গল্প নয় একটি সত্য ঘটনা (প্রথম পর্ব)

 নূরুল ইসলাম বরিন্দী:

রাজধানী ঢাকার নতুন জুরাইনের ২২৯ নম্বর বাড়িটির নাম “সোনার তরী”। তিনতলা বিশিষ্ট এই বাড়িটির মালিক লেখক-সাংবাদিক শফিকুল কবীর। সময়টা ২০১০ সালের ১০ জুন। দিবাগত গভীর রাত। এখন, এ মুহূর্তে বাড়িতে অবস্থান করছে শফিকুল কবীরের একমাত্র ছেলের বউ ফারজানা রিতা এবং তার দুই সন্তান–তেরো বছর বয়সের ছেলে ইশরাক কবীর পবন ও এগারো বছর বয়সের মেয়ে রাইশা রাশমিন পায়েল।

ফারজানা খোলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে, দৃষ্টি তার বাইরের অন্ধকার আকাশের দিকে স্থির। এ মুহূর্তে তার বুকের ভেতরে চলছে যেন ভয়াবহ সিডরের তান্ডব। পবন-পায়েল মেঝেয় পাতানো জাজিমের ওপর নিশ্চুপ বসে আছে মায়ের নির্দেশের অপেক্ষায়। ঘরে জ্বলছে জিরো পাওয়ারের বাল্ব। আবছা আলো, আবছা অন্ধকার। কেউ কারো মুখ দেখতে পাচ্ছে না স্পষ্ট করে। তিনটি মানবদেহের বুকের খাঁচায় ধিকি ধিকি হৃৎস্পন্দনের শব্দ ছাড়া আর কিছুই যেন শুনতে পাচ্ছে না কেউ। পবন, পায়েল দু ভাইবোন ইতিমধ্যেই জেনে গেছে তারা আজ রাতের কোনো এক সময় এ পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়ে যাবে মায়ের সাথে। কোনো শব্দ হবে না, কোনো আর্তচিৎকার হবে না, মৃত্যুযন্ত্রণার কোনো হাহাকারময় আওয়াজ শুনতে পাবে না আশপাশের কোনো মানুষজন। নিরবে, নিঃশব্দে তিনটি আসহায় মানবের প্রাণবায়ু বের হয়ে যাবে বেনজোডায়াজিপেন নামক রাসায়নিক উপাদান মিশ্রিত উচ্চমাত্রার ঘুমের ওষুধের প্রভাবে!  গৃহবিবাদের জের ধরে শ্বশুর-শাশুড়ি চলে গেছেন গ্রামের বাড়িতে। স্বামী রাশেদুল কবীর তার মামাতো বোন স্মৃতিকে তার অনুমতি ছাড়াই বিয়ে করে এ বাড়ি ছেড়ে গিয়ে উঠেছে ইস্কাটনের একটি ভাড়া বাড়িতে। 

এটা জুন মাস। গত মে মাসের ৬ তারিখে একটা সালিশী বৈঠক বসেছিল এ বাড়িতে। তাতে সিদ্ধান্ত হয় ফারজানাকে অচিরেই এ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে এবং রাশেদের দ্বিতীয় বিয়েতে ফারজানার কোনো আপত্তি নেই–এ রকম একটা মুচলেকা নেয়া হয় স্ট্যাম্পে সই করে। ফারজানা জানে এ সবই তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র! স্বামী শ্বশুর শাশুড়ি ননদ – সবাই মিলে জোট বেঁধেছে তাকে আর তার সন্তান দুটিকে এ বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করতে। একই এলাকায় বিধবা মায়ের বাড়ি। প্রথমে ফারজানা স্থির করেছিল সেখানে উঠে যাবে সন্তানদের নিয়ে। কিন্তু পরক্ষণেই তার ভেতর থেকে একটা প্রবল অভিমান বোধ আর তীব্র জেদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে—কেন সে যাবে এ বাড়ি ছেড়ে? তার কি কোনো অধিকার নেই স্বামীর ওপর? তার  সন্তানদের কোনো উত্তরাধিকার সূত্র নেই, নেই রক্তের পরম্পরাগত আইনি অধিকার? শুধু সেদিন নয়, রাশেদ আরো কয়েকবার ফারজানাকে তার সন্তানদেরসহ এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করেছিল।

১৯৯১ সালের ৮ জুলাই বিয়ে হয় রাশেদ-ফারজানার। একে অপরকে ভালোবেসে বিয়ে  করেছিল ওরা দুজন। উনিশ বছরের বিবাহিত জীবন চলছে ফারজানার। প্রথম জীবনে কত সুখ, কত শান্তি ছিল ওদের সংসারে। স্বামীর প্রাণঢালা ভালোবাসা, শ্বশুর-শাশুড়ির আদর-সোহাগ– সেসব আজ অতীত স্মৃতি। অবশ্য বিয়ের পর বছর পাঁচেক পেটে বাচ্চা না আসায় সবার মনে একটা অশান্তি বিরাজমান ছিল। একমাত্র ছেলের বউয়ের কোনো বাচ্চা না হলে স্বভাবতই বাপ-মায়ের মনে ক্ষোভ, সেইসাথে  আশাও থাকে। বংশরক্ষার জন্য তাদের মনে একটা আক্ষেপ জাগাই স্বাভাবিক। এসব কারণে ডাক্তারেরও শরণাপন্ন হতে হয়েছে ফারজানাকে। আর ফারজানার কী সৌভাগ্য যে, পাঁচ বছরের মাথায় কোল আলো করে আসে ফুটফুটে একটি বাচ্চা। মহাধুমধামের সাথে বাচ্চার নাম রাখা হয় ইশরাক কবীর পবন।

সেদিন বাড়িময় আনন্দের বন্যা বয়ে গিয়েছিল। ফারজানার মা-মামারাও আনন্দে উদবেল হয়ে উঠেছিলেন। ঠিক এর দু’বছর পর আবার কোল আলো করে পৃথিবীর মুখ দেখলো দ্বিতীয় একটি কন্যা সন্তান। তার নাম রাখা হলো রাইশা রাশমিন পায়েল।

অতীতের কত কথা, কত স্মৃতি আজ মনে পড়ছে ফারজানার। সে পিতৃহারা হয়েছিল মাত্র দেড় বছর  বয়সে। বিধবা মা তাকে ভারতেশ্বরী হোমসে রেখে পড়াশোনা করিয়েছেন। বাল্য, কৈশোর, যৌবন । একে একে অনেকগুলো বছর পেরিয়ে বয়সের একটা ধর্মে এসে পৌঁছে যায় ফারজানা। এরপর প্রেমে পড়ে যায় তাদেরই পাড়ার সাংবাদিক শফিকুল কবীরের একমাত্র ছেলে রাশেদুল কবীরের। পরিচয় থেকে মেলামেশা, ভালোলাগা, ভালোবাসা তারপর পরিণতিতে সর্বসম্মতিক্রমে বিবাহ-বন্ধন।

এখন রাত অনেক। মহল্লার প্রায় সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে নিজের নিজের শান্তির আবাসে। কিন্তু ফারজানার চোখে ঘুম নেই। জীবনের অনেকগুলো বছর ঘুমিয়ে কাটিয়েছে । আবার জেগে উঠে নতুন স্বপ্নে , নতুন আশ্বাসে স্বামী- সন্তান নিয়ে সুন্দরভাবে বেঁছে থাকবার স্বপ্নে বিভোর হয়েছে। ফারজানা জানালার বাইরে অন্ধকার আকাশের দিকে জলভরা চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘর ভাংগার, মন ভাংগার বেদনা-বিধূর স্মৃতিগুলোকে হাতড়াতে থাকে—

শ্বশুর লেখক-সাংবাদিক। সমাজে প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রচুর। সচ্ছল সংসার। রাশেদ ভালো একটা কোম্পানিতে মোটা বেতনের চাকরি করে। পাজেরো গাড়ি আছে। বাচ্চারা বড় হতে থাকলে ধানমন্ডির ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়া হয়। বাচ্চাদের স্কুল থেকে আনা-নেয়া, সংসারের কাজ। বেশ ব্যস্তসমস্ত দিনগুলো সুখ শান্তিতেই কেটে যাচ্ছিল ফারজানার। ঠিক এ সময়ে স্বচ্ছ্ব আকাশটায় ঘনিয়ে এলো ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ একখন্ড কালো মেঘ।

রাশেদের মামাতো বোন রাজিয়া সুলতানা স্মৃতিকে আনা হলো এ বাড়িতে। মামা গরিব মানুষ। মেয়েকে পড়াশোনা করাতে পারেন না টাকার অভাবে। তখন স্মৃতি কৈশোরে পা দিয়েছে মাত্র। ওকে ভর্তি করানো হলো জুরাইন গার্লস স্কুলে। স্কুলের পড়াশোনা, সেইসাথে ফারজানার বাচ্চাদের দেখাশোনা করার দায়িত্বটাও ছিল স্মৃতির ওপর। বেশ ভালোই চলছিল দিনগুলো। স্মৃতি একসময় এস এস সি পাস করলে তাকে ভর্তি করে দেয়া হলো কলেজে। ইতিমধ্যে পবন-পায়েল বড় হতে থাকে। একসময় কলেজে পড়ুয়া স্মৃতির গায়ে-গতরে এসে যায় উদ্ভিন্ন যৌবনের উদগ্রতা। বেশ সুখে শান্তিতেই দিনগুলো কাটছিল “সোনার তরী” বাড়িটির মানুষগুলোর।

কিন্তু দিন সব সমান নাহি যায়—-! কালো মেঘের ঘনঘটা ছেয়ে যেতে থাকে “সোনার তরী”র আকাশের ওপরে। আস্তে আস্তে সেই কালো মেঘের ছায়ার অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে বাড়ির দরজা, জানালা ভেদ করে ভেতরের অন্দরমহলে। কে জানতো ভয়াবহ এক দুঃসহ পরিণতি অপেক্ষা করছিল ফারজানা আর তার দুই সন্তানের জন্য! এর একমাত্র কারণ হয়ে দাঁড়ায় রাজিয়া সুলতানা স্মৃতি। উদগ্র যৌবন আর সর্বনাশা কামনার ছোবলে দংশিত করে স্মৃতি তার ফুপাতো ভাই , বিবাহিত, দুই সন্তানের জনক রাশেদকে। ঘরে সুন্দরী স্ত্রী আর নিষ্পাপ দুটি শিশুর ভূত-ভবিষ্যৎ চিন্তা না করে মামাতো বোনের সাথে পরকীয়া প্রেমে মজে যায় রাশেদ কবীর। উদ্ভিন্ন যৌবনবতী স্মৃতির অবৈধ প্রেমের ফাঁদে পড়ে রাশেদ ক্রমশই দূরে সরে যেতে থাকে স্ত্রী-সন্তানদের কাছ থেকে। পাপ তো আর কোনোদিন চাপা থাকে না। স্মৃতি আর রাশেদের অবৈধ সম্পর্কের কথাও একদিন প্রকাশ হয়ে পড়ে সবার কাছে। প্রথমদিকে বিশ্বাস করতে পারেনি ফারজানা। রাশেদ-স্মৃতিকে জড়িয়ে গুজনটা যখন বাড়ির চাকর-চাকরানি, শ্বশুর-শাশুড়ি থেকে অন্যদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ে তখন লোকলজ্জার ভয়েই হোক অথবা তাদের সুবিধার কারণে হোক স্মৃতিকে এ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়। সেটা ছিল ২০০৩ সালের কোনো এক সময়। —-(বাকি অংশ অন্যদিন)

নূরুল ইসলাম বরিন্দী, email:nibarindi@gmail.com