
আজ ১০ম মৃত্যুবার্ষিকী-
নূরুল ইসলাম বরিন্দী:
ইতিপূর্বে এই কলামে লিখেছিলাম রংপুরের প্রয়াত তিন বিরল প্রতিভার কথা। আজ যাঁর কথা লিখতে বসেছি তাঁর নাম ও খ্যাতি অঞ্চল পেরিয়ে, দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছেছিল। দুই প্রজন্মের সাংবাদিক, রাজনীতিক, পত্রিকা-পাঠকমাত্রই তাঁকে একনামে চেনার কথা। তিনি হলেন মিঠাপুকুর, বৃহত্তর রংপুর তথা দেশের কীর্তিমান প্রথিতযশা লেখক-কলামিস্ট-সাংবাদিক প্রয়াত আখতার-উল -আলম।
১৯৩৯ সালের ২২ জুন রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানার রাণীপুকুর ইউনিয়নের তাজনগর গ্রামের বিখ্যাত শাহ-ফকির পরিবারে জন্মেছিলেন এই ক্ষণজন্মা প্রতিভা আখতার-উল- আলম। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ২৩ জুন/২০১০ সালে, ৭২ বছর বয়সে, ঢাকায়।
আজ ২৩ জুন/২০২০ তাঁর ১০ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আমার এই লেখাটির সূত্রপাত। আখতার-উল-আলমের শিক্ষাজীবন শুরু স্থানীয় বলদিপুকুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। রাণীপুকুর হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক, রংপুর কারমাইকেল কলেজ এবং সরকারি ঢাকা কলেজ থেকে স্নাতক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন । শিক্ষা এবং কর্মজীবনের গোটা সময়জুড়ে সংবাদপত্রে কলাম লেখার ফাঁকে ফাঁকে লিখতেন গল্প-কবিতা-উপন্যাস । মোট কথা সাহিত্যের সবক্ষেত্রেই তাঁর বিচরণ ছিল সমানতালে। আখতার-উল-আলমের সাংবাদিকতা জীবনের শুরু ষাটের দশকের প্রথমদিকে এক সময়কার মুসলিম বাংলার প্রাচীনতম পত্রিকা দৈনিক আজাদের মাধ্যমে। আজাদ গ্রুপ অব পাবলিকেশন্সের পত্রিকা ‘মাসিক মোহাম্মদীর’ ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এবং সেইসাথে মুসলিম বাংলার প্রখ্যাত সাংবাদিক-রাজনীতিবিদ মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর তত্ত্বাবধানে দৈনিক আজাদের সম্পাদকীয় ও কলাম লেখকের দায়িত্ব পালন করেন। এক পর্যায়ে যাঁর কাছে তাঁর সাংবাদিকতায় হাতে খড়ি, ওই সময়কার সাংবাদিকতা জগতের পথিকৃৎ মুজিবুর রহমান খাঁর আহ্বানে অধুনালুপ্ত দৈনিক পয়গামে সহকারী সম্পাদক হিসাবে যোগদান করেন । কিন্তু নীতি-আদর্শের দিক দিয়ে উক্ত পত্রিকার কর্তৃপক্ষের সাথে বনিবনা না হওয়া পয়গাম ত্যাগ করে আবার ফিরে আসেন দৈনিক আজাদে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মিলিটারি ক্রাকডাউনের জের ধরে পাকিস্তানী আর্মিদের অস্ত্রের মুখে তাঁকে পত্রিকা অফিস থেকে তুলে নিয়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে রাখা হয়। সৌভাগ্যবশত কয়েকদিনের মধ্যে ছাড়া পেয়ে যান। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে আওয়ামী লীগ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের মুখপত্র হিসাবে পরিচিত দৈনিক ইত্তেফাকে সহকারী সম্পাদক পদে নিয়োগলাভ করেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যে দৈনিক ইত্তেফাকে ‘স্থান-কাল পাত্র’ কলামে ‘লুব্ধক’ ছদ্মনামে তার লেখা প্রকাশ হতে থাকলে প্রচুর পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে। গোটা ’৭০ এবং ’৮০-র দশক জুড়ে ‘স্থান-কাল-পাত্র’ কলামটি অভাবনীয় জনপ্রিয়তা পায়। ১৯৮৫ সালে তিনি সহকারী সম্পাদক পদ থেকে দৈনিক ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। সে সময়ে বাংলাদেশে শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোর মধ্যে সর্বাধিক প্রচারিত খবরের কাগজ হিসাবে প্রসিদ্ধি লাভ করে দৈনিক ইত্তেফাক।
আখতার-উল-আলমের চিন্তা-চেতনায়, মননে-মগজে সাংবাদিকতা পেশাটা ছিল নিখাদ নেশার মতো। তবে আদর্শগত দিক দিয়ে মননে ধারণ করতেন জাতীয়তাবাদী চিন্তা-চেতনা, প্রগতিশীল ইসলামী ধ্যান-ধারণা। তাঁর লেখায় ইসলামের মাহাত্ম্য, ইতিহাস-ঐতিহ্য-রাজনীতি এমন তর্কাতীতভাবে ফুটে উঠতো যে, এ দেশের কম্যুনিস্ট ভাবাদর্শের বুদ্ধিজীবীরা তাঁকে কখনও ‘গোঁড়া’, কখনও ‘জামাতি’ বলে আখ্যায়িত করতো । অথচ বাস্তবে তিনি ছিলেন জাতীয়তাবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত একজন লেখক-সাংবাদিক। আর তাই হয়তোবা তৎকালীন সরকারের রাষ্ট্রদূত হওয়ার অফারকে প্রত্যাখ্যান না করে সানন্দচিত্তে না হোক, পেশা পরিবর্তনের নতুন অভিজ্ঞতা লাভের মানসে অফারটি গ্রহণ করেন এবং রাষ্ট্রদূতের নিয়োগপত্র নিয়ে চলে যান মধ্যপ্রাচ্যের দেশ বাহরাইনে।
১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সাল–এই চার বছর সেখানে সুচারুরূপে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটলে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব ত্যাগ করে পুনরায় সাংবাদিকতা পেশায় ফিরে আসেন এবং দৈনিক দিনকালের সম্পাদক পদে যোগদান করেন। কিন্তু কিছুকাল পর দৈনিক ইত্তেফাক কর্তৃপক্ষ তাঁদের পত্রিকায় যোগদানের আহ্বান জানালে তিনি সানন্দচিত্তে তাঁর দীর্ঘদিনের কর্মস্থল ইত্তেফাকে ফিরে আসেন উপদেষ্টা-সম্পাদক হিসাবে। আবার প্রকাশ হতে থাকে জনপ্রিয় ‘স্থান-কাল-পাত্র’ কলাম।
এবারে জনাব আখতার-উল-আলমের সংগে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্কের কিছু কথা, কিছু স্মৃতি অকপটে তুলে ধরতে চাই। আপনাদের ভালো লাগতে পারে, আবার না-ও লাগতে পারে । তবে তুলে না ধরলে লেখাটা অপূর্ণ থেকে যাবে বলে আমি মনে করি। একই ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং কিছুটা দূর-সম্পর্কীয় আত্মীয়তা সূত্রে আমি তাকে চিনতাম এবং তিনিও আমাকে চিনতেন। ছোটবেলায় ছড়া-কবিতা লিখতাম আর ওনার ঢাকার ঠিকানায় পাঠিয়ে দিতাম পত্রিকায় প্রকাশের জন্য। পরিচয়ের সেটাও ছিল একটা মাধ্যম। ১৯৬৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি একখানা পোস্টকার্ডে চিঠি লিখে আমাকে ঢাকায় আসার আহ্বান জানান।
আমি আর বিন্দুমাত্র দ্বিরুক্তি না করে একটি সুটকেস সম্বল করে রংপুর থেকে সাড়ে সাত টাকা দামের টিকেট কেটে ঢাকা মেইলে চেপে রওনা দেই রাজধানীর উদ্দেশে। এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি আমাকে। অগ্রজপ্রতিম এই মহান ব্যক্তিত্বের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে, অকৃত্রিম ভালোবাসায়, স্নেহ-মমতায়, অভিভাবকত্বে দীর্ঘ জীবন কাটিয়েছি ঢাকায়। পড়াশোনা, লেখালেখির ব্যাপারে তার প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ-উজ্জীবিত হয়েছি। তারই সুপারিশে দৈনিক ইত্তেফাকে চাকরি পেয়েছি। একই বিল্ডিং-এ, একই ছাদের নিচে কেটেছে সুদীর্ঘ ৩৬ বছরের (মাঝে ৪ বছর বাদে) সাংবাদিকতার চাকরি জীবন। সেকশন আলাদা হলেও এমন একটা দিন যায়নি যে, তাঁর সংগে আমার দেখা বা কথা হয়নি। আমার কোনো গল্প,কবিতা, ফিচার, অনূদিত লেখা প্রকাশের আগে ওনাকে দেখিয়ে নিতাম। প্রয়োজনবোধে এডিট করে দিতেন। সম্পাদকীয়, উপ-সম্পাদকীয় ‘স্থান-কাল-পাত্র’ লেখার পাশাপাশি প্রচুর নিবন্ধ-প্রবন্ধ লিখতেন তিনি। সেইসাথে চলতো দেদার অনুবাদকর্ম। সময়ের মূল্য কীভাবে দিতে হয় তা তিনি ভালোভাবে জানতেন। খুব কাছে থেকে দেখে দেখে আমার মনে হতো এ জগৎ সংসারে তাঁকে বোধকরি পাঠানো হয়েছে শুধুই পড়াশোনা আর লেখালেখি, লেখালেখি আর পড়াশোনা করার জন্য। কী বাংলা সাহিত্য, কী ইংরেজি সাহিত্য, কী গ্রিক দর্শন, কী আরবি-ইসলামী সাহিত্য–অর্থাৎ বিশ্বসাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ, অগাধ পান্ডিত্য। এমন কঠিন-কঠোর অধ্যবসায়ী নিরহংকার পন্ডিত মানুষ আর দ্বিতীয়টি চোখে পড়েনি আমার। তিনি পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশ ভ্রমণ করে আহরণ করেছিলেন প্রভূত অভিজ্ঞতা। মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোর কিছু ব্যক্তিত্ব, ইসলামী ইতিহাস-ঐতিহ্য, কূটনীতি, অর্থনীতি, রাজনীতি ইত্যাদি বিষয়ে তিনি যে কত অনুসন্ধানী প্রজ্ঞা আর গভীর জ্ঞান মন-মগজে ধারণ করতেন, অনায়াসে বিশ্বরাজনীতি-অর্থনীতির অন্ধি-সন্ধিতে বিচরণ করতেন তা বোঝা যেত তাঁর লিখিত কলামগুলো পড়ে এবং প্রকাশিত গ্রন্থগুলো পাঠ করলে।
এই কৃতবিদ্য প্রথিতযশা সাংবাদিক আমাদের উত্তর জনপদ তথা বাংলাদেশের গৌরব, আমাদের অহংকার। তিনি সাংবাদিকতায় কৃতিত্বের জন্য পেয়েছেন অনেক দেশি-বিদেশি পদক এবং পদবি। এশিয়ার মধ্যে তিনি অন্যতম ব্যক্তি, যিনি ১৯৮২ সালে সাংবাদিক হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের নেবরাস্কা স্টেটের অনারারি সিটিজেনশীপ লাভ করেন। ২০০০ সালে সৌদী আরবের সরকারি পত্রিকা ‘সাউদী গেজেট’ তাঁকে বিশ্বের ‘ফাইভ লিডিং মুসলিম জার্নালিস্ট’ হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করে। তাঁর সম-সাময়িককালের ঢাকার দৈনিক সংবাদপত্রগুলোর সম্পাদকদের মধ্যে তিনি ছিলেন প্রথম সারির সম্পাদক। তাঁর ব্যক্তিজীবন এবং পারিবারিক জীবন ছিল একেবারেই অনাড়ম্বর, সাদামাটা। বিশ্বাস করতেন না বাগাড়ম্বরে। আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি ছিলেন খুবই নৈকট্যপ্রিয়। সে সময় ঢাকাপ্রবাসী মামা কৃষিবিদ মোহাম্মদ আবু ইছা, অধ্যক্ষ নাসিম উদ্দিন আহমেদ, ব্যাংকার মোহাম্মদ বেলাল, কৃষি কর্মকর্তা আতাহার হোসেন সরকার প্রমুখের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠা করেন “স্বজন কল্যাণ সমিতি” (অধুনালুপ্ত)। সমিতির উদ্যোগে প্রকাশিত হতো ‘স্বজন’ পত্রিকা। বসতো বার্ষিক পুনর্মিলনী সভা। স্বজনদের অনেকের মৃত্যুর পর সেসব এখন আর কিছুই হয় না।
আখতার-উল-আলমের সাংবাদিকতা জীবনের পাশাপাশি লেখক জীবনও বহুদর্শী অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। তাঁর মৌলিক গ্রন্থের পাশাপাশি কৃতিত্বপূর্ণ অনুবাদকর্মের মধ্যে প্রখ্যাত ফরাসি চিন্তাবিদ-লেখক মরিস বুকাইলীর ‘বাইবেল কোরআন ও বিজ্ঞান’ উল্লেখ্যনীয়। সে সময়ে প্রকাশনা জগতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী সর্বাধিক বিক্রীত গ্রন্থ ছিল এটি। তাঁর অনূদিত ও মৌলিক গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ৩৫টি। মৌলিক গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘মুসলিম জাহান ও পাশ্চাত্য জগৎ’, ‘শেষ নবী (দঃ)’, ‘ইবনে খালদুন’, ‘মূল্যবোধের জন্য’, ‘সাহিত্য প্রসংগ’, ‘জাতীয় জাগরণের অগ্রদূত’, ‘আসমানে চাঁদ দেয় আজান’ ইত্যাদি। অনুবাদ গ্রন্থঃ ‘বাইবেল কোরআন ও বিজ্ঞান’, ‘মানুষের ধর্ম’, ‘মধ্যযুগের মুসলিম ভারত’, ‘একটি শহরের উপকথা’, ‘পল হরগানের গল্প’, ‘সোভিয়েট পররাষ্ট্রনীতিঃ একটি সমীক্ষা’, ‘প্রেসিডেন্ট নির্বাচন’, ‘লেনিন ও স্ট্যালিন’, ‘কেনেডি’, প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ বাইবেল বিশারদ আহমেদ দিদাতের ‘দি চয়েস’ প্রভৃতি। অনেক বইয়ের নাম মনে নেই বা সংগ্রহে নেই। তাই সেগুলোর নাম দেওয়া সম্ভব হলো না।
আজ ২৩ জুন। এই ক্ষণজন্মা কীর্তিমানের ১০ম মৃত্যুবার্ষিকী। রাজধানী ঢাকা শহরে এখন কত সমিতি-সংস্থা গজিয়েছে। রোকেয়া সমিতি, মিঠাপুকুর সমিতি, কারমাইকেল কলেজ প্রাক্তন ছাত্র সমিতি, রংপুর সমিতি, উত্তরবংগ সমিতি, বরেন্দ্রভূমি সমিতি, রংপুর বিভাগ সমিতি আরও কত কী। কিন্তু পরিতাপের সংগে বলতে হয়, উত্তর জনপদের গৌরব তথা দেশের এই কৃতিসন্তান আখতার-উল-আলমের জন্ম বা মৃত্যুদিবসে কোনো আলোচনা সভা বা স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয় না। হয় না কোনো সাংবাদিক-সাহিত্য-সংস্কৃতিসেবীদের স্মরণসভা। এমনি এক স্বার্থপর অকৃতজ্ঞ জাতির উত্তরসূরি আমরা!
আজ ১০ম মৃত্যুবার্ষিকীতে সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করি আখতার-উল-আলম মধু ভাইকে, যার কথা কোনোদিন ভুলবার নয়, যার কাছে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিরঋণী, চিরকৃতজ্ঞ। আল্লাহ সুবহানা ওয়া তায়ালা তাঁকে জান্নাত নসিব করুন এই প্রার্থনা করি! আমিন!
নূরুল ইসলাম বরিন্দী, email:- nibarindi@gmail.com

