সামাজিক কর্মকাণ্ডে গণমাধ্যমের ভূমিকা

 নূরুল ইসলাম বরিন্দী:

দেশে এখন প্রিন্ট মিডিয়া অর্থাৎ সংবাদপত্রের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক মিডিয়ার টিভি স্যাটেলাইট চ্যানেলের ছড়াছড়ি। এ পর্যন্ত প্রায় ৩০/৩৫টি চ্যানেল সগৌরবে চব্বিশ ঘন্টার বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালা দেশ-বিদেশের দর্শকদের জন্য উপহার দিয়ে চলেছে এবং আরও কয়েকটি চ্যানেল  সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায়। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে একটি দেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশের ক্ষেত্রে টিভি চ্যানেলের অসামান্য অবদান রাখার সুযোগ রয়েছে। অনেকেই ধারণা করেছিলেন এই তথ্য-প্রযুক্তির প্রসার ঘটলে প্রিন্ট মিডিয়া মার খাবে। বাস্তবে দেখা গেছে তা হয়নি বরং সংবাদপত্রের সংখ্যা আগের চেয়ে আরো বেড়ে গেছে। শুধু তাই নয়, প্রধান প্রধান সংবাদপত্রগুলোর ওয়েব সাইটে অনলাইন পত্রিকাও প্রকাশিত হচ্ছে। তবে একথাও ঠিক যে, করোনাকালের জন্য প্রিন্ট মিডিয়ায় একটু ধস নেমেছে।  আমাদের বিশ্বাস এটা সাময়িক, এ অবস্থা অচিরেই কেটে যাবে। তারপরও বলা যায়  গণমাধ্যমগুলো টিকে আছে যার যার অবস্থানে। সেই ১৯৯৫ সালে স্যাটেলাইট চ্যানেল বাণিজ্যিকভাবে যাত্রা শুরুর পর থেকেই ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ক্রমোন্নতি লক্ষ্য করা গেলেও অনেক ক্ষেত্রে এর মান বা দক্ষতা নিয়ে নানান প্রশ্ন উঠে এসেছে বার বার।

ধরা যাক চ্যানেলগুলোয় সংবাদ পরিবেশনের কথা। খবর হচ্ছে টিভি চ্যানেলের প্রাণ এবং অন্যতম আকর্ষণ। দেখা যায়, হাতেগোনা গুটিকয়েক চ্যানেল বাদে অধিকাংশ  চ্যানেলেই এমনসব অপ্রয়োজনীয় বা অগুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পরিবেশন করা হয় যা দর্শকদের কাছে রীতিমতো পানশে ও বিরক্তিকর বলে মনে হয়। তারপরও স্যাটেলাইট চ্যানেলের অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে সংবাদ এখনও তুলনামূলকভাবে জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে শীর্ষে অবস্থান করছে। তবে প্রায় সব চ্যানেলেই সংবাদের শুরুতে, মাঝখানে ঘন ঘন এবং কয়েকদফা দীর্ঘ সময়ব্যাপী বিজ্ঞাপন প্রচার করায় দর্শকসাধারণের জন্য ব্যাপারটা অত্যন্ত বিরক্তিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন অবস্থা সকল চ্যানেলেই।  অনেক চ্যানেলের খবরে সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের নির্ভরতা এত বেশি যে , মাঠ পর্যায়ের রিপোর্টিং, এক্সক্লুসিভ রিপোর্টিং কিংবা বিশেষ প্রতিবেদনের অনুপস্থিতির কারণে সংবাদ মানসম্পন্ন না হয়ে অনেকটা  রুটিনমাফিক হয়ে পড়েছে। ক্যামেরার প্রযুক্তির কল্যাণে দর্শকদের চোখের সামনে ঘটনা দৃশ্যমান হওয়ার সুবাদে খবর পরিবেশন যতটা সুন্দর-শোভন হওয়ার কথা অনেক চ্যানেলেই তা প্রায় অনুপস্থিত। অনুসন্ধানী খবরের প্রতি মনোযোগী অনেক চ্যানেলই। তবে তার পরিস্ফুটন তেমনটি সর্বজনীন হয় না। মফস্বল প্রতিনিধিদের পাঠানো  সংবাদ্গুলোয় পক্ষপাতমূলক ও বস্তুনিষ্ঠতায় অনেক ঘাটতি থাকে যা বাছবিচার ছাড়াই প্রচার হয়ে থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্যামেরার চোখকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে মূল বক্তব্যকে গৌণ করা হয়। অবশ্য এমনটি হয় বার্তা সম্পাদকের অযোগ্যতা বা অনিরপেক্ষতার কারণে। আর প্রায়শই স্ক্রলে মারাত্মক ভুল শব্দ ও ভুল বানানের ছড়াছড়ি লক্ষ্য করা যায় সার্বক্ষণিকভাবে যা সত্যি দুঃখজনক এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাস্যকরও বটে!

গভীর জনসম্পৃক্ত তথ্যমূলক অনুষ্ঠান তৈরি করে তা প্রচার করার আগ্রহ অনেক চ্যানেলের নেই বললেই চলে। অথচ এ বিষয়টিকেও যে একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠানে রূপ দেয়া যায় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ চ্যানেল আই -এর ‘মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানটি। কৃষির মতো একটি রসকষহীন বিষয়কেও শাইখ সিরাজ তাঁর দক্ষ উপস্থাপনা ও পরিকল্পনার গুণে দর্শকপ্রিয় করে তুলেছেন তা সকলেই স্বীকার করবেন। মনে রাখা দরকার দর্শকরা এখন অনেক সচেতন। তারা টিভির সামনে বসে ভাঁড়ামিপূর্ণ নাটক আর রসহীন অনুষ্ঠান দেখবেন এমনটি  আশা করা বাতুলতামাত্র। বরং তারা রিমোটের বাটন টিপে চলে যাবেন বিদেশি কোনো চ্যানেলে। বাস্তবে হচ্ছেও তাই। এতগুলো দেশি চ্যানেল থাকার পরও সন্ধ্যার পর প্রাইম টাইমে ঘরে ঘরে স্টার জলসা, জি ভিসহ বিদেশি চ্যানেলগুলোই সরব হয়ে ওঠে। তারপরও বলতে হয় হাতেগোনা কয়েকটি চ্যানেল বেশ কিছু নির্মল, রুচিশীল অনুষ্ঠান প্রচার করে থাকে।

যা হোক, আমাদের আরেকটি অভিযোগ  হলো রাজনৈতিক টক শো নিয়ে (অবস্থাদৃষ্টে রাজনৈতিক বলাই শ্রেয়)। প্রায় চ্যানেলেরই উদ্দেশ্য থাকছে টক শোকে আকর্ষণীয় করে তোলা। এই অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তু বেশিরভাগই রাজনৈতিক এবং তা গুরুত্বপূর্ণভাবে উপস্থাপন করার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। এতে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের। এদের মধ্যে থাকেন সাংবাদিক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, গবেষক, মন্ত্রী, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, সাংসদ, সমাজকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোক। আর এ অনুষ্ঠানের বেশিরভাগ দর্শকই সমাজের সচেতন নাগরিক। এখন প্রায় সব চ্যানেলেই প্রচার হচ্ছে অনুষ্ঠানটি বিভিন্ন নামে। তবে টক শো অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা ও পরিকল্পনা-পরিচালনার ক্ষেত্রে চ্যানেলগুলোয় এখনও যথেষ্ট মেধা ও দক্ষতার অভাব লক্ষ্য করা যায়। অনেক সময় দেখা যায় বিতার্কিকদের সংগে উপস্থাপকও কোনো-না-কোনো পক্ষ অবলম্বন করে বক্তব্য রাখছেন অথবা বক্তার চেয়ে নিজেই বেশি কথা বলে  অযথাই পাণ্ডিত্য জাহির করে সময় নষ্ট করছেন।

চ্যানেল আই-এর রাজনৈতিক টক শো ‘তৃতীয় মাত্রা’ বেশ সজীব ও প্রাণবন্ত হলেও একেবারে যে ত্রুটিমুক্ত তা বলা যাবে না। টক শো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী অনেকেই বক্তব্য শুরু করেন দলীয় শীর্ষনেতৃত্বের বন্দনা দিয়ে। এরপর স্ব-স্ব দলের প্রশস্তি গাওয়ার মধ্যদিয়ে চলে একে অপরকে আক্রমণের পালা। যুক্তিতর্ক অহেতুক রূপ নেয় বাগযুদ্ধে। যুদ্ধংদেহি রূপ ধারণ করে অশালীন, অশ্রাব্য, অভব্য ভাষার পারংগমতায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মুখে ফেনা উঠে যায়, তবু ‘কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান। শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানটি রূপ নেয় গ্রাম্য ‘কাজিয়ায়’। মহিলা বিতার্কিকদের বেলায় দেখা যায় প্রায় চুলোচুলি এমনকি হাতাহাতির অবস্থা। এসব নিয়তই প্রত্যক্ষ করছি আমরা নিরীহ দর্শকরা। দর্শকসাধারণের, তারা বোদ্ধাই হোন আর অবোদ্ধাই হোন, অবাক বিস্ময়ে এসব তথাকথিত নেতা-নেত্রীর কুরুচিপূর্ণ বাক-বিতন্ডা নিরবে হজম করা ছাড়া উপায় থাকে না। এ প্রজন্মের ৭০ ভাগ তরুণ, যারা পূর্বসূরিদের কাছ থেকে কিছু জানবে ও কিছু শিখবে বলে গভীর আগ্রহ নিয়ে টিভির সামনে বসে থাকে তারা টিভির পর্দা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে নিজেদেরই প্রশ্ন করে—কী শিখলাম আমরা, শালীনতা না নোংরামি!

এই নোংরামির হাত থেকে দর্শকদের বাঁচাতে টক শোকে আরও অর্থপূর্ণ করে তুলতে হলে যে মেধা-মননের প্রয়োজন তা যদি পূরণ  করা না হয় তবে এ থেকে দর্শক মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হবে তা বলাই বাহুল্য। চ্যানেল মালিকদের মনে রাখা দরকার জনপ্রিয়তা চিরস্থায়ী নয়, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ক্ষেত্রে এ কথাটি বেশি করে প্রযোজ্য। আসলে আমাদের সময়ের সংগে তাল মিলিয়ে চলতে হবে সবাইকে। আর সেটা কার্যক্ষেত্রে কর্মনিপুণতা, যৌক্তিকতা ও শৈল্পিক উপায় অবলম্বন করে।

নূরুল ইসলাম বরিন্দী, email: nibarindi@gmail.com