বিশ্ববিদ্যালয় হলে হলে ‘টর্চার সেল’ কালচার

১২ বিশ্ববিদ্যালয়ে শতাধিক কক্ষে চলে নির্যাতন গত ৫ বছরে বুয়েট ছেড়েছেন নির্যাতিত ৩০ শিক্ষার্থী, জমা পড়েছে ১৬৬ অভিযোগ

নিউজ ডেস্ক:

বুয়েটের শেরে বাংলা হলের টর্চার সেলে টানা ছয় ঘণ্টার নির্যাতনে মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের মৃত্যু হয়েছে। দেশের প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা নিত্যনৈমত্তিক। বুয়েটের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবরারের মতো মেধাবী ছাত্র মারা না গেলে হয়তো এ টর্চার সেলগুলোর বর্বরতার চিত্র নিয়ে এত আলোচনা হতো না। বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে নিরপরাধ শিক্ষার্থী যারা কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নয়, শুধু পড়াশোনা করতে চায় তাদের জন্য মাঝে মাঝেই দুঃসহ সময় আসে। তাদের টর্চার সেলে নির্মম নির্যাতনের শিকার হতে হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার স্বার্থে এসব বিষয়ে তারা মুখ খোলে না। এসব টর্চার সেলে থাকে লাঠি, হকিস্টিক, ক্রিকেট স্ট্যাম্প চেইন, লোহার রড ছাড়াও ইলেকট্রিক শক দেওয়ার মতো ভয়ঙ্কর নির্যাতন সামগ্রী।

হল নিয়ন্ত্রণকারী দলের মিছিলে না গেলে, নেতাদের সঙ্গে সঙ্গ না দিলে, সালাম না দিলে, নেতার কমান্ড না মানলে বা বিরোধী মতাবলম্বী হলেই তার ভাগ্যে টর্চার রুম অথবা গেস্টরুমে রিমান্ড এবং শাস্তি অবধারিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর তুলনায় হলের আসন কম থাকায় এটিকে কেন্দ্র করে টর্চারের খবর কম নয়। তবে প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ছাত্রদের ধরে নিয়ে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করার জন্য এই টর্চার সেল কালচার যুগ যুগ ধরেই চলে আসছে। শুধু ছাত্রদের হলেই না ছাত্রী হলেও এই কালচার রয়েছে। অনেক সময় র্যাগিংয়ের নামেও চলে নির্যাতন। টর্চার সেলে নির্যাতন আবরারের মতো বহু জীবন শেষ করে দিয়েছে। অনেকে পঙ্গুত্ব বা অসুস্থতা নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন। অনেকে লেখাপড়া শেষ না করেই বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছেন।

মূলত যখন যে ছাত্র সংগঠন হলের নিয়ন্ত্রণে থাকে তাদের সন্ত্রাসীরাই হিরোইজম দেখানোর জন্য এই বর্বর কালচার ধরে রেখেছে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত যখন যারা ক্ষমতায় এসেছেন তাদের ছাত্র সংগঠন হলে দখলে রেখে গেস্টরুম, পলিটিক্যাল রুম, গণরুম, টর্চার রুম তৈরি করেছে। বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখন যেমন ছাত্রদলের দ্বারা নিরীহ ছাত্রদের ওপর টর্চার হয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রলীগের দ্বারা সেই ধারাবাহিকতাই চলছে।

শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ জানাতে বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের শিক্ষার্থীরা একটি ওয়েবপেজ চালু করে। এ ওয়েবপেজে গত ৯ অক্টোবর পর্যন্ত জমা পড়ে ১৬৬টি অভিযোগ। ১০ অক্টোবর বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এটি বন্ধ করে দিয়েছে। এই ওয়েবপেজ থেকে জানা যায়, ছাত্রলীগের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে গত ৫ বছরে বুয়েট ছেড়েছেন ৩০ শিক্ষার্থী। ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে পর্যন্ত ঐসব শিক্ষার্থীরা বুয়েট ছাড়তে বাধ্য হন বলে জানা গেছে। এর আগেও নির্যাতনের শিকার হয়ে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী বুয়েট ত্যাগ করেন।

এদিকে সম্প্রতি সরকারকে দেওয়া একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৪৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১২ বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত শতাধিক কক্ষে ছাত্রলীগের ‘টর্চার সেল’ রয়েছে। এই রিপোর্টের ভিত্তিতেই প্রধানমন্ত্রী গত পরশু সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে বলেছেন যে, হলগুলোতে তল্লাশি করা হবে। যারা হলের ভিতরে অন্যায় এবং অনিয়ম করে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সূত্র: ইত্তেফাক অনলাইন।

Leave a Reply