খোয়াগুলো নিম্নমানের ঠিকআছে কিন্তু এগুলো আমরা ব্যবহার করছিনা। উপজেলা নির্বাহী অফিসার এগুলো খোয়া ফেরত পাঠাতে বলেছেন। কিন্তু তাঁরপরও এগুলো খোয়া ব্যবহার করছেন কেন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, খোয়া না থাকার কারণে এগুলা ব্যবহার করছি। কারণ খোয়া আসতে দেড়ি হলে আমার শ্রমিকরা বসে থাকবে।
বড়ভিটা ইউনিয়নের মেলাবর টুঁটুয়ার ডাংগা প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ওই প্রকল্প এলাকায় দ্রুত গতিতে এক সাথে ৩০ থেকে ৪০ জন শ্রমিক ভূমিহীনদের জন্য গৃহনির্মাণ কাজ করছেন। কেউ বক্সকাটিং শেষে সিসি ঢালাই দিচ্ছেন। কেউ লেয়ারের গাঁথুনি করছেন, কেউ সলিং করছেন আবার কেউ কেউ গ্রেটবিম ঢালাই দিচ্ছেন। এসময় দেখা যায় সলিং ও গাঁথুনির কাজে নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে ঢালাই কাজের সিমেন্ট বালু খোয়ার অনুপাত এবং গুনগতমান প্রাক্কলন অনুযায়ী সম্পাদন করার জন্য একজন উপ সহকারী /কার্যসহকারী সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করার কথা থাকলেও সেখানে কাউকে দেখা যায়নি।
প্রকল্প এলাকার রাজমিস্ত্রি রহমত মিয়া বলেন, ভাই আমরাতো ইট নিয়ে আসছিনা। ইট নিয়ে আসতেছে ইউএনও অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত চঞ্চল মিয়া। ইট দুই নম্বর না এক নম্বর সেটা দেখা আমাদের দায়িত্ব নয় কাজ করা আমাদের দায়িত্ব। কাজের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন কর্মকতা উপস্থিত নাই কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাঝে মাঝে একজন গ্রাম পুলিশ এসে কাজ দেখে যান। আবার কোন কোন সময় ইউএনও আসেন।
এদিকে উপজেলা নির্মাণ শ্রমিকের সভাপতি তহুবর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, আমার এলাকার শ্রমিকদের হাতে কাজ না থাকায় তারা খেয়ে না খেয়ে আছে। তাদের পেটের ভাত মেরে বর্তমান ইউএনও অন্য জেলার শ্রমিক এনে আশ্রয়ণ প্রকল্পের কাজ করছে। ওই এলাকার মৃত হরেন্দ্রনাথ অধিকারীর ছেলে ক্ষিতিষ চন্দ্র অধিকারী, মোকন্দ রায়ের ছেলে ধীরেন চন্দ্র রায়, বজরা বর্মণের ছেলে মহেশ বর্মণ ও নিরাশা বর্মণের ছেলে পলাশ চন্দ্র রায় জানান, মাঝে মধ্যে ইউএনও স্যার এখানে আসেন। আর কেউ এসব বাড়ি নির্মাণ কাজ দেখার জন্য আসে নাই। নিম্নমানের ইট,খোয়া ও বালু দিয়ে কাজ না করার জন্য মিস্ত্রিদেরকে নিষেধ করেছি। ওনারা ইউএনওকে বলতে বলেছেন। কিন্ত ইউএনও স্যার কি আমাদের কথা শুনে?
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (অ:দা) নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য ময়নুল হক জানান,আমি শুধু একদিন কাজ দেখতে গিয়েছিলাম। আর কোন দিন যায়নি। নিম্নমানের কাজের বিষয়ে তিনি ইউএনও সাথে যোগাযোগ করতে বলেন।

তবে উপজেলা নির্বাহী অফিসার নবিরুল ইসলাম কাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের বিষয় অস্বীকার বলেন, নিম্নমানের কিছু খোয়া প্রকল্প এলাকায় আসলেও পরে সেগুলো ফেরত পাঠানো হয়েছে। নিম্নমানের ইট ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনি কি নিম্নমানের ইট চেনেন। এসময় তিনি এ প্রতিবেদকের যোগ্যতার বিষয়ে প্রশ্ন রেখে বলেন, আপনি কি সাংবাদিকতার ট্রেনিং নিয়েছেন, আপনি কি প্রফেশনাল ইথিক্স পড়েছেন। শেষে তিনি সাংবাদিককে হুমকি দিয়ে বলেন, আপনি কখন কোথায় যান তাঁর সব খবর আমার কাছে রয়েছে।
হুমকির বিষয়ে এ প্রতিবেদক জানান, আমি মুজিববর্ষ উপলক্ষে ভুমিহীন ও গৃহহীদের ঘর নির্মানে অনিয়মের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বক্তব্য চাইতে গেলে তিনি আমাকে হুমকি প্রদান করে বলেন, আপনি কোথায় যান কি করেন সমস্ত খবরাখবর আমার কাছে রয়েছে, এছাড়া তিনি সাংবাদিকের যোগ্যতার প্রশ্ন তুলে অনেক কথা বলেন, যার প্রমান আমার কাছে রয়েছে।

উল্লেখ্য, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সুত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় উপজেলায় ১শ’ টি গৃহহীন পরিবারের বাড়ি নির্মাণের জন্য ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এর মধ্যে বাহাগিলি ইউনিয়নে ৩০ টি এবং বড়ভিটা ইউনিয়নে ৭০টি ঘর নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। সরকারী নীতিমালা অনুযায়ী গৃহনির্মাণ কাজের লে আউট প্রদানকালে অব্যশই উপজেলা নির্বাহী অফিসার ,উপজেলা প্রকৌশলী, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এবং সম্ভব হলে পিআইসি কমিটির সদস্যদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভূমিহীনদের ঘর নির্মাণ কাজ চলমান থাকলেও প্রকল্প এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন কর্মকর্তাকে চোখে পড়েনি। সূত্র: ইত্তেফাক অনলাইন
এম২৪নিউজ/আখতার