ছোটগল্পঃ তাসফির বিয়ে

ওমায়ের আহমেদ শাওন ||

বৃষ্টি পড়ছে। তাসফি বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো গ্লাসে জমা করছে। আর মনে মনে ভাবছে, জীবনের শেষ সিদ্ধান্তটি নিবে কিনা ! সমাজে বাপমরা মেয়েদের দোষ বেশী। তাসফির শৈশব কালেই বাবা আব্দুর রাজ্জাক পৃথিবী থেকে নিষ্কৃতি নিয়েছেন। তাই খুব সচেতন ভাবে তাকে যেকোন কিছু ভাবতে হয়।

জীবনের এ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত যদি একবার ভুল হয় সেটা কোনভাবে আর শোধরানো যায় না। তবে বয়স বেড়েছে আর কতই বা অপেক্ষা করা যায়? লোক সমাজে নানান ঘটনা ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। আর বাঙালী মেয়েরা তো যৌবন দমিয়ে রাখতে পারে না।

শাওন বাসার গেইটে দাঁড়িয়ে-। তাসফি শাওনকে দেখে রীতিমত অবাক। সেতো তাদের বাসা চেনার কথা না, জীবনে কখনো আসেওনি। হুট করে কোনকিছু না বলে এভাবে আসাতে তাসফির অন্তকরণে ভীতির সঞ্চার হয়। সে দ্রুত রুমে প্রবেশ করে। শাওনও পিছে পিছে রুমে ঢুকে পড়ে। তাসফি শাওনের প্রতি রাগান্বিত হয়ে বলে, ‘তুমি এখানে কেন? চলে যাও-। তোমার সাথে তো আমার আর কোন সম্পর্ক নেই।’

– জানপাখি, তুমি ফোন রিসিভ করো না আর মেসেজ এর রিপ্লেও দাওনা। তাই অনেক কষ্ট করে সোজা ঢাকা থেকে এখানে এসেছি। কিছু কথা বলে চলে যাবো।

‘তোমার সাথে আমার কোন কথা নেই। দ্রুত চলে যাও। আশেপাশের মানুষজন দেখলে তোমার বিপদ হবে। এখানকার কেউ ভালো মানুষ না।’

– তুমি আমার সাথে এমন করছো কেন? তোমাকে ছাড়া কোন কিছুই ভালো লাগেনা আমার। প্লিজ, ভুল বোঝাবুঝি-অভিমান সব ভুলে চলো আগের মতো হয়ে যাই। বিয়ে করে সুন্দর একটা সংসার গড়ি।

‘এসব সস্তা কথাবার্তা বাদ দাও। ভালো কোন মেয়ে দেখে বিয়ে করে নাও।’

– তোমাকে ছাড়া আর কাউকে চাইনা।

‘আমি তোমাকে চাইনা। চলে যেতে বলছি যাও। তোমার ভালো হবে। আমার ভাই দেখলে তোমাকে আস্ত রাখবে না।’

– যা হয় হোক। আমি ওনাকে বলবো, আমি তাসফিকে বিয়ে করবো।

‘কতবার বলবো? এখন আর তোমাকে ভালো লাগেনা। বিয়েও করবো না। আমি অন্য কাউকে বিয়ে করবো। তুমি আমার চেয়েও ভালো কাউকে পেয়ে যাবে।’

– তাহলে এতোদিন আমাদের সম্পর্ক কি ছিলো?

‘বাজি ধরে আমার সাথে প্রেম করেছো সব তার ফল।’

-তাসফি সত্যি তোমাকে ভালোবাসি। কি প্রমাণ চাও বলো?

‘প্রমাণের দরকার নেই। তুমি চলে যাও।’

ইতিমধ্যে তাসফির মা রুমে প্রবেশ করে। শাওনকে দেখামাত্র রাগান্বিত স্বরে বলে, ‘তুমি শাওন না? এতো বড় সাহস তোমার? মেয়েটাকে বিরক্ত করতে করতে বাসায় চলে এসেছো ! যাও বের হও।’

– আমি তাসফিকে বিয়ে করবো।’

‘এসব পাগলামি বাদ দাও। তাসফির ভাই দেখলে বিয়ের শখ মিটিয়ে দিবে। তুমি যাবে নাকি লোকজন ডাকবো?’

শাওন খানিক ভয় পেয়ে যায়। কিন্তু আবেগকে সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা। তার বারবার মনে হতে লাগে- তাসফিকে জীবন থেকে হারালে সে সবকিছুই হারিয়ে ফেলবে। যেকোন কিছুর বিনিময়ে তাসফিকে তার জীবনে প্রয়োজন। কাউকে মন থেকে ভালোবাসলে আবেগের মাত্রা বেড়ে যায়। শাওন কিছুক্ষণ চিন্তা করে ভীত স্বরে বলে- যাচ্ছি। তাসফির দিকে দৃষ্টিপাত করে বলে, চলে যাচ্ছি। ফোন দিলে রিসিভ করে কথা বলবে। অনেক কথা আছে। রিলেশন রাখো আর নাই রােখো অন্তত কিছু কথা বলিও।

শাওন ব্যাগ থেকে টেবিল ঘড়ি ও দুজনের ফ্রেম বাঁধাই করা ছবি তাসফির হাতে দিয়ে ভয়ে ভয়ে বাসা থেকে বের হয়।

কিছুদূর যেতেই দেখতে পায়- পাশের একটি চায়ের দোকানে কিছু লোক দা-ছুঁড়ি শান দিচ্ছে। শাওনকে দেখে তারা ডাক দেয়।

ভুঁড়িওয়ালা একজন ডাক দেয়- এই ছেলে এদিকে আসো।

শাওন কাছে গিয়ে বলে, ‘বলেন আঙ্কেল।’

শাওনের বুকটা থরথর করে কেঁপে ওঠে।

ভুঁড়িওয়ালা লোক বলে, ‘কার বাসা গিয়েছিলে?’

– তাসফিদের বাসায়।

‘তাহলে তো বিচার আছে।’

– মানে?

চশমাওয়ালা একজন ভুঁড়িওয়ালা লোককে ফিসফিস করে বলে, ‘মেয়েটা আর এলাকার মান-সন্মান রাখলো না বুঝি !’

শাওন তাদের কথা না শোনার ভান করে হাঁটতে শুরু করে।

ভুঁড়িওয়ালা লোক বলে, ‘এই দাঁড়াও। তোমাকে কি যেতে বলেছি?’

শাওন ভেতরে ভেতরে ভয় পেলেও সাহস নিয়ে বলে- আপনারা কি কিছু বলবেন আর?

ভুঁড়িওয়ালা লোক বলে, ‘তাসফিদের বাসায় তোমার কি কাজ ছিলো শুনি?’

– তাসফির মা আমার খালা।

চশমাওয়ালা লোক ভুঁড়িওয়ালা লোকের কানের কাছে বলে, ‘এ তাহলে ওদের আত্মীয়। ছেড়ে দেন ভাই।’

ভুঁড়িওয়ালা লোক বলে, ‘আচ্ছা। যাও তুমি ভাই।’

শাওন যেন এক প্রকার নিস্তার পেয়ে দ্রুত হাঁটতে থাকে। তবুও ভয় কমছে না। এভাবে অচেনা কোন এলাকায় অপ্রস্তুত ভাবে গেলে চোরদের মতোও অবস্থা হতে পারতো। কিন্তু ভাগ্যক্রমে হয়নি। মনে মনে ভাবছে, পিছন থেকে যদি কেউ আসে। জীবন বাঁচাতে দৌড় শুরু করবে।

কিছুক্ষণ পর শাওন মেইন রোডে উঠে বাসে চেপে রংপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

আশা-নিরাশার পরিবর্তনে ছয় বছর কেটে যায়-। একদিন তাসফির সাথে দেখা হয় কারমাইকেল কলেজ ক্যাম্পাসে। শাওন কিছুক্ষণ তাসফির দিকে অনবরত তাঁকিয়ে থাকে।

– শাওন, তুমি কি কিছু বলবে নাকি চলে যাবো?

‘কোথায় যাবে?’

– বাসায় যেতে হবে। ভাইয়ার এক কলিগ বাসায় এসেছে।

‘আসুক। তাতে তোমার কি?’

– উনি আমাকে পছন্দ করে।

‘তোমাকে তো অনেকেই পছন্দ করে।’

– ফালতু কথা বলবে না।

‘এখানে তো রাগের কিছু নেই। তুমি সুন্দরী মানুষ, যে কোন ছেলে পছন্দ করবে তাই স্বাভাবিক।’

– কি কথা বলার জন্য এখানে ডেকেছো সেটা বলো।

‘একটু পর সন্ধা হয়ে যাবে। এই অল্প সময়ে কথা বলা শেষ হবেনা। তুমি আজকে দর্শনার বোনের বাসায় থাকো।’

– না। জরুরী ভাবে বাসায় যেতে হবে।

‘বুঝতে পারছি। আমার চেয়ে বেশী গুরুত্বের কেউ আছে হয়তো তোমার।’

– যেটা মনে হয়।

‘তুমি কি এখন অন্য কাউকে ভালোবাসো?’

– না। আমি কখনো কারো সাথে আর রিলেশনে জড়াবো না। ছেলেদের প্রতি আমার আর বিশ্বাস নেই।

‘তাহলে?’

‘আমাকে উপেক্ষা করছো কেন? কতদিন ধরে কল দেই, মেসেজ করি-। কোনকিছুর তো রিপ্লে দাও না। নাম্বার সব ব্লক করে রাখো কেন?’

– এতোকিছুর জবাব দিতে বাধ্য নই আমি।

‘শুধু বলো, আমার সাথে এমন করছো কেন?’

-বোকার মতো কাজ করেছো কেন? একটা মেয়ের সন্মান এভাবে নষ্ট করা ঠিক করোনি।

‘মানে?’

– কোন সুস্থ্য মানুষ কি হুট করে ওভাবে কারো বাসায় যায়? তোমার জন্য এলাকায় আমার বদনাম হয়েছে।

‘আমি তোমাকে ছাড়া কিছু ভাবতে পারিনা। তাই কোন উপায় না পেয়ে যেতে বাধ্য হয়েছি।’

– এসব কারণেই তোমাকে আমার পছন্দ না।

‘পুরনো ভুলগুলো বাদ দাও তো। আমরা কি আবার রিলেশনটা কন্টিনিউ করতে পারিনা?’

– সেটা আর সম্ভব না।

‘আমি তোমাকে ছাড়া কোন মেয়েকে কল্পনা করতে পারিনা। আমি যে তোমাকে মন থেকে ভালোবাসি এটা তো বিশ্বাস করো নাকি?’

– সব ছেলেরাই এসব বলে।

‘আমি তো সবার চেয়ে ব্যতিক্রম। দুজনের এতো স্মৃতি সব কি ভুলে গেছো?’

– আমি ওসব কিছু শুনতে চাইনা। এমারজেন্সী কিছু বলার থাকলে বলো নাহয় আমি চলে যাবো। বলে উঠে পড়ে।

‘তোমাকে আমার জীবনে চাই।’

-চাইলেও হবেনা। আমি জীবনে কাউকে বিয়ে করবো না। আমার ভাইয়ার কলিগ ঔষধ কোম্পানিতে জব করে। সে প্রস্তাব দিয়েছে, তাও না করে দিয়েছি।

তাসফি চলে যেতে লাগে। শাওনের বুকটা কেঁপে ওঠে। বারবার মনে হতে লাগে- আর হয়তো জীবনে কখনো তাসফির সাথে দেখা হবেনা। যেখানে ভালোবাসার মূল্য নেই, সেখানে দেখা হবার আশা করাটা নিরাশার।

চারদিকে সন্ধা নামতে থাকে। শাওন পিছুডাক দেয়। তাসফি ফিরেও তাঁকায় না। পুরনো সম্পর্কে মেয়েদের ভ্রুক্ষেপ থাকে না। শাওনের চোখ বেয়ে জলবিন্দুর সাথে কষ্টগুলো মিশে যায়। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। চোখগুলো গোধুলীর অন্ধকারের সাথে মিলিয়ে যায়।

মানুষ যখন জেদ করে সম্পর্ক ছিন্ন করে চলে যায়, পৃথিবীর সমস্ত কিছু দিয়েও তাকে ফেরানো সম্ভব নয়। যে সম্পর্ক জোড়া লাগবে না কখনোই তার প্রতিই মানুষের প্রবণতা বেশী। পাথর চাপা কান্নায় যেন শাওনের বুকটা ফেটে যাচ্ছে। শরীরে স্বমর্থ নেই বললেই চলে। শাওনের এক বন্ধু মেহেদী অবস্তার বেগতিক দেখে কোনমতে কাছাকাছি এক হাসপাতালে নিয়ে যায়। মনে হচ্ছে, সে জীবন যুদ্ধে হয়তো টিকবে না।

ডাক্তার ষ্টেথেচকোপ দিয়ে চেক-আপ করে।

– আপনার কোন রোগ নেই। আপনি পুরোপুরি সুস্থ্য।

‘কিন্তু আমার তো চিকিৎসার প্রয়োজন।’

– যতদূর সম্ভব আপনি মেন্টালি শক পেয়েছেন। অতীতের কষ্টগুলো পুরোদমে ভুলে থাকার চেষ্টা করুন, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি নিজেও একটা সময় সাফার করেছি, তাই বললাম।

‘আপনি কি হার্ট সার্জারী করেন?’

– জ্বী।

‘আমার হার্ট সার্জারী করতে পারবেন?’

– কেন? আপনি তো সুস্থ্য। ডাক্তাররা সুস্থ্য মানুষের কোন অপারেশন করেনা। বাসায় গিয়ে প্রচুর ঘুমান। সব ঠিক হয়ে যাবে।

শাওন হাসপাতালের বেডে শুয়ে নিঃস্ব হৃদয়ের যন্ত্রণাগুলো ভাবতে থাকে। আরও ভাবতে থাকে জীবনের ভুলগুলো ভুলে থাকাই সবচেয়ে বড় সুস্থ্যতা।

কয়েক মাস কেটে যায়। শাওন এতোদিনে তাসফিকে বিরক্ত করা বাদ দিয়েছে। ফোনেও যোগাযোগ করেনা। কেউ যদি মন থেকে কাউকে না চায় তাহলে সে সম্পর্ক স্থায়ী হয়না।

মেয়েদের মন একবার পরিবর্তন হয়ে গেলে সেটা আর ঠিক করা যায় না।

হঠাৎ একদিন তাসফির বাসেদ মামা শাওনকে ফোন দেয়। তাসফির বাসেদ মামা আর শাওনের মামা বন্ধু হওয়ার সুবাদে তাদের ভালো পরিচয়।

‘বাবা, কেমন আছো?

– এইতো ভালোই।

‘কোথায় আছো এখন?’

– মামা, গাজীপুরে থাকি।

‘তাসফির বিষয়ে কিছু শুনেছো?’

– কি হয়েছে তার?

‘তাসফির তো গতকাল বিয়ে হয়ে গেছে।’

– মামা, আমাকে আগে জানালেন না তো !

‘আমি তো আগে জানতাম না। গতকালই তার মা আমাকে জানিয়েছে।’

– বুঝতে পারছি! সে জেদ করে কপালের দোষ দিয়ে লাভ হবেনা। মানুষের বিয়ে আছে কিনা সেটা ভাগ্যে নির্ধারিত। কিন্তু কার সাথে বিয়ে হবে সেটা তার নিজের একান্ত ইচ্ছা।

‘ফ্যামিলি এ্যারেজমেন্টেই নাকি তার বিয়ে হয়েছে।’

– ছেলের নাম কি? কি করে?

‘ছেলের নাম রনি। ঔষধ কোম্পানিতে চাকুরী করে। তাসফির ভাইয়ের নাকি কলিগ ছিলো।’

– ও আচ্ছা।

‘তার বিয়ে হয়ে গেছে। তোমার কি খারাপ লাগছে না?

– না।

‘কেন?’

– সে যদি আমার চেয়ে ভালো কাউকে পেয়ে যায় তাহলে আমার কোন আক্ষেপ নেই। সে বাপমরা মেয়ে, সুখে থাকুকক এটাই চাই। সে আমাকে যাই ভাবুক, আমি কোন ক্ষেত্রে তার খারাপ চাইনা।

‘আচ্ছা বাবা। তুমি আমার জন্য ঢাকায় একটা জবের ব্যবস্থা করো। আমি ঢাকা গেলে তোমাকে ফোন দিবো।’

– আচ্ছা মামা।

‘আল্লাহ হাফেজ।’ বলে ফোনটা রেখে দেয়।’

তাসফির বিয়ের কথা শুনে শাওনের ভাঙ্গা হৃদয়টা আবারো কেঁপে ওঠে-। ভেতরে রক্তক্ষরণ প্রারম্ভ হয়ে যায়। রক্তক্ষরণ দেখা যাচ্ছে না।; অথচ রক্তক্ষরণ বয়ে চলছে সমস্ত অন্তকরণ জুড়ে-। বক্ষের পাঁজরগুলো দুমরে-মুচরে যেন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। শাওনের চোখ বেয়ে অবিরত জল ঝড়তে লাগে। দূর্বল হৃদয়ের মানুষের মতো কান্নাই একমাত্র সঙ্গী তার। ভালোবাসার মানুষকে চিরকালের জন্য অন্যের হতে দেওয়া যে কতটা নৃশংসতা তা সে হারে হারে বুঝতে পারছে। আরেকটু চেষ্টা করলেই হয়তো তাসফিকে হারাতে হতো না। সেও তো ভুল না বুঝে ফিরে আসতে পারতো! কিন্তু ভাগ্য যখন চেষ্টার বিপরীতে অবস্থান নেয় তখন মানুষের করার কিছুই থাকেনা। দীর্ঘ সময় ধরে অভিমানে থাকা তাসফি যেন চিরকালের জন্য আরও দূরে হারিয়ে গেল। তাসফির স্মৃতিগুলো শুধু বুকে আগলে রেখে সারাজীবন কেটে যাবে।

এম২৪নিউজ/আখতার

Leave a Reply