গ্রামোন্নয়ন বনাম নগরোন্নয়ন

 নূরুল ইসলাম বরিন্দী:

সেদিন মধ্যরাতে রাজধানী ঢাকার সুনসান রাজপথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে পড়ে গেল একটি উর্দু কবিতার দুটি লাইনঃ “এক শাহানশাহ নে দওলতকা সাহারা লেকর/হাম গরিবোঁ কী মোহব্বতকা উড়ায়া হ্যায় মজাক”।

অর্থাৎ “একজন বাদশাহ তার অঢেল ধন-সম্পদের সুযোগ নিয়ে আমাদের মতো গরিবদের ভালোবাসাকে উপহাস করেছেন”। বলা বাহুল্য কবিতাটি মোঘল সম্রাট সাজাহানের অমর কীর্তি তাজমহল সম্পর্কিত।

রাজধানী ঢাকা শহরের রাজপথের দুপাশের আকাশচুম্বি অট্টালিকা, বাণিজ্যিক, আবাসিক এলাকার সুরম্য প্রাসাদ দর্শনে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সম্রাট সাজাহানের স্বপ্নবিলাসী অমর কীর্তি তাজমহলের কথা মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সময়ের পরিবর্তনের ধারায় আগের সেই নবাবি আমলের ঢাকা আর নেই। এর দেহের খোল-নলচে পাল্টে গেছে অনেক। পুরানো খোলস ছেড়ে সাপের মতো রাজধানী ঢাকা শহর এখন ঝকঝকে তকতকে উজ্জ্বল চেহারার রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠার ফলে এর অবয়ব হয়েছে স্ফীত। বাণিজ্যিক-আবাসিক এলাকায় নতুন নতুন মাল্টিন্যাশনাল বিল্ডিং গড়ে ওঠার পাশাপাশি স্থানে স্থানে নির্মিত হয়েছে সুসজ্জিত বিপণি বিতান। প্রশস্ত হয়েছে রাজপথ, সেইসংগে বেড়েছে এভিনুয়ের সংখ্যা। তবে মেগাসিটি ঢাকা শহরের এই অত্যুজ্জ্বল চাকচিক্য আর জলুসের পাশাপাশি যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি পীড়াদায়ক তা হলো অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর, রাস্তা নির্মাণ এবং এর সম্প্রসারণ। গায়ে-গতরে নিপাট পোশাক সেঁটে পেটে ক্ষুধার আগুন পুষে রাখার কোনো মানে হয় না। আর হয় না বলেই একদা গাঁও-গেরামের ধূলি-ধূসরিত চেহারার নব্যশিক্ষিত, ইদানীংকালের শহুরে ফিটবাবু বনে যাওয়া নাগরিক সুবিধাভোগী শ্রেণির সংখ্যা বেড়ে চলেছে দিনকে-দিন। আর ওদিকে উজাড় হয়ে যাচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে শহরে ধাবমান লোকের সংখ্যা। ফলে এই বাড়ন্ত উপদ্রবের ভার বইতে পারছে না পৌর-মেট্রপলিটন এলাকা। আধুনিক শহর তার বিভিন্নমুখী প্রকল্প বাস্তবায়নে খাবি খাচ্ছে অহরহ। প্রতিনিয়ত পাল্টাতে হচ্ছে উন্নয়নের প্রক্রিয়া-পদ্ধতি। গগনচুম্বি অট্টালিকার পাশাপাশি বৃদ্ধি পাওয়া বস্তির সংখ্যা, ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল প্রভৃতিতে ক্রমবর্ধমান অবাঞ্ছিত ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যাধিক্য প্রত্যক্ষ করে গলদঘর্ম হচ্ছেন নগর প্রকল্পকরা। আধুনিক রাজধানী শহরের সৌন্দর্য-সৌকর্য বিনষ্টকারী এই জনস্রোতকে তারা ঠেকাতে পারছেন না কোনোমতেই।

রাজধানী শহর তথা জেলা শহর অত্যুজ্জ্বল আলোয় আলোকিত হোক, পাতালরেল, ওভারব্রিজ, উড়াল সড়কসহ ঢাকা শহরের উন্নয়নকল্পে গৃহীত হোক একশ একটা নগরায়ণ প্রকল্প, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন তথা সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হোক নাগরিক সাধারণের, সরকারের দুইসালা/পাঁচসালা পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হোক, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সম্প্রসারণ করুক তার আবাসন এলাকা, তাতে কারো কিছু বলার নেই। কিন্তু শতকরা পঁচাশিজনের অধিবাসস্থল ৬৪ হাজার গ্রামকে উন্নয়ন-বঞ্চিত রেখে শুধু নগরায়ণের দিকে দৃষ্টি দিলে দেশোন্নয়নের নামে বাগাড়ম্বরই হবে সার, উন্নয়নের কিছুই হবে না –তা দিবালোকের মতোই সত্য। অতএব, এ ব্যাপারে নেতিবাচক মানসিকতা অবশ্যই পরিহার করতে হবে আমাদের সরকার এবং সরকারি পরিকল্পকদের।

দেশের শতকরা পঁচাশিভাগ লোকের বাস যে গ্রামবাংলায়, সেই গ্রামের উন্নতি তথা গ্রামীণ অর্থনীতির কথাও ভাবতে হবে সমভাবে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে ক্ষুধা, বেকারত্ব, নিরক্ষরতা আর সীমাহীন দারিদ্র্যতার মধ্যে রেখে রাজধানী উন্নয়নের ঢাকঢোল পেটালেই চলবে না। সমস্যা সমাধানের বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। আর এজন্য চাই আন্তরিক ও সুষ্ঠু প্রয়াস-প্রচেষ্টা।

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে, বিশেষ করে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে গ্রাম আর শহরের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। সমস্যা-সংকটের প্রকৃতিও ভিন্ন ধরনের। পৌর ও পল্লী এলাকার নাগরিক-সাধারণের মধ্যে প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার মধ্যে অমিল থাকলেও মৌলিক সমস্যা সবার ক্ষেত্রে এক এবং অভিন্ন। কিন্তু তা সমাধানের বাস্তবপন্থা চিহ্নিত হচ্ছে না। কৃষি উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে সর্বাগ্রে যা অগ্রাধিকারযোগ্য তা হলো কৃষিক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ। বিদেশে এর বিপুল সম্ভাবনা প্রত্যক্ষ করেও আমাদের দেশে তার বাস্তব প্রতিফলন তেমন চোখে পড়ে না। কাজ এবং কথার মাঝে অমিল থাকলে এমনটি হয়। কথায় বলে বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়ো, খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি। আমাদের হয়েছে সেই দশা। কাজে নয়, কথায় বড় হওয়ার রোগে ভুগছি আমরা। একথা সত্য যে, আজকের ‘তৃতীয় বিশ্ব’ নামধারী দেশগুলোকে অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানের মতো মৌলিক সমস্যাগুলোর মোকাবিলা করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। পাশাপাশি উন্নত বিশ্বের সংগে নানাভাবে তাল মিলিয়ে চলতে হয় তাদের দান-অনুদানের কথা মাথায় রেখে। ফলে ঘুরপাক খেতে হয় সমস্যার আবর্তে, উন্নয়নশীলতায় দেখা দেয় টানাপড়েন। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি যেখানে জাতীয় অর্থনীতির মূল ভিত্তি, সেখানে আধুনিক নগরায়ণ ব্যবস্থাও সমস্যার একটা দিক। এই ব্যবস্থাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সবার আগে রুখতে হবে শহরমুখী মানুষের স্রোতকে। তা নাহলে কী শহর আর কী গ্রাম,– সবখানেই ব্যাহত হবে উন্নয়ন প্রচেষ্টা। গ্রাম তথা শহর উন্নয়ন কর্মকান্ড বিস্তৃত হোক এটা সবারই কাম্য। দেশের বিভাগীয় শহরসহ রাজধানী ঢাকা নগরীও হোক তিলোত্তমা কিংবা প্রাচ্যের প্যারি, তাতে কারো আপত্তি থাকবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার লড়াই কিংবা নির্বাচনে হার-জিতের দুঃখ-উল্লাসের মিছিল বের হোক রাজপথে, তাতেও আমাদের বলার কিছু নেই। তবে আমরা, দেশের নাগরিকরা  চাই গ্রাম এবং শহরের সম-উন্নতি। একটি গণতান্ত্রিক দেশের জন্য সেটাই উত্তম এবং মংগলজনক নয় কী?

নূরুল ইসলাম বরিন্দী, email:nibarindi@gmail.com