প্রাথমিক শিক্ষায় নৈতিকতা চর্চা (উপ-সম্পাদকীয়)

 মো: এরশাদুল হক ।।

সকল শিক্ষার সূতিকাগার হলো প্রাথমিক শিক্ষা। মানব জীবনের সকল গুণাবলী আয়ত্ব করার স্তর হলো প্রাথমিক স্তর। এ স্তরের ভীত তৈরি না হলে ব্যাক্তি জীবনে এর প্রভাবে জীবন হবে কন্টকাপূর্ন। তাই প্রাথমিক শিক্ষার বয়সপোযোগী সকল শিশুকে নৈতিক,মানবিক,সামাজিক,গুণাবলী সমৃদ্ধ করে তাদেরকে আগামী দিনের আদর্শ নাগরিক হিসেবে সমৃদ্ধশালী দেশ গঠনের যোগ্য সৈনিক গঠন করতে হবে। শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক গুনাবলীর বিকাশে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকের মধ্যে ত্রিভুজ সম্পর্ক বিরাজ করছে। এ ক্ষেত্রে সকলের ভুমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক মূল্যবোধ বির্নিমাণের আদর্শ কারিগর, বিদ্যালয় হলো তা চর্চার অনন্য কারখানা। শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে প্রতিটি পাঠ্যবই ও বিষয়বস্তু অত্যন্ত কার্যকরী ভুমিকা পালন করে।

প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য হলো “ শিশুর দৈহিক, মানসিক, সামাজিক, আধ্যাত্মিক, নৈতিক, মানবিক ও নান্দনিক বিকাশ সাধন করা এবং তাদের দেশাত্মবোধে, বিজ্ঞানমনস্কতায়, সৃজনশীলতায় ও উন্নত জীবনের স্বপ্নদর্শনে উদ্বুদ্ধ করা। প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্যের উপরোক্ত গুণাবলীর বিকাশ সাধনের কথা বলা হলেও নিন্মোক্ত ৫টি যেমন : মানসিক, সামাজিক, আধ্যাত্মিক, নৈতিক, মানবিক গুণাবলীর উন্নয়ন ঘটানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন । যা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষে উপরোক্ত সকল গুণাবলীর বিকাশ সাধিত হবে,এটিই প্রত্যাশিত।

প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ৫ বছর অধ্যয়ন শেষে শিশুরা বাংলা, ইংরেজি, প্রাথমিক গণিত, প্রাথমিক বিজ্ঞান, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা, চারু ও কারুকলা ,শারীরিক শিক্ষা, সংগীতসহ মোট ৯ টি বিষয়ে ২৯ টি নির্ধারিত প্রান্তিক

যোগ্যতা অর্জন করবে বলে আশা করা যায়। নির্ধারিত প্রান্তিক যোগ্যতাগুলো নিম্নরুপ:

  • সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’য়ালা/সৃষ্টিকর্তার প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন, সকল সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসায় উদ্দীপ্ত হওয়া।
  • নিজ নিজ ধর্ম প্রবর্তকের আদর্শ এবং ধর্মীয় অনুশাসন অনুশীলনের মাধ্যমে নৈতিক ও চারিত্রিক গুণাবলি অর্জন করা।
  • কল্পনা, কৌতুহল, সৃজনশীলতা ও বুদ্ধির বিকাশে আগ্রহী হওয়া।
  • সংগীত, চারু ও কারুকলা ইত্যাদির মাধ্যমে সৃজনশীলতা, সৌন্দর্যচেতনা, নান্দনিকবোধের প্রকাশ এবং সৃজনশীলতার আনন্দ ও সৌন্দর্য উপভোগে সামর্থ্য অর্জন করা।
  • প্রকৃতির নিয়মগুলো জানার মাধ্যমে বিজ্ঞানের জ্ঞান অর্জন করা।
  • প্রযুক্তির উন্নয়ন ও প্রয়োগে জীবনযাত্রার উন্নতি সাধন।
  • বিজ্ঞানের নীতি ও পদ্ধতি অবলম্বনে সমস্যা সমাধানের অভ্যাস গঠন এবং বিজ্ঞানমনস্কতা অর্জন করা।
  • বাংলা ভাষার মৌলিক দক্ষতা অর্জন এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা।
  • বিদেশি ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভাষায় প্রাথমিক দক্ষতা অর্জন করা।
  • তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা লাভ এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ।
  • গাণিতিক ধারণা ও দক্ষতা অর্জন করা।
  • যৌক্তিক চিন্তার মাধ্যমে গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে পারা।
  • অধ্যবসায় ও একাগ্রতা, ন্যায় ও বিচারবোধ, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ, শৃঙ্খলা, শিষ্টাচার, নৈতিক, আত্মিক ও সামাজিক গুণাবলি অর্জন করা।
  • মানবাধিকার, আন্তর্জাতিকতাবোধ, বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও বিশ্বসংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী হওয়া।
  • স্বাধীন ও মুক্তচিন্তায় উৎসাহিত হওয়া এবং পরমত সহিষ্ণুতা ও গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুশীলনে আগ্রহী হওয়া।
  • ব্যাক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও সংরক্ষণে যত্নশীল হওয়া।
  • মানুষের মৌলিক চাহিদা ও পরিবেশের ওপর জনসংখ্যার প্রভাব এবং জনসম্পদের গুরুত্ব¡ সম্পর্কে জানা।
  • নৈতিক ও সামাজিক গুণাবলী অর্জনের মাধ্যমে ভালো-মন্দের পার্থক্য নিরূপণ এবং তা বাস্তবজীবনে প্রয়োগ করা।
  • অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি, জাতি-ধর্ম-বর্ণ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের সঙ্গে স¤প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থানের মানসিকতা অর্জন করা।
  • পরিবার, বিদ্যালয় ও সামাজিক কর্মকাÐে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজের ও অন্যের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া।
  • প্রতিকূলতা ও দুর্যোগ সম্পর্কে জানা এবং তা মোকাবেলায় আত্মপ্রত্যয়ী হওয়া।
  • নিজের কাজ নিজে করা এবং শ্রম ও শ্রমজীবির মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন হওয়া।
  • প্রকৃতি, পরিবেশ ও বিশ্বজগৎ সম্পর্কে জানা ও ভালবাসা এবং পরিবেশের উন্নয়ন ও সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ হওয়া।
  • আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তনের সমস্যা মোকাবেলায় ইতিবাচক ভূমিকা গ্রহণ।
  •  শরীরচর্চা ও খেলাধুলার মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ সাধন।
  • নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর জীবন যাপনে সচেষ্ট হওয়া।
  • মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধে উদ্দীপ্ত হওয়া এবং ত্যাগের মনোভাব গঠন ও দেশ গড়ার কাজে উদ্বুদ্ধ হওয়া।
  • জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা এবং এগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া।
  • বাংলাদেশকে জানা ও ভালোবাসা।

উপরিল্লিখিত ২৯ টি প্রান্তিক যোগ্যতার মধ্যে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ে ১৫টি (ক্রমিক নং- ১৩ হতে ২২ এবং ২৭ হতে ২৯ ) অর্জন করতে ১ম ও ২য় শ্রেণিতে শিক্ষক সহায়িকার নির্ধারিত বিষয়বস্তু ছাড়াও ৩য় হতে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকে নির্বাচিত বিষয়বস্তুসমুহের মধ্যে মিলেমিশে থাকা,আমাদের অধিকার ও কর্তব্য,সমাজের বিভিন্ন পেশা, মানুষের গুণাবলী, সমাজে পরস্পরের সহযোগিতা, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্টী, নাগরিক অধিকার, মূল্যবোধ ও আচরণ, পরমতসহিষ্ণুতা, কাজের মর্যাদা, মানবাধিকার,নারী পুরুষ সমতা, আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য, গণতান্ত্রিক মনোভাব প্রভৃতি আমাদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে জাগ্রত করে। অপরপক্ষে ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষায় ২টি ( ক্রমিক নং ১ ও ২) নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যান্য ০৭টি বিষয়ে প্রান্তিক যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ টি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের গুরুত্ব সহজেই অনুমেয়। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে, কোন শিক্ষার্থী বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে ভালো ফলাফল করলে সে শিক্ষার্থীকে ভালো গ্রেড দিয়ে সামনের সারিতে নিয়ে আসি, আর সে সকল শিক্ষার্থীরাই আমাদের দেশে ভালো চাকুরি নিয়ে তাদের নিজস্ব আর্থিক উন্নয়ন ঘটালেও সমাজ ও দেশ গঠনে তেমন কোন ভূমিকা পালন করেন না। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিখন শেখানো কার্যক্রমে বাংলা, ইংরেজি, প্রাথমিক গণিত, প্রাথমিক বিজ্ঞান বিষয়গুলোকে যথারীতি গুরুত্ব প্রদান করলেও বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয় দুটিকে অন্যান্য বিষয়ের সমহারে গুরুত্ব প্রদান করা হয় না । ফলে শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ হয়। পরবর্তিকালে ব্যাক্তিজীবনসহ সমাজে এর প্রভাব সমাজ ও রাষ্ট্রকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে সমাজে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, ধর্ষণ, সহপাঠিদের প্রতি সহমর্মিতার অভাবসহ অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনের মাধ্যমে সংখ্যালঘু জনগোষ্টির উপর অমানবিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের সঙ্গে স¤প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থানেও বাধার সৃষ্টি করে। অপরদিকে ঘুষ, দূর্নীতি ও আগুন সন্ত্রাস দেশের সম্পদ ধবংসের মাধ্যমে উন্নয়নকে বাধাগ্রস্থ করছে। এ থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হলো আমাদের সন্তানদের নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা। তাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ে পাঠদানের উপর গুরুত্ব আরোপ করা ছাড়াও অন্যান্য বিষয়সমুহে নৈতিকতার আলোকে বিষয়বস্তু সংযোজন করার উপর গুরুত্ব আরোপ করা উচিত।

তাই আসুন, আগামীতে একটি সুন্দর সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে আমাদের সন্তানদের নৈতিক ও মানবিক গুণাবলী সমৃদ্ধ করতে অন্যান্য বিষয়ের ন্যায় বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়কেও গুরত্ব প্রদান করি।

লেখক, মো: এরশাদুল হক, ইন্সট্রাক্টর, উপজেলা রিসোর্স সেন্টার, মিঠাপুকুর,রংপুর।

Leave a Reply