
নূরুল ইসলাম বরিন্দী :
ভারতের প্রখ্যাত চিত্রাভিনেতা ও প্রজোযক-পরিচালক সঞ্জয় খানের “দি সোর্ড অফ টিপু সুলতান” একসময় বাংলাদেশের দর্শকদের দেখার সৌভাগ্য হয়েছিলো বিটিভির সৌজন্যে। দূরদর্শনের জন্য নির্মিত হয়েছিলো এ ড্রামা সিরিয়ালটি। লেখক ভগবান এস গিদওয়ানীর ঐতিহাসিক উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয় এ সিরিয়ালটি। অত্যন্ত ব্যয়বহুল এ সিরিয়ালটি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো ভারতসহ আমাদের বাংলাদেশেও। বাংলায় ডাবিং করে স্পন্সর করেছিলো একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থা। “দি সোর্ড অফ টিপু সুলতানে”র নির্মিত সংলাপ, চরিত্রচিত্রণ, সম্পাদনা, কলা-কুশলীদের অপূর্ব অভিনয় কুশলতা, প্রখ্যাত প্রবীণ সঙ্গীত পরিচালক নওশাদের আবহ সঙ্গীত—সব মিলিয়ে “দি সোর্ড অফ টিপু সুলতান” সত্যি এক তুলনাহীন টিভি সিরিয়াল।
এবারে ফিরে আসা যাক পূর্ব প্রসঙ্গে। ইতিহাসের টিপু সুলতানকে টিভির মিনি পর্দায় উপস্থাপন করে সঞ্জয় খান উপমহাদেশের সকল ধর্ম-গোত্রের মানুষের কাছে প্রশংসিত ব্যক্তিত্বের দাবিদার হয়েছেন এ কথা বলা যায় নির্দ্বিধায়।
স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সৈনিক, মহিশুরের শার্দুল বলে কিংবদন্তীর সিংহপুরুষ টিপু সুলতানের কথা আমরা ইতিহাসে পড়েছি। তিনি ছিলেন আদর্শবান মহান, মহৎ চরিত্রের অধিকারী অকুতোভয় সৈনিক-শাসক। এই উপমহাদেশের যে কজন বীর সাহসী যোদ্ধা বেনিয়া ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার জন্য মরণপণ সংগামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন মহিশুরের টিপু সুলতান ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। টিপু সুলতানের জন্ম ১৭৫০ সালের ২০ নভেম্বর বর্তমান কর্ণাটক রাজ্যের রাজধানী ব্যাঙ্গালোরের দেবন হালি নামক স্থানে। বিটিভিতে প্রদর্শিত ৬০টি এপিসোডে সমাপ্তি ঘটেছে এই সিরিয়ালের। ইতিহাসের কাহিনীতে আমরা দেখেছি টিপু সুলতানের বাবা হায়দার আলীর নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যদিয়ে ধাপে ধাপে উত্থানের দৃশ্যাবলী। অসীম শৌর্য-বীর্যের অধিকারী হায়দার আলীকে আমরা দেখেছি মহিশুরের মহারাজার মৃত্যুর পর নিজে ক্ষমতারোহণের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও একজন নাবালক উত্তরাধিকারীকে সিংহাসনে বসিয়ে অভিভাবক হিসেবে রাজ্য পরিচালনার ভার স্বহস্তে গ্রহণ করতে। ইতিহাসের এ সময়কালটা ছিলো ১৭৬১ সাল। আরো দেখেছি প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে হায়দার আলী মহিশুর থেকে পালিয়ে যান ১০ বছরের ছেলে টিপু ও ৪ বছরের আব্দুল করিমকে মায়ের কাছে রেখে কাবেরী নদী সাঁতরিয়ে। শত্রুদের হাতে বন্দি হয় শিশু দুটি। হায়দার আলীর বিশ্বস্ত অনুচর গাজী খান তাদের উদ্ধার করে লাল মিয়ার বাড়ির কাছে কোনো এক জায়গায় লুকিয়ে রাখেন । গভীর রাতে লাল মিয়ার কিশোরী কন্যা রোকাইয়া ক্ষুধার্ত শিশুদের খাবার সরবরাহ করে এবং পরে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসে।
ইতিমধ্যে হায়দার আলী সৈন্য সংগ্রহ করে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ষড়যন্ত্রকারীদের হটিয়ে দিয়ে মহিশুর দখল করে ফেলেন। অক্ষত অবস্থায় মা, স্ত্রী, পুত্রদের ফিরে পান। এর কিছুদিন পর মহারাজার মৃত্যু হলে রাজ্যের সর্বময় ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব নিজের কব্জায় নিয়ে নেন। এরপর আমরা দেখতে পাই ইতিহাসের ধারাভাষ্য অনুযায়ী ১৫ বছর বয়সের টিপুর বালাম আক্রমণের মাধ্যমে প্রথম যুদ্ধযাত্রার দৃশ্য। টিপু বালাম অবরোধ করলে সেখানকার শাসক সপরিবারে পলায়ন করেন গভীর জঙ্গলের দিকে। টিপুর সৈন্যরা তাদের পিছু ধাওয়া দেয় এবং বন্দি করে। বালামরাজের পক্ষ থেকে টিপুর কাছে অনুগ্রহ প্রার্থনা করা হয়। তবে হায়দার আলীর সেনাপতি মকবুল খান বন্দিদের প্রতি দুর্ব্যবহার শুরু করলে টিপু নিজেই সসম্মানে তাদের নিরাপদ তাঁবুতে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দান করেন। কিন্তু মকবুল খান কিশোর টিপুর নির্দেশ অমান্য করলে টিপু তরবারির এক আঘাতেই মকবুল খানকে হত্যা করেন এবং বালাম অধিপতিকে তার হারানো রাজ্য ফিরিয়ে দেন। মহিশুরের দ্বিতীয় যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে টিপু ছিলেন মালাবারে শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধরত। এ সময় কতিপয় বিশ্বাসঘাতক ষড়যন্ত্রকারী হায়দার আলীকে চিতোরের সন্নিকটে কাঁকড়া ভর্তি জালে নিক্ষেপ করে নৃশংসভাবে হত্যা করে প্রতিপক্ষ শ্রীরঙ্গপট্টমের পতন ঘটায়। রাজধানীর বাইরে অবস্থান করায় টিপু পিতার এ দুর্ভাগ্যজনক পরিণতির কথা জানতে পারেন না। ঘাতকরা হায়দার আলীর লাশ একটি সুরম্য সিন্দুকে পুরে শ্রীরঙ্গপট্টমে পাঠিয়ে দেয়–যে সিন্দুকটিতে বহু মূল্যবান রত্নরাজি উপঢৌকন হিসেবে পাঠিয়ে ছিলেন কন্সটান্টিনোপল থেকে অটোমান সাম্রাজ্যের খলিফা।
ওদিকে লাল মিয়ার কিশোরী কন্যা রোকাইয়া টিপুর খেলার সঙ্গী হিসেবে ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। একসময় দুজনের মধ্যে মন দেয়া-নেয়া হয়। পরিণতিতে ১৭৭৪ সালে টিপু-রোকাইয়া বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এরপর টিপুর বীরত্ব ও অসীম সাহসিকতার ফলে দেশি-বিদেশি দুশমনরা মালাবার সীমান্ত পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়। এরপর টিপু ব্যাঙ্গালোর অবরোধ করেন। পুত্রের বীরত্বে দারুণ খুশি হয়ে হায়দার আলী টিপুকে যুদ্ধের বিশেষ পতাকা এবং প্রতীক গ্রহণের অনুমতি দান করেন। টিপু প্রতীক হিসেবে বেছে নেন বল-বীর্যশালী ‘বাঘ’কে। ১৭৭২ সালে হায়দার আলী মৃত্যুবরণ করলে মহিশুরের প্রধান সেনাপতি বা সিপাহসালাররূপে অভিষিক্ত হন টিপু। কিন্তু স্বাধীনচেতা বীর যোদ্ধাপুরুষ অন্য রাজাদের তাঁবেদারি করতে রাজী ছিলেন না তিনি। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম নিজস্ব রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার ইচ্ছা মনে মনে পোষণ করতেন টিপু। তার এ আকাংক্ষা প্রবল হয়ে ওঠে কিছুদিনের মধ্যেই। এর ফলশ্রুতিতে টিপু সুলতান নিজেকে মহিশুরের স্বাধীন সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন। মহারাজার উত্তরাধিকারীরা তাদের হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধারের জন্য বৃটিশদের সহায়তা কামনা করে এবং ইংরেজরা তাদের সাহায্যের আশ্বাস দেয়। অন্যদিকে ইংরেজদের প্রতিদ্বন্দ্বী ফরাসিদের সঙ্গে টিপুর সদ্ভাব গড়ে ওঠায় টিপু একটি সম্মিলিত আগ্রাসী বাহিনীর হামলার মুখোমুখি হন। এ সম্মিলিত বাহিনী গড়ে উঠেছিলো মারাঠা, নিজাম ও ইংরেজদের যৌথ উদ্যোগে। ১৭৯১ সালে এ সম্মিলিত বাহিনী টিপুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করে শ্রীরঙ্গপট্টম দখল করে নেয়। টিপু তার দুই শিশুপুত্রকে শ্ত্রুদের কাছে জিম্মি রাখতে বাধ্য হন। কিন্তু স্বাধীনতার জন্য তার সংগাম অব্যাহত রাখেন ইংরেজদের পক্ষ থেকে বন্ধুত্বের প্রস্তাব আসা সত্ত্বেও ।
টিপু সুলতান যখন তার সর্বশক্তি দিয়ে শত্রুর মোকাবেলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখনই আবার বৃটিশ কমান্ডার জেনারেল বেয়ার্ডের নেতৃত্বে হামলা চলে শ্রীরঙ্গপট্টমে। কিন্তু সুদৃঢ় প্রতিরক্ষা ও টিপুর রণকৌশলের কাছে ইংরেজরা যখন বিপর্যস্ত সে সময়ে টিপুর সেনাধ্যক্ষ করে বসে বিশ্বাসঘাতকতা। ঠিক যেমনটি করেছিলো বাংলার মীরজাফর আলী খাঁ পলাশীর আম্রকাননে নবাব সিরাজুদ্দৌলার বিরুদ্ধে। দ্বিপ্রহরের পর মুহূর্তে হামলাকারীরা যখন দুর্গে প্রবেশ করে তখন টিপু নিশ্চিত মনে ব্যস্ত ছিলেন মধ্যাহ্ন আহারে। দুশমনদের অতর্কিত ক্রসফায়ারে টিপু সুলতান বুলেটবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।কাবেরী নদীর তীরে দরিয়া দৌলত প্রাসাদের পাশের কবরস্থানে আপন মা-বাবার সমাধির পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন ‘মহিশুরের বাঘ’ টিপু সুলতান। ডোরাকাটা চিতা বাঘের চিত্রসংবলিত একটি ভেলভেট কাপড়ে আচ্ছাদিত রয়েছে তাঁর কবর!
প্রিয় পাঠক। ইতিহাসের টিপু সুলতানের টিভি সিরিয়ালের প্রসঙ্গটা এ লেখায় আনার উদ্দেশ্য হলো অতি সম্প্রতি জানা গেলো ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে অনেকদিন থেকে ঝুলে থাকা সাহিত্য-সংস্কৃতির বিনিময় ব্যাপারটা বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। এতোদিন প্রায় একতরফাভাবে আকাশ-সংস্কৃতির পুরো অঙ্গনটা দখলে ছিলো ভারতের। আমাদেরও তো আর্কাইভে রয়েছে ইতিহাসভিত্তিক কাহিনিচিত্র, সৃষ্টিশীল নাটক, ডকুমেন্টারি, টেলিফিল্ম, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক দেখার মতো কিছু চলচ্চিত্র। সরকারিভাবে এখন যদি একটা চুক্তির মাধ্যমে সেগুলো আদান-প্রদানের ব্যবস্থা হয় তবে প্রতিবেশি দুই দেশের মধ্যে একটা সাংস্কৃতিক বাণিজ্যিক পরিমন্ডল গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে তা বলাই বাহুল্য।
নূরুল ইসলাম বরিন্দী, Email: nibarindi@gmail.com