
নূরুল ইসলাম বরিন্দী :
এন্ডারসনের দিব্যদৃষ্টি : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎদ্রষ্টাদের মধ্যে এন্ডারসনের নাম উল্লেখযোগ্য। তার শতকরা সাতানব্বই ভাগ ভবিষ্যৎবাণী সত্যে পরিণত হয়েছে। ভবিতব্যদর্শনের ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা মাত্র ৮ বছর বয়সেই অর্জন করেন এন্ডারসন। রাজনৈতিক ভবিষ্যৎবক্তা হিসেবেও তিনি সমধিক পরিচিত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় কানাডায় তার বড় ভাই গুলিতে নিহত হবেন—এ ভবিষ্যৎবাণী এন্ডারসন যখন দেন তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৮ বছর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ব এন্ডারসনের ঘোষণা ছিল এ রকমঃ “ওই যুদ্ধে রুশ-আমেরিকার বৈরিভাব থাকলেও ঐক্যজোটে লড়বে এ দুটি দেশ। ” ১৯৪৫ সালের মে মাসের একটি ঘটনা বিশ্ববিখ্যাত করে তোলে এন্ডারসনকে। ঘটনাটি হলোঃ ‘ওয়াকার কাউন্টি ম্যাসেঞ্জার’(আমেরিকান সংবাদপত্র)–এর সম্পাদকের দপ্তরে এন্ডারসন হাজির হয়ে বললেন, “ সম্পাদক সাহেব, আপনি বিনা দ্বিধায় ছাপিয়ে দিন যে, আগামী ৬ আগস্ট এমন একটি ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে যার ফলশ্রুতিতে জাপানের সাথে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যাবে এবং ১৮আগস্টের মধ্যে ঘোষিত হবে যুদ্ধবিরতি।”
৬ আগস্টই ইতিহাসের সেই ভয়াবহ দিন, যেদিন আণবিক বোমার আঘাতে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় হিরোশিমা ও নাগাসাকী শহর। অতঃপর ১৮ আগস্ট যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে জাপান।
শাহ নিয়ামতউল্লা ওয়ালী
বোখারার সুপ্রসিদ্ধ জোতির্বিদ শাহ নিয়ামত উল্লা ওয়ালী ছিলেন একজন সফল ভবিষ্যৎবক্তা। তার ফার্সি কাসিদার একটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থে লেখা আছেঃ “জাপান ও রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হবে” (১৯০৪ সালে এ যুদ্ধ হয়), “১৯২৩ সালে জাপানে এক ভয়াবহ ভূমিকম্প হবে”, এটাও সত্যে পরিণত হয়। ভারত প্রসঙ্গে ওয়ালী সাহেব তার গ্রন্থে লিখেছেনঃ “মুসলমানদের কাছ থেকে এ দেশ বিদেশিদের হাতে চলে যাবে। বিদেশি নাগপাশ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য হিন্দু-মুসলমান মিলিত লড়াইয়ে শামিল হবে। বিদেশিরা পাততাড়ি গুটাবে, তবে হিন্দুস্তানকে দুটি ভাগে ভাগ করে দিয়ে যাবে। সেই দুটি ভাগের মধ্যে বৈরিতা এমন চরমে উঠবে যে, তা ভয়ংকর সংঘর্ষের দিকে মোড় নেবে।” বলা বাহুল্য, শাহ ওয়ালীর এসব রাজনৈতিক ভবিষ্যৎবাণী শতকরা নিরানব্বই ভাগ সত্যে পর্যবসিত হয়েছে।
এছাড়াও ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধবিরতির সঠিক তারিখ ঘোষণাকারী জন অ্যাডাম, ১৯৫৮ সালের মেক্সিকোয় ভূমিকম্পের পূর্ব ঘোষণাকারী কুম হেলর, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ৪ বছর আগে যুদ্ধের আভাষদানকারী যোগী আনন্দাচার্য প্রমুখের ভবিষ্যৎবাণী সত্যে পরিণত হয়েছে।
ডক্টর বি বি রমণ
সত্যসিদ্ধ ভবিষ্যৎবাণীর জন্য বিখ্যাত ভারতীয় জোতির্বিদ ডঃ বি বি রমণের নাম জ্যোতিষশাস্ত্র জগতে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত হয়। মহাত্মা গান্ধী হত্যাসহ অনেক সফল রাজনৈতিক ভবিষ্যৎবাণীর জন্যও ডঃ রমণ সুবিখ্যাত। তিনি তার সম্পাদিত পত্রিকা ‘অ্যাস্ট্রলজিক্যাল ম্যাগাজিন’–এর এপ্রিল, ১৯৪৭ সংখ্যায় লিখেছিলেনঃ “১২ নভেম্বর, ১৯৪৭ সালে কর্কের অন্তিমাংশে মঙ্গল ও শনির যোগ রয়েছে। এটা এদেশের কোনো জননন্দিত নেতার ক্ষতির ইঙ্গিতবহ।” জওহরলাল নেহরু সম্পর্কে ডঃ রমণ উক্ত পত্রিকার জুলাই, ১৯৬২ সংখ্যায় লিখেছিলেনঃ “১ আগস্ট, ১৯৬৩ থেকে ১৬ আগস্ট, ১৯৬৪ পর্যন্ত তার জীবনের জন্য অত্যন্ত খারাপ সময়।” এভাবে লালবাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যুর দেড় বছর আগে তার মৃত্যুর সংবাদ, ডঃ জাকির হোসেনের মেয়াদকাল শেষ হবার আগেই মৃত্যুবরণ, প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মৃত্যুর পূর্বঘোষণা ডঃ রমণ যথাক্রমে ১৯৬৪ ও ১৯৪০ সালে নিজের পত্রিকা মারফত দিয়েছিলেন।
ভবিষ্যদ্বাণীর দিকবিভ্রম
সাম্প্রতিক বিশ্বে জ্যোতিষশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিদদের অবস্থান কোথায়, কোন পর্যায়ে তা মোটামুটি সকলেরই জানা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আজ দৈনিকসহ সাময়িক পত্র-পত্রিকা ও নানান প্রচার মাধ্যমে আমরা ভবিষ্যৎদ্রষ্টা বা জ্যোতিষীদের ভবিষ্যৎবাণী যে হারে দেখছি ও শুনছি তাতে এটা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, এ শাস্ত্রের বিজ্ঞানসম্মত চর্চা বাড়ছে বৈ কমছে না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আজকাল যেসব ভবিষ্যদ্বাণী বিশেষ করে রাজনৈতিক ভবিষ্যদ্বাণী প্রচারিত হচ্ছে তা প্রায়শই ভ্রান্ত এবং মিথ্যা বলে প্রতিপন্ন হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ এ যুগের জনাকয়েক নামকরা জ্যোতির্বিদ তথা ভবিষ্যদ্বক্তার কথা বলা যায়। ভারতের প্রখ্যাত জ্যোতিষী প্রফেসর কে এ দুবে পরমেশ একজন বিতর্কিত ভবিষ্যদ্বক্তা হিসেবে পরিচিত। অনেক সফল ভবিষ্যকথনের জ্যোতিষী প্রফেসর দুবের কিছু কিছু ভবিষ্যদ্বাণী ইদানীং ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হয়েছে। যেমনঃ ইন্দিরা গান্ধী পুনর্বার প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বাচিত হবেন (কাদম্বিনী, সেপ্টেম্বর ১৯৮৪) , মার্গারেট থ্যাচার তার মেয়াদকাল শেষ করতে পারবেন না (কাদম্বিনী, নভেম্বর ১৯৮২), ভারতে ১৯৮৩/৮৪-এর মধ্যে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা হবে (কাদম্বিনী, ১৯৮২), ১৬ ডিসেম্বর থেকে ২৬ ডিসেম্বর ১৯৮১-র মধ্যে প্রতিবেশী দেশের সাথে যুদ্ধ হবে, এতে ভারতের পরিপূর্ণ বিজয় অর্জিত হবে ( জ্যোতিষ যোগ, জানুয়ারি ১৯৮০)।
৫০টিরও বেশি গ্রন্থের লেখক ভারতীয় জ্যোতিষ পরিষদের সম্পাদক অধ্যক্ষ নারায়ণ দত্ত শ্রীমালী সেইসব ভবিষ্যদ্বক্তার মধ্যে একজন যার বহু ভবিষ্যদ্বাণী ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে। তার কিছু নমুনা দেয়া যাকঃ “ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্ধকার। জনতা সরকারের সুদৃঢ় ভিত রচিত হয়েছে (সাপ্তাহিক হিন্দুস্থান নভেম্বর, ১৯৭৯), “ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হবেন এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। মোরারজী দেশাই ১৯৮০ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বহাল থাকবেন। জনতা পার্টি ৫ বছরকাল ক্ষমতায় টিকে থাকবে”(অজ্ঞাত দর্শন,জানুয়ারি ১৯৭৯)।
জ্যোতিষ সম্রাট বিশেষণে ভূষিত মানিক চন্দ্র জৈন ১৯৭৯’র অজ্ঞাত দর্শন পত্রিকায় লেখেনঃ “আমি আগেও বারকয়েক লিখেছি, এখনো লিখছি ইন্দিরা গান্ধী বাকি জীবনে আর ক্ষমতায় যেতে পারবেন না। পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হবেন দেবরাজ আর্চ বিশপ।”
দিল্লী নিবাসী পন্ডিত সদানন্দ ত্যাগীর কিছু ভবিষ্যদ্বাণীঃ “১৯৮৩’র শেষনাগাদ চন্দ্রশেখর কংগ্রেস (আই)-এ শামিল হবেন (কনরাট ৩ সেপ্টেম্বর ১৯৮৩), আমেরিকার সাধারণ নির্বাচনে মিঃ রিগ্যান পরাজিত হবেন, মন্ডেল ও ফারেরো যথাক্রমে প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন (কাদম্বিনী, নভেম্বর ১৯৮৪), ১৯৮৫ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ ভারত আক্রমণ করবে (কাদম্বিনী, নভেম্বর ১৯৮৪)।
জ্যোতিষগুরু বলে সুপরিচিত পন্ডিত হরদেও ত্রিবেদীর কিছু ভবিষ্যদ্বাণীঃ “ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না (অজ্ঞাত দর্শন ডিসেম্বর ১৯৭৯), অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন নির্বাচনে জিতে মন্ত্রীমন্ডলিতে শামিল হবেন। সুনীল দত্ত নির্বাচনে অবশ্যই হেরে যাবেন (অজ্ঞাত দর্শন, ডিসেম্বর ১৯৮৩)।
উল্লিখিত ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর কোনোটাই সঠিক হয়নি। অথচ যারা ওইসব রাজনৈতিক ভবিষ্যদ্বাণী দিয়েছেন তারা সবাই বিশ্ববিখ্যাত জ্যোতির্বিদ, নামকরা ভবিষ্যৎদ্রষ্টা।
উৎকর্ষতার ভিত্তিহীন স্লোগান
ইদানীং মিডিয়া চ্যানেল, পত্র-পত্রিকায় প্রচারের বদৌলতে জ্যোতিষশাস্ত্রকে উৎকর্ষতার চরম শিখরে পৌঁছানোর সস্তা স্লোগান উচ্চারিত হচ্ছে হামেশাই। জ্যোতিষ নামধারী কিছু প্রবঞ্চকের হাতে পড়ে এ শাস্ত্রটি আজ মানুষ ঠকানো আর চমক সৃষ্টির শাস্ত্রে পরিণত হতে চলেছে। মানুষের আজন্ম লালিত বিশ্বাসকে হাতিয়ার করে কিছুসংখ্যক হস্তরেখাবিদ(!), হস্তরেখা বিশেষজ্ঞ (!) জ্যোতিষ সম্রাট(!) আজ এ শাস্ত্রকে পুঁজি করে কিছু একটা করে খাচ্ছেন।
বিজ্ঞান-সাধকমাত্রেরই সাধনায় সিদ্ধিলাভের জন্য থাকা চাই কঠিন একাগ্রতা ও গভীর মনস্কতা। জ্যোতিষশাস্ত্র যেহেতু একটি স্বীকৃত বিজ্ঞানধর্মী শাস্ত্র, সে কারণে এর সাধককে হতে হয় বিষয় মনোযোগী, অতীন্দ্রিয় বোধশক্তির অধিকারী। অর্থ, যশ, স্বার্থসিদ্ধির মোহে কেউ যদি এ শাস্ত্রচর্চাকে জীবন-জীবিকার পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করেন তাহলে তাকে ‘অকাল্টসাধক’ না বলে শাস্ত্রীয় পেশাজীবী বলাই শ্রেয়।
কোনো জ্যোতিষী যখন কোনো রাজনৈতিক ভবিষ্যদ্বাণী করেন তখন তার বাণীর যথার্থতা ও সঠিকত্ব থাকা নিতান্তই বাঞ্ছনীয়। কেননা রাজনৈতিক ভবিষ্যদ্বাণীর পেছনে ক্রিয়াশীল থাকে একটা বিশাল জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাপকাঠি। বিভ্রান্তকর ভবিষ্যদ্বাণী একদিকে যেমন মানুষের বিশ্বাসে চিড় ধরায় অপরদিকে তেমনি হাস্যাস্পদে পরিণত হন ভবিষ্যদ্বক্তারাও । কিন্তু সত্য এই যে, বিশ্বের প্রখ্যাত ভবিষ্যৎ-প্রবক্তাগণও বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয়ে তাদের ভ্রমাত্মক ভবিষ্যদ্বাণী প্রচার করে থাকেন। এমন কান্ডজ্ঞানহীন কর্ম থেকে তাদের বিরত থাকা উচিত। (হিন্দী সাপ্তাহিক ধর্মযুগের সৌজন্যে)
নূরুল ইসলাম বরিন্দী, Email: nibarindi@gmail.com