
রংপুর অফিস:
নারীর পরাধীনতার বিরুদ্ধে তত্কালীন ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম নারীর যে অগ্রগতি হয়েছিল তার পেছনে বেগম রোকেয়ার দর্শন ও কর্মময় জীবন অন্তহীন প্রেরণার উত্স হিসেবে কাজ করেছে। তার দেখানো পথে হেঁটে নারীরা আজ বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও পথপ্রদর্শকের জন্মস্থান রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দে নির্মিত স্মৃতিকেন্দ্রটি শুধু ভবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
পায়রাবন্দে গিয়ে দেখা গেছে, দর্শনার্থীরা রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র ঘুরতে এসে দেখেন রোকেয়া সম্পর্কিত তেমন কিছুই নেই। সংরক্ষণের অভাবে রোকেয়ার জন্মস্থানের ধ্বংসাবশেষ ক্রমেই মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। একটি জানালা ও কয়েকটি পিলার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। রোকেয়া কেন্দ্রের জমি নিয়ে চলছে বিরোধ। স্মৃতিকেন্দ্রের প্রায় রুমের জানালার কাচ ভাঙা। সংগ্রহশালার ধূলিমলীন কাচের আলমারিগুলোতে কখনোই কোনো স্মারক রাখা হয়নি। রুমের দেওয়ালে পড়ে আছে শ্যাওলা। ভেতরের জিনিসপত্র এবং আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন উপকরণ নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। পাঠাগারে প্রায় ছিঁড়ে যাওয়া একটি রোকেয়া রচনাবলির দেখা মিলেছে। গবেষণাকক্ষের বেহালদশা। প্রায় দুই যুগে কোনো গবেষণা আলোর মুখ দেখেনি।
দর্শনার্থী আরোজা বেগম বলেন, নারী জাগরণের অগ্রদূত রোকেয়ার স্মৃতিকেন্দ্রে রোকেয়ার একটি ভাস্কর্য ছাড়া দেখার কিছুই নেই। এখানকার লাইব্রেরিতে রোকেয়া সম্পর্কিত গ্রন্থ নেই। নতুন প্রজন্মকে রোকেয়াকে নিয়ে জানানোর কিছুই নেই। রোকেয়াকে জানার যে আগ্রহে পায়রাবন্দে মানুষ ছুটে যায় তা পূরণ করতে হলে রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র আরো সৃজনশীলভাবে গড়ে তোলা দরকার। তিনি দাবি করেছেন, রোকেয়ার দেহাবশেষ ভারত থেকে জন্মভূমিতে নিয়ে আসার জন্য।
১৯৯৭ সালের ২৮ জুন তিন একর ১৫ শতক জমির ওপর বেগম রোকেয়া গবেষণা ও স্মৃতিকেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ২০০১ সালে ১ জুলাই স্মৃতিকেন্দ্র উদ্বোধন করা হয়। ২০০৪ সালের ৪ অক্টোবর এর দায়িত্ব নেয় বাংলা একাডেমি। কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল বেগম রোকেয়ার জীবন ও কর্ম সম্পর্কে গবেষণা, তার গ্রন্থাবলির অনুবাদ, প্রচার ও প্রকাশনা, সংস্কৃতিচর্চা এবং স্থানীয় যুবক-যুবতিদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া।
বেগম রোকেয়ার মরদেহ ভারত থেকে এখনো দেশে আনা সম্ভব হয়নি। মরদেহ ফিরিয়ে আনার দাবি দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছেন রংপুরবাসী। তারা পায়রাবন্দের মাটিতে তাকে সমাহিত করার দাবি জানিয়েছেন।
আজ ৯ ডিসেম্বর নারী জাগরণের অগ্রদূত মহীয়সী রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ১৪২তম জন্মবার্ষিকী ও ৯০তম প্রয়াণ দিবস। দিবসকে ঘিরে মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দে রংপুর জেলা প্রশাসন তিন দিনব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। মিলাদ মাহফিল, পুষ্পমাল্য অর্পণ, জাতীয় পতাকা উত্তোলন, মেলাসহ নানা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেছেন, রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে একীভূত করে নারীদের অতীত-বর্তমান, সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কেন্দ্র হতে পারে। সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে রোকেয়া স্ট্যাডিজ বাধ্যতামূলক করা দরকার।
মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দ রোকেয়া স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল বলেন, ৯ ডিসেম্বর এলেই এখানে ঘষামাজার কাজ শুরু হয়। নানা আয়োজন হয় রোকেয়াকে নিয়ে। আবারও রোকেয়া এক বছরের জন্য হারিয়ে যায়। রোকেয়া যেন হারিয়ে না যায়, এজন্য বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রটি পুরোপুরি চালু রাখা প্রয়োজন।
মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমাতুজ জোহরা বলেন, রোকেয়ার মরদেহ ভারত থেকে আনার ব্যাপারে কার্যক্রম চালু রয়েছে। এছাড়া বেদখল জমি ফিরিয়ে নিতে আপিল করা হয়েছে। বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের উপপরিচালক আব্দুল্যাহ আল ফারুক বলেন, স্মৃতিকেন্দ্র সমৃদ্ধ করতে আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। রংপুরের জেলা প্রশাসক ড. চিত্রলেখা নাজনীন বলেছেন, রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা বিভিন্ন দিকগুলো বাস্তবতার আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।