এ মৌসুমে ২শ কোটি টাকারও বেশি আম বিক্রির আশা করছেন রংপুরের চাষীরা

রংপুরের হাড়িভাঙ্গা আম বুধবার থেকে বাজার জাত করা শুরু হয়েছে ||

রংপুর অফিস:

রংপুরের হাড়িভাঙ্গা আম দেশে উৎপাদিত সকল আমের জনপ্রিয়তাকে পেছনে ফেলে এখন দেশ সেরা আমের খ্যাতি অর্জন করেছে। দেশ ছাপিয়ে বিদেশেও রফতানী হচ্ছে সুস্বাদু হাড়িভাঙ্গা আম। আজ বুধবার থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে হাড়ি ভাঙ্গা আম বিক্রয় শুরু হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আমের আড়তদাররা ভীড় করছেন হাড়ি ভাঙ্গা আমের রাজধানী বলে রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার পাদাগঞ্জ হাটে। আমচাষিরা আশা করছেন এবছর তারা ২শ কোটি টাকার আম বিক্রি করতে পারবেন।

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পদাগঞ্জ এলাকায় হাড়িভাঙ্গা আম প্রথম উৎপাদন করে কৃষক সালাম। সম্পুর্ন আঁশ মুক্ত ভীষন সুস্বাদু হওয়ায় এ আমের চাহিদা এখন সারা দেশে। মুলত লালমাটি এলাকায় হাড়িভাঙ্গা আমের চাষ হয় আর লালমাটির আম ভীষন সুস্বাদু। গত বছর আমচাষিরা আমের দাম ভাল পাওয়ায় আরও নতুন নতুন আম বাগান গড়ে তুলেছেন এলাকার সাধারন মানুষ। এবার হাড়িভাঙ্গা আমের ফলনও হয়েছে তুলনামুলক ভালো।

ক্ষুদ্র আম চাষীদের অভিযোগ, ত্রাা ন্যায্য মুল্য পায়না যদি আম সংরক্ষন করার ব্যবস্থা থাকতো তাহলে তারা আরো বেশী লাভবান হতেন। বড় বড় ব্যবসায়ীরা আগাম টাকা দিয়ে আমের বাগান কিনে নেয়ায় তারা লাভবান হচ্ছেন বেশী বলে আম চাষীদের অভিযোগ। তার পরেও হাড়িভাঙ্গা আম বদরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর উপজেলার ৭০ টি গ্রামের মানুষের ভাগ্যের চাকা খুলে দিয়েছে হাড়িভাঙ্গা আম। এই আম চাষ করে তারা এখন পুরোপুরি স্বাবলম্বি।

সরেজমিন রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পদাগজ্ঞ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে সারি সারি আমের বাগান এমনকি প্রতিটি বাড়িতে ১০ থেকে ১৫টি কোন কোন বাড়িতে তার চেয়ে বেশী হাড়িভাঙ্গা আমের গাছ। সবগুলো গাছের আম পাকা শুরু হয়ে গেছে বলে আমচাষীরা জানান।

এলাকার কৃষক মমতাজ উদ্দিন , আয়েন উদ্দিন , মোসলেমা বেগম সহ অনেকেই জানালো মাত্র ৮/১০ বছর আগেও এসব এলাকা ছিলো চরম অভাবি মানুষ তিন বেলা তো দুরের কথা এক বেলাও খাবার জুটতোনা। এলাকার মাটি লাল হওয়ায় এখানে বছরে একবার ধান উৎপাদন হয়। বাকী ৮ মাস পতিত পড়ে থাকতো জমি। কিন্তু হাড়ি ভাঙ্গা আম তাদের ভাগ্যের চাকা বদলে দিয়েছে। এখন ধানের বদলে ওই জমিতে আমের বাগান গড়ে তুলেছেন তারা। বছরে আম বিক্রি করে তাদের সংসারে এখন সচ্ছলতা ফিরে এসেছে। কিন্তু যাদের জমি নেই সেই সব ভুমিহীন পরিবারগুলো তাদের বাস্তভিটাতেই হাড়ি ভাঙ্গা আম গাছ লাগিয়ে উৎপাদিত আম বিক্রি করে ভালো ভাবেই জীবন যাপন করছেন। হোসনে আরা নামে এক মহিলা জানান তার স্বামী ৫ বছর আগে মারা গেছে। ৫ সন্তান নিয়ে আনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটতো তাদের। স্বামীর রেখে যাওয়া ৪ বিঘা জমিতে আমের বাগান করে প্রতি বছর আম বিক্রি করেই ৩/৪ লাখ টাকা আয় হয় তাদের। এখন তিনি ছেলে মেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখা পড়া করাচ্ছেন। আমচাষিদের সকলের একটাই দাবি আম সংরক্ষনের ব্যবস্থা করা।

রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা শাহীন আহমেদ বলেন, এমৌসুমে আমের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৯ হাজার ৪৩৬ টন। প্রতি টন গড়ে বিক্রি হবে ৩৩ হাজার টাকায়। প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ না হলে প্রায় শত কোটি টাকার আম (হাঁড়িভাঙ্গা) বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, গত বছর মাসতোয়া এগ্রো লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান এখানকার আম বিদেশে রপ্তানি করেছে। এবারও তারা রপ্তানি করবে। আমরা অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি, আশা করছি তারা এগিয়ে আসবে।এ ছাড়াও অনলাইনে আম বিক্রি করতে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে। চাষিরা যাতে আম বিক্রি করতে কোনো প্রকার অসুবিধায় না পড়েন, সেজন্য সারা দেশের ৯২ জন ফল ব্যবসায়ীর মোবাইল নম্বর কালেক্ট করে তা লিফলেট আকারে বিতরণ করেছি আমরা।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপ পরিচালক কৃষিবিদ ওবায়দুর রহমান জানান, এ বছর রংপুরে ১ হাজার ৮শ ৮৭ হেক্টর জমিতে হাঁড়িভাঙ্গা আম হয়েছে। এবার অতিবৃষ্টি আর ঝড়ের কারনে আমের ফলন বাম্পার না হলেও ভালো হয়েছে। তার পরেও প্রায় ৩০ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদনের আশা করছে কৃষি সম্প্রসারন বিভাগ। হাড়িভাঙ্গা আম চাষে কোন ক্ষতিকর কীটনাশক ব্যাবহার করা হয়না ফলে দেশবাসিকে নিশ্চিয়তা দিতে পারি কীটনাশক মুক্ত আম খেতে পারবে দেশে ও বিদেশের মানুষ।

রংপুরের জেলা প্রশাসক আসিব আহসান বলেন, আমের সবচেয়ে বড় হাট পদাগঞ্জে। সেখানে হাট সংস্কারের কাজ করা হয়েছে। কিছু কিছু কাজ চলমান আছে। এ ছাড়াও যে কোনো সমস্যা সমাধানে প্রশাসন কাজ করছে।

এম২৪নিউজ/আখতার

Leave a Reply